বাসক চাষে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের হাতছানি

আমিনুল ইসলাম

মানবকণ্ঠ
ছবি - প্রতিবেদক।

poisha bazar

  • ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ১০:২৯

গ্রামাঞ্চলে বাসক (ওষুধি) পাতার কদর চিরায়ত। সর্দি, কাশি বা শ্বাসনালির অসুখ সারাতে এই পাতার রসের উপকারিতা সবারই জানা। এছাড়াও বাসক পাতার নির্যাসরস বা সিরাপ শ্লেষ্মা তরল করে নির্গমে সুবিধা করে। শুধু তাই নয়, এখন ওষুধ কোম্পানিগুলোও বাসক পাতার কদর দিতে শুরু করেছে। ওষুধিগুণ এত বেশি যে, এই পাতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে কাশির সিরাপ। অন্যদিকে বাসক চাষও সহজ। রাস্তার ধারে, বড় বড় গাছের ফাঁকা স্থানে, বাড়ির উঠান, নদীরপাড়, ক্ষেতের আইল, খেলার মাঠের চারপাশসহ যে কোনো স্থানে যে কোনো মৌসুমে ব্যাপক বাসক চাষ সম্ভব।

বাসক চাষে সার-কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। গবাদি পশুর খাদ্য না হওয়ায় পাহারার প্রয়োজন হয় না। বাসকে শুধু মানব স্বাস্থ্যরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা অর্জন ছাড়াও মাটির ক্ষয়রোধ, নির্মল পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কৃষিক্ষেত্রে বৈচিত্র আনয়নসহ সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে ওঠবে। ইতোমধ্যে বাসক চারা রোপণ করে দেশের অন্যান্য স্থানের মহিলারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

এ ধারণাকে কাজে লাগিয়ে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের অধুনাবিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার পরিত্যক্ত ভূমি ব্যবহার করে হাজারো দুস্থ, অসহায় প্রান্তিক মানুষের খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে স্বপ্নকুঁড়ির অনন্য উদ্যোগ ভেষজ বাসক চাষ কর্মসূচি। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন দাসিয়ারছড়াসহ কুড়িগ্রাম সদরে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

১৬টি নদ-নদী বিধৌত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তর্বতী জেলা কুড়িগ্রাম। শিল্পায়নসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের তুলনামমূলক বিচারে পিছিয়ে থাকা এ জেলার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কৃষি ও বনায়নের বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ তথা মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে বদ্ধপরিকর।

জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারায় সামিল হতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে শিক্ষিত বেকার যুবকদের প্রশিক্ষিত মানব সম্পদে পরিণত করতে কৃষিসহ সার্বিক উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে জেলার সকল শ্রেণিপেশার মানুষ ও সরকারি-বেসরকারি সংগঠনকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ট্রেনিং হাব (একত্রীকরণের প্লাটফর্ম) স্বপ্নকুঁড়ি। যার মূল স্লোগান ‘স্বপ্ন দেখি,স্বপ্ন দেখাই’। স্বপ্নকুঁড়ির উদ্যোগ বাসক চারা রোপণ কার্যক্রম শুধু দাসিয়ারছড়ায় নয় ফুলবাড়ী তথা জেলার সকল ইউনিয়নে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা, অবহেলা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার আর পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এখন আলোকিত জীবনে দাসিয়ারছড়াবাসী। তাদের জীবন মান উন্নয়নে বর্তমান সরকার দ্রুততম সময়ে অবকাঠামোসহ সার্বিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন করেছে। এ ছাড়াও এখানকার শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নানামুখী সাহায্য সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর করে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করা হয়েছে ।

মুক্ত এ উর্বর ভূমিকে কাজে লাগিয়ে প্রায় দুই হাজার মহিলার কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে দাসিয়ারছড়ার বালাতাড়ি থেকে রাশ মেলা পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার রাস্তার দুই ধারে একযোগে ৩০ হাজার বাসক চারা রোপণ করা হয়েছে। এ বছরই আরো ৩০ হাজার চারা রোপণসহ এক লাখ চারা রোপণের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। জেলার ইতোমধ্যে এ প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছে। বাসক রোপণের স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় বৃক্ষরোপণ-২০১৮-তে কুড়িগ্রাম জেলা তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে।

সরেজমিন দাসিয়ারছড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বাসক নিয়ে দাসিয়ারছড়ার গ্রামগুলোতে এরই মধ্যে সাড়া পড়ে গেছে। দাসিয়ারছড়ার কামালপুর, ছোটকামাত, কড়িয়াটারী, সমন্বয়পাড়া, বোর্ডেরহাট,বানিয়াটারী,দোলাপাড়ার রাস্তার দুই ধারের বাসক চারাগুলো এক থেকে দেড় ফুট উচ্চ হয়েছে। এ চারা গাছগুলো ডালপালা মেলে বেশ জায়গা দখল করে নিয়ে রাস্তার শোভাবর্ধন করেছে। যা পথিকদের সহজেই নজর কাড়ে। স্থানীয় অধিবাসীরা জমির চারধারে, বাড়ির চারপাশে বাসক দিয়ে বেড়া দিচ্ছে। আশপাশের গ্রাম আজোয়াটারী, চন্দ্রখানা, শ্যামপুর, ছড়ারপাড়, কুটিচন্দ্রখানা, গংগারহাটসহ ১৬টি গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে বাসক চাষ। দূর-দূরান্তের অনেক গ্রাম থেকে লোকজন আসছে বাসক চাষের পরামর্শ নিতে।

প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, বাসকের পর র্পযায়ক্রমে বহেরা, হরিতকি,থানকুনি,পাথরকুঁচি,এ্যালোভেরাসহ নানা জাতের ওষুধি গাছ সৃজন করা হবে। ইতোমধ্যে স্কয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানি পাতা ক্রয়ের আগ্রহ দেখিয়েছে। ডিবি হেলথ কেয়ারের প্রতিনিধি হোসেন জামিল জানান, বাসক পাতার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। জার্মান প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাসক পাতা থেকে সিরাপ তৈরি হচ্ছে। দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে।

বালাতাড়ি গ্রামের আলেকজান বেগম বলেন, আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বাসক চারা লাগাচ্ছি। খড়িয়াটারী গ্রামের নুরজাহান বলেন, এখন ছেলেমেয়ের সর্দি কাশি হলে কাঁচা পাতার রস করে খাওয়াই। তাতে অসুখ ভালো হয়। স্বপ্ন প্রকল্পের সুবিধাভোগী মিষ্টি বেগম বলেন, এতদিন কাজ না পেয়ে কষ্টে ছিলাম। এখন বাসক প্রকল্পে কাজ করে অভাব দূর হয়েছে। ভবিষ্যতে এর থেকে আমরা লাভবান হবো। উপজেলার বোর্ডেরহাটের কবিরাজ জিয়াউদ্দিন বলেন, দাসিয়ারছড়ায় বাসক পাতা উৎপাদন হলে এ অঞ্চল থেকে হারিয়ে যাওয়া কবিরাজী পেশায় গতি সঞ্চার হবে। ভেষজ ব্যবহারে মানুষের রোগ বালাই কমে আয়ু বেড়ে যাবে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন বলেন ‘বাসক চাষে হতদরিদ্র, প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান ও আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে আসবে। তাই সকলকে নিয়ে এ উদ্যোগটি গ্রহণে স্থানীয়দের উদ্ধুদ্ধ করা হয়েছে। শুধু আর্থিক সচ্ছলতা নয় বাসক চাষ কুড়িগ্রামকে সবুজ বনায়নে পরিণত করবে । ওষুধি বাসকচারা সম্প্রসারণে আমার বাড়ী আমার খামার ও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সড়কের দু’পার্শ্বে বাসক চারা লাগানোর ব্যাপারে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads






Loading...