ফসলি জমি দখল করে অবৈধ হাউজিং প্রকল্প

ফসলি জমি দখল করে অবৈধ হাউজিং প্রকল্প

poisha bazar

  • ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৯

সালাহউদ্দিন সালমান, সিরাজদিখান: সরকারি অনুমোদন ছাড়া বিঘা বিঘা ফসলি জমি দখল করে অসংখ্য অবৈধ হাউজিং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের আনাচে-কানাচে। সরকারের বিধি নিষেধ তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায় দাপটের সঙ্গে উজাড় হচ্ছে ফসলি জমিজিরাত।

একসময় সিরাজদিখানের অধিকাংশ জমিতে এই চলতি মৌসুমে দেখা যেতো বিক্রমপুরের আলু আর শর্ষের বিস্তীর্ণ মাঠ। সেখানে এখন অধিকাংশ জমিতে লক্ষ্য করা যায় বালু ভরাট করে হাউজিং প্রকল্পের সাইনবোর্ড।

উপজেলার বালুচর ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে চান্দের চর খাসকান্দি পাইনাচর গোলগুলিয়া চর মদিনাপাড়ার এক সময়ের ফসলি জমিগুলোতে এখন তাকালেই দেখা যায় বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্পের অবৈধ সাইনবোর্ড।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বললে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বাপদাদার সম্পত্ত গুলোতে এলাকার মুখোশধারী ভূমি দস্যুদের চোখ পড়েছে। উজাড় করে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের ফসলি জমি। এইসব কালো থাবা থেকে আমরা মুক্তি চাই।

স্থানীয়রা দাবি করেন, এসব অবৈধ হাউজিং প্রকল্প করার জন্য উপজেলার জনপ্রতিনিধিরা তাদের সহযোগিতা করছে প্রকাশ্যে। এতে করে উপজেলার সহস্রাধিক সাধারণ মানুষ তাদের ফসলি জমি হারিয়ে পথে বসেছে বলে জানান তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, শুধুমাত্র বালুচর ইউনিয়নের ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডেই রয়েছে ১৫ থেকে ২০টি হাউজিং প্রকল্পের সাইনবোর্ড। যারমধ্যে দু একটা ছাড়া কারোরই অনুমোদন ও কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। হাউজিংগুলো খাস ও ফসলি জমি ও সংরক্ষিত জলাভূমি ভরাট করে অবৈধভাবে হাউজিং ব্যবসা করছেন দাপটের সাথে। তবে সরকারি খাস জমি ও অন্যের জমি জোর করে মাটি ভরাটের প্রতিযোগিতায় এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে এইসব প্রকল্প প্রতিষ্ঠান।

চান্দের চর এলাকার কুটু মিয়ার ছেলে নুরু মিয়া বলেন, এসব হাউজিং কোম্পানি এলাকায় ভূমিদস্যু সন্ত্রাসী বাহিনী তৈরি করেছে। উত্তরন হাউজিং আমার জমি দখল করে ভালু দিয়ে ভরাট করে ফেলেছে। জমিতে গেলে আমিসহ আমার পরিবারের লোকজনদের মারধর করেছে হাউজিং প্রকল্পের গুণ্ডাবাহিনীরা। আমি বালুচর ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগও করেছি।

জানা যায়, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নেই দিন দিন কৃষি জমির পরিমান কমছে। এতে পরিবেশের উপর যেমন বিরূপ প্রভাব পড়ছে, তেমনই ফসলি জমি কমছে আশঙ্কাজনক হারে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গৃহনির্মাণ ও ইট ভাটায় মাটি বিক্রির কারণে উপজেলা জুড়ে কৃষি জমি কমতে শুরু করেছে। এছাড়া কৃষি জমি ভরাট করে হাউজিং কোম্পানিগুলো গড়ে তুলছে প্লট ও ফ্লাট ব্যবসা।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বালুচর, লতব্দী, বাসাইল, কেয়াইন, চিত্রকোট ইউনিয়নে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দু'পাশে নামে-বেনামে গড়ে উঠছে শতাধিক হাউজিং কোম্পানি।

মহাসড়কের দুই পাশে কৃষি জমি বালু ভরাট করেই মূলত কোম্পানি তাদের প্লট ও ফ্লাট ব্যবসা চালাচ্ছে। স্বল্প দামে কৃষি জমি কিনে বালু ভরাট করছে হাউজিং কোম্পানিগুলো। এরপর সেখানে অত্যাধুনিক ফ্লাট গড়ে তুলতে স্থাপনা নির্মাণ শুরুর পাশাপাশি স্কুল-কলেজ ও হাট-বাজারসহ নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে দেখিয়ে ফ্যাট ব্যবসা করছে নামে-বেনামে অসংখ্য হাউজিং কোম্পানি।

অধিক মুনাফার লোভে কোম্পানিগুলো এক প্রকার দৌরাত্মে চালাচ্ছে কৃষি জমির উপর। কৃষকদের নানা লোভের ফাঁদে ফেলে একের পর এক কৃষি জমি হাতিয়ে নিচ্ছে ওই সব কোম্পানি। এরা এতই শক্তিশালী যে সরকারি অনুমতি ছাড়াই কৃষি জমিতে বালু ভরাটের মধ্য দিয়ে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে চলেছে।

এদিকে, উপজেলার বালুচর, লতাব্দী, বাসাইল ও কেয়াইন ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে প্রায় ৬০টি ইটভাটা। এসব ইটভাটায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। দিন দিন জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ায় উর্বরাশক্তি হারাচ্ছে ফসল উৎপাদনে। ক্রমাগত এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে কৃষি কাজে জমির সংকট সৃষ্টি হবে বলে মনে করছে উপজেলার কৃষককুল।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বালুচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, গেল এক দশকে ফসলি জমির পরিমাণ ক্রমেই কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত আবাসন ও নগরায়ণের ফলে ক্রমাগত কৃষি জমি কমছে। কবে কোথায় কিভাবে তারা এগুলো করছে, কে তাদের অনুমতি দেয় কিছুই জানি না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশফিকুন নাহার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কৃষি জমির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছি। ফসলি জমি যাতে আর নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর।

সিরাজদিখানের কৃষি কর্মকর্তা সুবোধ চন্দ্র রায় বলেন, পাঁচ বছর আগেও উপজেলায় কৃষি জমির পরিমাণ ১৪ হাজার হেক্টর। কী পরিমাণ ফসলি জমি ভরাট হয়েছে সেই সঠিক তথ্য জানতে আমাদের একটু সময় লাগবে। তবে বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি এবং মাসিক সমন্বয় মিটিংয়েও বিষয়টি তুলে ধরেছি।

মানবকণ্ঠ/আরবি




Loading...
ads






Loading...