প্রসূতির পেটে গজ রেখে সেলাই

আশরাফুল ইসলাম রঞ্জু

মানবকণ্ঠ
ছবি - প্রতিবেদক।

poisha bazar

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:০৮,  আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:৩১

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা সদরে অবস্থিত ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এ ভুল অপারেশনে চরম বিপাকে পড়েছেন রোগী ও রোগীর পরিবার। সিজার অপারেশনের পর পেটের মধ্যে ‘গজ’ রেখেই অপারেশন শেষ করায় চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েছে রোগী। এতে রোগীর জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়ে। অবশেষে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে পেট থেকে ‘গজ’ বের করা হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রামেক হাসপাতালে ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন রোগী সোখিনা বেগম (৩৫)।

এছাড়াও অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষাসহ ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের’ কার্যক্রম চালানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এঘটনার শিকার সোখিনা বেগম জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তী ইউনিয়নের কৃষ্ণচন্দ্রপুর গ্রামের মো. তোহরুল ইসামের স্ত্রী। তোহরুল ইসলাম একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। সোখিনা একই উপজেলার ধাইনগর ইউনিয়নের রানীনগর গ্রামের সামশুদ্দিনের মেয়ে।

ভুক্তভোগীর স্বামী জানান, জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তী ইউনিয়নের কৃষ্ণচন্দ্রপুর গ্রামের মো. তোহরুল ইসামের স্ত্রী সোখিনা বেগম সন্তান সম্ভবা। গত ১১ নভেম্বর বিকেলে সোখিনার প্রসব যন্ত্রণা হলে স্বামী ও পরিবারের লোকজন শিবগঞ্জ পৌর এলাকার ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এ নিয়ে যায়। যদিও সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকের কাগজপত্রে লেখা রয়েছে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ হাসপাতাল’। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষার পর সেন্টারের ডা. কামাল উদ্দিন নামের চিকিৎসক সিজার অপারেশন করেন। সোখিনার একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। ১৪ নভেম্বর সোখিনাকে সেন্টার থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়।

‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’ কর্তৃপক্ষ নওদাপাড়াস্থ রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. কামাল উদ্দিন নামের চিকিৎসক সিজার অপারেশন করার কথা বললেও, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ডা. কামাল নামের কোন চিকিৎসক নওদাপাড়াস্থ রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেই।

এঘটনায় অনেকেরই ধারণা, নিজেদের বাঁচাতে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’ কর্তৃপক্ষ ওই চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করতে পারে।

জানা গেছে, সিজারের কয়েকদিন পর থেকেই সাখিনার পেটে ব্যাথা শুরু হয়। ক্রমশ ব্যাথা বাড়তে থাকায় আবারও ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এ সোখিনাকে নেয়া হয়। সেখানে ‘আলট্রাসনোগ্রাম’ করে। কিন্তু সেন্টারের চিকিৎসক কোন রোগ নির্ধারণ করতে না পারলেও নতুন করে ঔষধ লিখে দেন। কয়েকদিনে মধ্যেই ব্যথা সেরে যাওয়ার কথা বললেও ব্যথা না কমে আরও বাড়তে থাকে এবং পেট ফুলতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে পুণরায় ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এ নিয়ে যায় পরিবারের লোকজন। আবারও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অপারেশনের প্রস্তাব দিলে রোগীর স্বজনরা ওই সেন্টারে অপারেশন না করে রোগীকে অবশেষে গত ৬ ডিসেম্বর রামেক হাসপাতালে ভর্তি করে। ইতোমধ্যেই সোখিনার দেহ থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং উৎকট দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক দ্রুত সোখিনার আলট্রাসনোগ্রাফি করলে রিপোর্টে সোখিনার পেটের মধ্যে ‘গজ’ (অপারেশন সামগ্রী) রয়েছে বলে নিশ্চিত হন।

গত ৮ ডিসেম্বর বিকেলে অপারেশনের ব্যবস্থা করে রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অপারেশনে সোখিনার পেট থেকে প্রায় দেড় ফুট ‘গজ’ বের হয়। এঘটনায় রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ রোগীর স্বজন ও সচেতন মহলের মাঝে চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

এব্যাপারে রোগীর স্বামী তোহরুল ইসলাম সিজারিয়ান অপারেশনের পর রোগীর জীবন সংকটাপন্ন জানিয়ে বলেন, এভাবে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা বা তামাশা করা শিবগঞ্জের ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এর মালিক, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও অন্যান্যদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হোক। আমরা গ্রামের সহজ সরল মানুষদের সাথে সেন্টারের লোকজন চিকিৎসার নামে প্রতারণা বা অত্যাচার চালাচ্ছে। আল্লাহ’র রহমতে সোখিনা কোনমতে বেঁচে রয়েছে।

আর কোনো মানুষ যেন এভাবে চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রতারণার শিকার না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ওই সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সোখিনার স্বামী তোহরুল ইসলাম।

এব্যাপারে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এর পরিচালক নূর নবীসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে কেউই ফোন রিসিভ করেন নি। বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাক্তার সাইফুল ফেরদৌস খায়রুল ইসলাম আতাতুর্ক। তিনি বলেন, শিবগঞ্জের ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এ সোখিনা নামের এক রোগীর সিজার অপারেশনে ভুল করে পেটের মধ্যে গজ রেখে সেলাই করে দেয়। পরে ৮ ডিসেম্বর রামেক হাসপাতালে অপরেশন করলে সোখিনার পেট থেকে গজ পাওয়া যায়।

এব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এ সোখিনা নামের এক রোগীর সিজার অপারেশনে ভুল করে পেটের মধ্যে ‘গজ’ থেকে যায়। পরে রামেক হাসপাতালে পুনরায় অপারেশনে সোখিনার পেট থেকে গজ বের করা হয়। এ ঘটনায় সোখিনার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এর কোন অনুমোদন না থাকা বিষয়ে প্রতিবেদকের প্রশ্নে সিভিল সার্জন বলেন, প্রাথমিকভাবে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’-এর অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে। অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠান কিভাবে চলছে, সেটা তদন্ত শেষে বলা যাবে। তদন্তে অবৈধ প্রমাণিত হলে এটি সিলগালা করে দেয়া হবে।

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষায় এগিয়ে আসবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ- এমনটাই আশা করছেন ভূক্তভোগী পরিবার, এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...