কলাপাড়ায় এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর

কলাপাড়ায় এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর

poisha bazar

  • ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:২৭

গোফরান পলাশ, কলাপাড়া: দেশের বিভিন্ন নদী ও নদী কেন্দ্রীক মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে পানি জাদুঘর। পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী এলাকা, কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রামে একটি দ্বিতল টিন শেড ভবনে এশিয়ার প্রথম এই পানি জাদুঘরের অবস্থান।

দেশের ৫৭টি নদীর পানিসহ বিভিন্ন দেশের নদীর পানি এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পানি সংক্রান্ত প্রায় সব তথ্যই এখান থেকে মানুষ জানতে পারবে। সরকার যিদি পানি জাদুঘরটিতে পৃষ্ঠপোষকতা করে তবে দর্শনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিসহ পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় হিসেবে পানি জাদুঘর নতুনমাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, নদ-নদী ও পানিসম্পদ রক্ষায় নীতিনির্ধারকদের আরও উদ্যোগী করে তোলা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘরটির প্রতিষ্ঠা করা হয়। নদী ও নদী কেন্দ্রীক মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে উদ্যোক্তারা জেলার কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জে স্বল্প পরিসরে স্থাপন করেন জাদুঘরটি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, আন্ধারমানিক, তিস্তা, করতোয়া, সুরমা, কুশিয়ারা, কর্নফুলী, নাফ, দুধ কুমার, সাঙ্গু সহ মোট ৫৭টি নদীর পানি সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে এখানে। এর মাধ্যমে নদী ও পানির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় দর্শনার্থীদের।

এছাড়াও নেপাল ও মিয়ানমারের বিভিন্ন নদীর পানি সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে নদী গবেষণা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের বই। এখানে হারিয়ে যাওয়া নদী, বর্তমান নদীর ছবি, নদীগুলোর ভবিষ্যৎ এবং দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের নদী ও পানিকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকার গল্প জানা যাবে। পানি জাদুঘরে রাখা হয়েছে হাড়ি-পাতিলসহ মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র, মাছ ধরার জাল ও চাইসহ বিভিন্ন উপকরণ।

উপকূলীয় জনকল্যাণ সংঘের সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের মহিলা ও পুরুষ মিলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আভাসের উদ্যোগে গড়ে তোলেন একটি আত্মনির্ভরশীল সমাজ সেবা সংগঠন, উপকূলীয় জন কল্যাণ সংঘ। প্রায় ৪৮৫ সদস্য নিয়ে এ সংগঠনটি নিজেদের অর্থায়নে কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশে ১৫ শতাংশ জায়গা ক্রয় করে। পরবর্তীতে অ্যাকশন এইড ও আভাস এর সহায়তায় এখানেই গড়ে তোলা হয় এশিয়া মহাদেশের প্রথম পানি জাদুঘর। জাদুঘরটি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। জাদুঘর পরিদর্শন বাবদ জনপ্রতি ১০ টাকা দর্শনীয় ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আভাসের প্রকল্প কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, নদী কেন্দ্রীক জীবন-জীবিকার ওপর কাজ করতে গিয়ে কমিটির পক্ষ থেকে একটি পানি জাদুঘরের প্রস্তাব আসে। নদী সম্পদকে উন্নয়নের আওতায় নিয়ে আসার জন্য মূলত এই পানি জাদুঘরটি স্থাপন করা হয়েছে। পানিসম্পদ কেন্দ্রীক মানুষের চিন্তার প্রসার ঘটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে এ জাদুঘরে। এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিভিন্ন চিত্র, উপকরণ ও সাজসজ্জার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে জাদুঘরটি।

মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, জাদুঘরটি আগামীতে আরো সমৃদ্ধ ও কলেবর বৃদ্ধির পরিকল্পনা আছে। যা আমাদের চিন্তাকে আরো প্রসারিত করবে এবং পনিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সরকারের দিক নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। সর্বোপরি পানিসম্পদ ব্যবহারে আমাদেরকে আরো সচেতন করতে সহায়ক হবে এটি।

আভাসের নির্বাহী পরিচালক ও অ্যাকশন এইডের সাধারণ পরিষদ সদস্য রহিমা সুলতানা কাজল বলেন, পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি এখানে রাখা হয়েছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দুর্লভ কিছু উপকরণ, যা মানুষের জানার জগতকে সমৃদ্ধ করবে।

রাহিমা সুলতানা কাজল আরও বলেন, পানি জাদুঘরের সামনেই আছে একটি নৌকা। এটি অর্ধেক বালুতে ডোবানো। নদী মরে যাওয়ার গল্পের প্রতীক এটি। এখন নদীপাড়ের মানুষের জীবনও শুকিয়ে যাচ্ছে, বালুতে আটকে যাওয়া এ নৌকার মাধ্যমে তা তুলে ধরা হয়েছে। নৌকার বুকে বিঁধে আছে দুটি গজাল, যা নদীমাতৃক এই দেশকে মেরে ফেলার চেষ্টার প্রতীক। সরকার যিদি পানি জাদুঘরটিতে পৃষ্ঠপোষকতা করে তবে দর্শনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি সহ পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় হিসেবে পানি জাদুঘর নতুনমাত্রা যোগ করবে।

অ্যাকশন এইডের তথ্যমতে, প্রায় ৭০০ নদী-উপনদীর আশীর্বাদে গড়ে উঠেছে এই দেশ। বিদ্যমান নদীগুলোর মধ্যে ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, পানি প্রবাহে বাঁধা তৈরি করা ও অতিমাত্রায় পরিবেশ দূষণের কারণে নদীগুলো ক্রমশ: হারাচ্ছে স্বকীয়তা। পানির কৃত্রিম সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ঘটছে পরিবেশ বিপর্যয়। প্রভাব পড়েছে দেশব্যাপী কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি, সংস্কৃতি, মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক কাঠামোর ওপর। পানি, বায়ু ও সূর্যের রশ্মি হলো স্বীকৃত প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এ জাদুঘরটি স্থাপন করা হয়।

পানি জাদুঘরে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী মো: আল-আমিন বলেন, পানি জাদুঘরটি আসলেই একটি চমৎকার সংরক্ষণ। এটি দেখে আমি আনন্দিত। এখানে স্থান পেয়েছে হারিয়ে যাওয়া নদীর স্মৃতিগুলো।

দর্শনার্থী কল্লোল হাওলাদার বলেন, দেশ-বিদেশের সব নদ-নদী ঘুরে দেখা সম্ভব না। তাই পাখিমারায় স্থাপিত পানি জাদুঘরে এসেছি। কোন জেলায় কী কী নদী রয়েছে তা এখানে এসে জানা যায়। এটা ভিন্ন এক ধরনের অভিজ্ঞতা।

খুলনা থেকে আসা দর্শনার্থী নয়নিকা আহমেদ বলেন, এ জাদুঘরে এসে কোন নদীর পানি কী রকম তা দেখার সুযোগ মিলেছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পানি জাদুঘরটি আরো সমৃদ্ধশালী হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ পানি জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, এনজিও আভাসের নির্বাহী পরিচালক ও অ্যাকশন এইডের সাধারণ পরিষদ সদস্য রাহিমা সুলতানা কাজল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মীসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা।

মানবকণ্ঠ/আরবি






ads