নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি, বিলুপ্তির পথে খালের মাছ

মানবকণ্ঠ
ছবি - প্রতিবেদক।

poisha bazar

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:২৩

কুমিল্লা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) তরল বর্জ্যে বারোটা বেজেছে পরিবেশের। ইপিজেডের কল-কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য গত কয়েক বছর ধরে বেশ কয়েকটি খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ও নদীর পানিতে মিশছে। এতে ওইসব জলাশয়ের মাছ মরে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক খালে এখন আর জলজ কোন প্রাণীর দেখা মিলছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এছাড়া ওইসব জলাশয়ের পানি ব্যবহার করে যেসব এলাকায় ফসল উৎপাদন হতো, সেসব ফসলি জমির আবাদ এখন অনেকটাই হুমকির মুখে। অনেক এলাকায় কমে গেছে ফসলের উৎপাদনও।

এদিকে, কুমিল্লা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) গত প্রায় ৫ বছর আগে ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এতেও এসব সমস্যার কোন প্রতিকার মেলেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বর্তমানে কুমিল্লা ইপিজেডের তরল বর্জ্য চুইয়ে পানিতে মিশছে। তবে কুমিল্লা ইপিজেড কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন, তাদের কোন দূষিত বর্জ্য কোন জলাশয়ে মিশছে না। কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য পরিশোধনাগারের মাধ্যমে তাদের সকল বর্জ্য পরিশোধন হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে কুমিল্লা ইপিজেডে বিদেশি, দেশি এবং দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন মোট ৩৭টি কারখানা চালু রয়েছে। ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে ২৬৭ দশমিক ৪৬ একর জায়গা নিয়ে কুমিল্লা ইপিজেড প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ২০০০ সালের ১৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ইপিজেডের উদ্বোধন করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর কুমিল্লা ইপিজেডে কোনো ধরনের তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করা হয়নি।

সর্বশেষ স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইপিজেডের দক্ষিণ প্রান্তে বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করার কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের ওই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। বর্জ্য পরিশোধনাগারটি রাসায়নিক ও জৈবিক উভয় পদ্ধতিতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিশোধন করতে পারে। ২৪ ঘণ্টাই এটি চালু থাকে। এটি চালুর ফলে কুমিল্লা ইপিজেডের কারখানাগুলো কেন্দ্রীয়ভাবেই বর্জ্য পরিশোধনের সুযোগ পায়।

তবে এরপরও বর্তমানে ওই ইপিজেডের তরল বিষাক্ত বর্জ্য কুমিল্লা জেলার দক্ষিণাংশের বিভিন্ন ফসলি জমি, নদী–নালা, পুকুর, খাল-বিল ও জলাশয়ে চুইয়ে যাচ্ছে। এতে ফসলি জমির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। জলাশয় থেকে মরে যাচ্ছে মাছসহ জলজ প্রাণী। ইতিমধ্যে নানা প্রজাতির দেশিও মাছ এসব জলাশয় থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

সরেজমিনে জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ওই এলাকার প্রতিটি খাল-বিল ও নালার মধ্যে কালো রংয়ের পচা পানি। পানি থেকে পচা দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। এসব স্থান দিয়ে হাটা-চলাও যেন কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজয়পুর এলাকা থেকে এসব পানি লালমাই হয়ে ডাকাতিয়া নদীতে গিয়ে মিশছে।

এমনকি কুমিল্লা-চাঁদপুর সড়কের বিজয়পুর পাকা সেতুর নিচেও কালো পানি। বামিশা, দিঘিরপাড় কলেজের আশপাশেও কৃষি জমিতে কালো পানি দেখা গেছে। উপজেলার টঙ্গীরপাড় এলাকার ডাকাতিয়া নদীর স্লুইসগেট ও এর লাগোয়া খাল-বিলের পানিতেও একই অবস্থা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সদর দক্ষিণ থানা সংলগ্ন মোস্তফাপুর ও সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের সংলগ্ন খালের মধ্যেও এসব কালো রংয়ের বিষাক্ত পানি। এসব স্থান দিয়ে চলাচলের সময় বাজে দুর্গন্ধের কারনে যাত্রীরা নাক চেপে ধরেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি ডা. মো. মোসলেহ উদ্দিন বলেন, কুমিল্লা ইপিজেডের তরল বর্জের কারণে কয়েক শ’ ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে জলাশয় থেকে হারিয়ে গেছে নানা প্রজাতির মাছ। আর তরল বর্জ্য মিশ্রিত বিষাক্ত পানি ফসল, মাছ ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এতে মানুষের শরীরে জটিল রোগ দেখা দিতে পারে।

জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো.গোলাম সারওয়ার বলেন, কুমিল­া ইপিজেডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলার উন্নয়ন সভা, আইনশৃঙ্খলা সভাসহ বিভিন্ন স্থানে বহু বছর থেকে কথা বলছি। কিন্তু এখনো কোন কাজ হয়নি।

কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ অংশের দিশাবন্দ এলাকার বাসিন্দা সমাজসেবক মো.জসিম উদ্দিন বলেন, আমাদের দিশাবন্দ, রাজাপাড়া, নেউরাসহ বেশ কিছু এলাকায় এখন বসবাস করা দায় হয়ে পড়েছে। কুমিল্লা ইপিজেডের বিষাক্ত বর্জ্য আমাদের এসব এলাকার সকল মুক্ত জলাশয়ে মিশে গেছে। আর এসব পানি থেকে ভেসে আসছে পচা ও বিষাক্ত দুর্গন্ধ।এসব এলাকায় আগে কৃষি জমিতে ভালো ফসল হতো। এখন আর আগের মতো ফসল হচ্ছে না। এছাড়া মুক্ত জলাশয়ে এখন কোন মাছও দেখা যায় না।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুমিল্লা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) মহা-ব্যবস্থাপক মো.জিল্লুর রহমান। তিনি দাবি করেন, তাদের বর্জ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখান থেকে বর্জ্য কোন জলাশয়ে যাচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য পরিশোধনাগারের মাধ্যমে তাদের সকল বর্জ্য পরিশোধন হচ্ছে। কুমিল্লা ইপিজেডের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার প্রতিনিয়ত লোকজন এসে পরিদর্শন করছেন।

মানবকণ্ঠ/এইচকে 





ads






Loading...