বর্বরতার পর বার্সেলোনার খেলা দেখে ঘাতকরা


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৪২,  আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:৩৪

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে (২১) বর্বরভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়াকে কেন্দ্র করে শিবির সন্দেহে এই মেধাবী ছাত্রকে খুনের ঘটনায় ক্ষোভ আর বিষাদে ভারি হয়ে উঠেছে বুয়েট ক্যাম্পাস। আবরার হত্যার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বুধবার দুপুরে তাদের ১০ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবি আদায় না পর্যন্ত সব একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেন তারা। নৃশংস ওই হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও জেলা শহরে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বুয়েট শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে মোমবাতি হাতে নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, রোববার গভীর রাতে বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলে টিভি রুমে বার্সেলোনার একটি ফুটবল ম্যাচ দেখেন আবরারের ঘাতক কয়েক ছাত্রলীগ নেতা। তখন দ্বিতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন আবরার। এর আগে হলের ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর কক্ষের টর্চার সেলে তিন দফায় দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে ওই নিরীহ ছাত্রকে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প ও হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে এতে অংশ নেয় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের প্রায় ২০ নেতাকর্মী। সংগঠনটির হল শাখা নেতা অনিক সরকার আবরারকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। রাত আড়াইটার পরে মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘাতক ছাত্রলীগ নেতারা খেলা দেখা বন্ধ করে আবরারকে ফেলে রাখা সিঁড়িতে ছুটে যায়।

এদিকে নিহত আবরার ফাহাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর রায়ডাঙ্গায় গিয়ে স্থানীয় লোকজনের প্রতিরোধের মুখে পড়েন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভিসি (উপাচার্য) অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর গতকাল বিকেলে আবরারের কবর জিয়ারত ও তার মাকে সন্ত্বনা দিতে গিয়ে ফিরে আসেন তিনি। এ সময় নিহতের ছোট ভাই আবরার ফায়াজসহ দুজনকে পুলিশ মারধর করে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ওদিকে বুয়েটের শেরেবাংলা হল শাখা ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহাকে হত্যা মামলার আসামি ও গ্রেফতার করার দাবি জানিয়েছেন নিহত মেধাবী ছাত্র আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে স্বরণ সভায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, যে কক্ষে নিয়ে রাতভর আমার ছেলেকে নিয়ে নৃশংস নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, সেই কক্ষেই থাকেন অমিতসহ চার ছাত্রনেতা। হত্যাকাণ্ডে তারও সম্পৃক্ততা আছে বলে জানতে পেরেছি।

অপরদিকে আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে বুয়েট শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট মো. শাহিনুর ইসলাম পদত্যাগ করেছেন। আর ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। এ ছাড়া গতকাল শিক্ষার্থীদের কাছে ঘটনার রাতে ভিডিও ফুটেজে উপস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান।

অন্যদিকে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় মঙ্গলবার গ্রেফতার তিন আসামিকে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রিমান্ডে নেয়া আসামিরা হলেন- শামসুল আরেফিন রাফাত, মনিরুজ্জামান মনির ও আকাশ হোসেন রাফাত। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে উক্ত আদেশ দেন বিচারক। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শাখাওয়াত ইকবাল অভি নামে আবরারের এক সহপাঠীকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়েছে। আর আগ থেকে ৫ দিনের রিমান্ড আছেন অভিযুক্ত ১০ ছাত্রলীগ নেতা। তারা হলেন- অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, মুনতাসির আলম জেমি, খন্দকার তাবাখ খারুল ইসলাম তানভির, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ ও ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না।

ডিবি সূত্র জানায়, বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় এ যাবত গ্রেফতার ১৩ আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের মুখোমুখি করেও জেরা করা হচ্ছে। হত্যার দায়ও তারা স্বীকার করেছে। কেউ কেউ নিজেকে রক্ষা করতে একে অপরের দিকে বেশি অভিযোগ আনছে। একই সূত্র মতে, মঙ্গলবার রাতে প্রকাশ পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে ঘাতক ছাত্রলীগ নেতাদের ভ‚মিকা ও চেহারা আরো পরিষ্কার হয়েছে। পুলিশের তদন্তেও গ্রেফতারকৃতদের জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দায় স্বীকার করে তারা দুই-একদিন পরই আদালতে স্বীকারোক্তি দেবে। তদন্ত সাপেক্ষে ছাত্রলীগ নেতা অমিতকেও গ্রেফতার করা হতে পারে।

ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃত অনেকে দাবি করেছে, তারা আবরারকে বেধড়ক পিটিয়েছে ঠিকই কিন্তু হত্যাটি পরিকল্পিত ছিল না। ঘটনাক্রমে হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। অপরদিকে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির একজন দায়িত্বশীল নেতা স্বীকার করেছেন, ঘটনার পর তারা নিজেরা যে তদন্ত কমিটি করেছেন, তাতে জানতে পেরেছেন ভারত ও সরকার বিরোধী ফেসবুকে স্টাটাস দেয়ার কারণে শিবির সন্দেহে আবরারকে পেটানো হয়েছে। কয়েক দফা পেটানোর পর কয়েকজন গভীর রাতে টিভিতে বার্সেলোনার খেলাও দেখেছেন।

১০ দফা দাবিতে অনড় শিক্ষার্থীরা: বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। সকালে বুয়েট শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে তাদের দশ দফা দাবি তুলে ধরেন। এদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা জানান বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়লের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তারা ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করেন। এ ছাড়া বুয়েটের কর্মসূচিতে একাত্মতা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমাবেশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

শিক্ষার্থীদের দশ দফা দাবি: ১. খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে শনাক্তকারী খুনিদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২. বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে শনাক্তকৃত সকলকে ১১ অক্টোবর বিকেল ৫টার মধ্যে আজীবন বহিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে। ৩. মামলা চলাকালীন সকল খরচ এবং আবরারের পরিবারের সকল ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। এ মর্মে অফিসিয়াল নোটিশ ১১ তারিখ ৫টার মধ্যে প্রদান করতে হবে। ৪. দায়েরকৃত মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি করার জন্য বুয়েট প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। ৫. অবিলম্বে চার্জশিটের কপিসহ অফিসিয়াল নোটিশ দিতে হবে। ৬. বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে বুয়েটে হলে হলে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে রাখা হয়েছে। তাই আগামী ৭ দিনের মধ্যে বুয়েটে সকল রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করাসহ মোট ১০ টি দাবি তুলে ধরা হয়।

ভিসির পদত্যাগ দাবি শিক্ষক সমিতির: বুয়েটের হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের (ভিসি) পদত্যাগ দাবি করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। গতকাল দুুপুরে শহীদ মিনার চত্বরে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি যোগ দিয়ে এ দাবি জানান সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ। তিনি বলেন, ভিসি পদত্যাগের দাবির বিষয়ে শিক্ষক সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বুয়েটে আগের বিভিন্ন ঘটনায় ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে আজকের এই অবস্থা হয়েছে। আমরা উনাকে এসব ঘটনার জন্য দায়ী করছি। উনাকে বুয়েট থেকে পদত্যাগ করতে হবে। আমরা পদত্যাগ দাবি করছি।

ভিডিও ফুটেজে উপস্থিতির ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক: প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মুমূর্ষু আবরারের কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। আবরারের পাশে তিনি কী করছিলেন, জানতে চাইলে সে সময়ের পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেন তিনি। গতকাল দুপুরে বুয়েটের শহীদ মিনারের পাশের রাস্তায় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের মাঝে হাজির হলে প্রশ্নবাণে জর্জরিত তিনি।

সেদিন রাতে কী ঘটেছিল মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চান শিক্ষার্থীরা। ওই ভিডিও ফুটেজে তার উপস্থিতির কারণও জানতে চান আন্দোলনকারীরা। মিজানুর রহমান বলেন, রোববার রাত পৌনে ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ ও সহকারী প্রাধ্যক্ষ তার বাসায় যান। তারা এসে দরজা ধাক্কা দেন। দরজা খোলার পর তিনি দেখেন, দুজন সিঁড়ির ওপর বসে আছে।

ছাত্রকল্যাণ পরিচালক তাদের জিজ্ঞেস করেন, কী অবস্থা? উত্তরে সহকারী প্রাধ্যক্ষ জানান, হলে একটি মার্ডার (হত্যা) হয়েছে। মিজানুর রহমান বলেন, তখন তার পোশাক বাইরে বের হওয়ার উপযোগী না থাকায়, কাপড় বদলে আসার জন্য ভেতরে যান। এরপর প্রাধ্যক্ষ এবং সহকারী প্রাধ্যক্ষকে নিয়ে তিনি শেরেবাংলা হলে যান।

ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যাদের ছবি তোমরা দেখাচ্ছ, তারা সবাই ওখানে ছিল। তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকটি ডাক্তার। তোমরা যদি এ ছবির ব্যাখ্যা চাও, তাহলে বলছি। ডাক্তার আবরারের নাকে, বুকে হাত দিয়ে বলেন, ছেলেটা অনেকক্ষণ আগে মারা গেছে। এ সময় যারা উপস্থিত ছিল, তারা ডাক্তারকে চাপ দেয়, লাশ যেন এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তার জানিয়ে দেন, তার একার পক্ষে ডেডবডি (লাশ) নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’

এ সময় উপস্থিত ছাত্ররা চিৎকার করে জানতে চান, কারা ডাক্তারকে লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার কোনো দুর্বলতা থাকলে তো এখানে আসতাম না, আমি ব্যাখ্যা দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘ডাক্তার যখন বললেন আবরার মারা গেছে, তখন ছেলেরা আমাদের লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য প্রেশার দিচ্ছিল। আমি বললাম, এটা পুলিশ কেস, আমি লাশ সরাতে পারব না। এদের মধ্যে আমি শুধু রাসেলকে চিনি। ও চাপ দিচ্ছিল। বাকিরা কোনো কথা বলছিল না। আমি ভিসিকে ফোন করি। অনেক রাত হলেও তিনি ফোন ধরেন। তাকে বললাম, এই অবস্থা। উনি বললেন, পুলিশকে ফোন কর। পুলিশ যেভাবে বলবে, সেভাবে কাজ করতে হবে।’

ভিসির সঙ্গে কথা বলে মিজানুর রহমান উপস্থিত ছাত্রদের জানিয়ে দেন, এটা যেহেতু মার্ডার কেস, লাশ তিনি সরাতে পারবেন না। এরপর প্রধান সিকিউরিটি গার্ড আসেন। চকবাজার থানায় খবর দেয়া হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। পুলিশের সঙ্গে একজন ডাক্তার ছিলেন। তারা লাশের সুরতহালের কাজ শুরু করেন।

ঢাবিতে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমাবেশ : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার হত্যার ঘটনায় সমাবেশ করেছে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।

সমাবেশ থেকে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আনু মুহাম্মদ সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোর নিপীড়ন তুলে ধরার জন্য গণতদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।
এতে বক্তব্য রাখেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সায়ীদ ফেরদৌস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আল রাজি। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষার্থীর অভিভাবক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।

সমাবেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, আইন-আদালত বলে বাংলাদেশ কিছু নেই। বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করে না। একজন মন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বলেছেন-প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ছাড়া বাংলাদেশে কিছু হয় না, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ছাড়া যদি কিছু না হয়; ছাত্রলীগের নেতারা তো পরিষ্কারভাবে বলবেন আমাদের এই অধিকার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ এই ছাত্রলীগ গঠন করে কে? নেতাদের নির্দেশ দেয় কে, প্রয়োজনে বরখাস্ত করে কে? সব প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আসে। তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগ পুলিশ-র‌্যাব সবার দায়িত্ব, দেশে কোনো ভিন্নমত থাকবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এম এম আকাশ বলেন, আমাদের সিস্টেম হলো আইন নিজের হাতে তুলে নেব। আমি যদি মনে করি ও অন্যায় করেছে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওকে ধরে পেটাব। বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অসম লেনদেন হচ্ছে। যতটুকু আমরা পাচ্ছি তার থেকে বেশি দিচ্ছি। সরকার তার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ছোট ছোট সাম্রাজ্য তৈরি করেছে এবং প্রত্যেক সাম্রাজ্যের একজন করে অধিপতি তৈরি করে দিয়েছেন। সেটা ছাত্রলীগের নামে হোক, যুবলীগের নামে হোক, ক্যাসিনোর নামে হোক।

তিনি আরো বলেন, লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার মর্যাদা হারিয়েছে। দলকানা রাজনীতিতে চলে গেছে। বিবেক এবং সত্যটাকে অবহেলা করে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা সুবিধার নীতিতে চলে গেছে। আমাদের নৈতিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। এটা আমাদের সবার মধ্যে কমবেশি হয়েছে।

ঢাবি অর্থনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক আরো বলেন, আমরা সবাই জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোথায় কোথায় টর্চার রুম রয়েছে। আমরা সবাই জানি সেখানে কি অত্যাচার হয়। আজকের সমাবেশের পর ওই টর্চার রুমগুলো উঠে যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে গণ রুমের অত্যাচার বন্ধ হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হবেন না। তারা সরকরের সঙ্গে লাইন দিবেন। সরকারকে বলবেন একটু ঠাণ্ডা কর। বেশি গরম হয়ে গেছে একটু ঠাণ্ডা না করলে কিছুই হবে না। এর থেকে মুক্তির পথ কি? এ সময় তিনি বলেন, এর থেকে মুক্তির পথ হলো আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়ে যেখানে প্রতিবাদ করার সেখানে প্রতিবাদ করা। আমরা যেদিন করতে পারব সেদিন আমরা জয়লাভ করব।

সমাবেশে শিক্ষার্থীরা তাদের কথা বলার অধিকারের দাবি জানান। অভিভাবকরা যেন তাদের কথা বলা বন্ধ না করে এবং সাহস জোগায় সে আহ্বান জানান।
সমাবেশ শেষে একটি কালো পতাকা মিছিল বের করা হয়। যেটি শহীদ মিনার প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ক্যাম্পাসে ফিরে আসে।

মানবকণ্ঠ/এএম

 




Loading...
ads




Loading...