কলাপাড়া আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীরা যখন কোটিপতি

গোফরান পলাশ, কলাপাড়া

মানবকণ্ঠ
আওয়ামী লীগ - দলীয় পতাকা।

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৩০

অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যখন সতর্ক অবস্থানে দল, তখন পটুয়াখালীর কলাপাড়া আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে প্রতিনিয়ত কোণঠাসা হচ্ছেন দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা। কলাপাড়ায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গ সংগঠনগুলোর কমিটি গঠনে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। গত দশ বছরে বিএনপি-জামায়াত, ফ্রিডম পার্টি ও জাতীয় পার্টি থেকে অগনিত নেতা-কর্মীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে আওয়ামী লীগে। আর এদের অনেকেই প্রভাবশালী কয়েক নেতার সাথে বিশেষ সম্পর্কে ইতোমধ্যে সহযোগী সংগঠনে পদ-পদবী লাভে সক্ষম হয়েছেন। জানা গেছে, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী ত্যাগী নেতা-কর্মীদের খুঁজে দলের পদ দেয়ার ঘোষণা যেমন অনুসরণ করা হচ্ছে না, তেমনি দলের পদ পদবী দেয়ার আগে ওই সকল নেতা-কর্মীর পূর্বের রাজনৈতিক ইতিহাসসহ পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস যাচাই করা হচ্ছে না। এতে ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা কলাপাড়া আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী এসকল নেতা-কর্মীদের চিহ্নিত করে শুদ্ধি অভিযানের দাবি তুলেছেন। এনিয়ে ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের দেয়া ফেসবুক ষ্ট্যাটাসে তোলপাড় চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ক্ষমতাসীন আ’লীগের স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আ’লীগ সরকার গঠনের পর বিএনপি-জামায়াত, ফ্রিডম পার্টি, জাতীয় পার্টি থেকে আখের গোছাতে অনেক নেতা-কর্মী আ’লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনে অনুপ্রবেশ করে। এদের মধ্যে ক’জন ছাত্রলীগ নেতা অভিগাজী হত্যা মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন। আবার ক’জন গণধর্ষণ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন। এদের বেশ ক’জন মূল দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বলাভ সহ স্থানীয় সরকার পরিষদের জনপ্রতিনিধিও বনে গেছেন, যাদের বিরুদ্ধে বিরোধী দলে থাকাকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ অফিস, সভা-মঞ্চ ভাঙচুর করা সহ নেতা-কর্মীদের রক্তাক্ত জখম সহ নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

দলীয় সূত্রটি আরও জানায়, জামায়াত রোকন সদস্য মজিবর আ’লীগে যোগ দিয়ে সাবেক প্রতীমন্ত্রী মাহবুব’র বোন জামাই হিসেবে কোটিপতি। মাহবুব’র ভাগ্নি জামাই আবু সালেহ প্রাইভেট টিউটর থেকে এখন ইটভাটা মালিক এবং নাতি জামাই প্রভাষক বাচ্চু (লাল বাচ্চু) এখন ঠিকাদারী ব্যবসায় কোটিপতি। উপজেলা কৃষক দলের সাবেক সম্পাদক দোলোয়ার মেম্বর ও সাবেক ছাত্রদল সম্পাদক প্রভাষক শাহালম এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের অলিখিত উপদেষ্টা। জাপার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইউসুফ আলী মিয়া এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। যার বিরুদ্ধে প্রতিমন্ত্রী মাহাবুব আমলে বহুল আলোচিত গঙ্গামতি ট্রেডার্স’র ঠিকাদারী বাণিজ্যে পাউবো’র শত কোটি টাকার প্রকল্প হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইউসুফ’র জামাই কবির মৃধা ও তার বন্ধু নিজাম আকন ছাত্রদল থেকে আ’লীগে যোগ দিয়ে গত ১০ বছরে ঠিকাদারী ব্যবসায় কোটি কোটি টাকার মালিক। জাপার সাবেক সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা হাবিুবুর রহমান আওয়ামীলীগ নেতা ও প্রতিমন্ত্রী মাহবুব’র ঘনিষ্ঠজন হয়ে সাপ্লাই সমবায় সমিতির সভাপতি হিসেবে কোটিপতি। জাতীয় পার্টি’র যুবসংহতি নেতা ফিরোজ সিকদার স্বেচ্ছা সেবক লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের কাউন্সিলর হয়েছেন আ’লীগের টিকিটে। যুব সংহতির অপর নেতা বাচ্চু মীরা এখন তাঁতী লীগের উপজেলা সম্পাদক। উপজেলা মহিলা দল সভানেত্রী রাশিদা বেগম এখন মহিলা আ’লীগের আহবায়ক কমিটির প্রভাবশালী সদস্য। চাকামইয়ার বিএনপি নেতা মকবুল দফাদার এখন আ‘লীগে যোগ দিয়ে নৌকার প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার পায়তাঁরায় লিপ্ত। জাপা থেকে ছুটে আসা শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস এখন উপজেলা লীগের সদস্য হয়ে লালুয়া ইউপি চেয়ারম্যান। ইউপি নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি’র যুবদল থেকে আসা ধানখালী ইউনিয়নের টিনু মৃধা নৌকা প্রতীক পেয়ে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে পরাজিত। কুয়াকাটা জাপা নেতা আনোয়ার হাওলাদার আ’লীগে যোগ দিয়ে বর্তমান সাংসদের ঘনিষ্ঠজন এবং কুয়াকাটা মেয়র পদে আ’লীগের টিকেটে নির্বাচন করতে পায়তাঁরায় লিপ্ত। জয়বাংলা ক্লাবে আশ্রয় নিয়ে বিএনপি-জামাত নেতারা এখন আওয়ামী লীগার। এছাড়া বিএনপি, জামায়াত ও জাপা থেকে দলে অনুপ্রবেশকারী হতে এখনও ভিড় জমাচ্ছে অনেকে।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এবিএম মোশারেফ হোসেন বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় না থাকায় এরা দলের নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রলোভনে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে আ’লীগে যোগ দিয়েছে। এছাড়া কোন কোন নেতা-কর্মীকে অন্যায়ভাবে আ’লীগে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা এসএম রাকিবুল আহসান দলে অনুপ্রবেশের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এমপি মহোদয়ের সাথে আমি দলের তৃণমূলের একাধিক মতবিনিময় সভায় গিয়েছি। শুধু টিয়াখালীতে যাইনি, কারণ সেখানে পরিবেশ ভালো ছিল না এবং সমবেত হওয়া সকল নেতা-কর্মী ছিল অনুপ্রবেশকারী। এছাড়া বর্তমানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে জয় বাংলা ক্লাব’র মধ্যেও বিএনপি-জামায়াত আশ্রয় নিয়েছে। যাদের মামলা, হামলা’য় নির্যাতিত হয়েছে দলের নেতা-কর্মীরা, তারা ইতোমধ্যে দলে অনুপ্রবেশ করেছে। এবং আরও ব্যাপক সংখ্যক অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছে। আর এ বিষয়ে আমি একমাত্র প্রতিবাদ করি। যাতে দলের নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলের সভানেত্রী, সাধারণ সম্পাদক সহ কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়। কিন্তু তবুও মানা হচ্ছে না। বিষয়টি আমি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জেলা কমিটি ও কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবগত করব।

মানবকণ্ঠ/এইচকে



poisha bazar

ads
ads