দেবিদ্বার ট্রাজেডি

কান্না থামছে না রাধানগরে

শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা

ছবি-প্রতিবেদক।

poisha bazar

  • মানবকণ্ঠ প্রতিনিধি
  • ১২ জুলাই ২০১৯, ২১:৫৬

আষাঢ়ের বৃষ্টি পড়ছে রাধানগর গ্রামে, বৃষ্টির চেয়ে ভারী অশ্রু ঝরছে নিহত নাজমার পরিবারের চোখ থেকে। তার চার সন্তানের কান্নার শব্দ আর টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ একাকার হয়ে আছে রাধানগর গ্রামে। মোসলেম নামক এক ঘাতকের কোপে ৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনার ৩ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো থামছে না কান্না।

নিহতদের একজন নাজমা আক্তার। ঘাতক মোসলেমের দায়ের কোপে তার স্বামী ও শাশুড়ি মারাত্মক আহত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

শুক্রবার (১২ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে নিহত নাজমা আক্তারের বাড়ি গেলে দেখা যায় তার অসহায় অবুঝ চার শিশু সন্তানের ভয়ার্ত চেহারা। তার দশম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে জান্নাত আক্তার বলেন, একদিকে মা নেই, অপর দিকে একই ঘটনায় বাবা ও দাদীও আহত হয়ে হাসপাতালে। যিনি আমাদের পরিবারের সবসময়ই খোঁজ- খবর নিতো, তার হাতেই আমার মায়ের প্রাণ গেলো। আমরা ভাত খেয়েছি কিনা যে মোখলেছ কাকা দুই ঘন্টা আগেও খোঁজ-খবর নিলো, সেই মোখলেছ কাকা কিভাবে আমার মাকে খুন করলো! আমার মাকেই সবচেয়ে বেশি কুপিয়েছে সে। তার পরিবারে সাথে আমাদেরই সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল। এত ভালো সম্পর্ক থাকার পরও সে কিভাবে এত নির্মম-পাশবিকভাবে কুপিয়ে সবাইকে কোপালো? আপনারা আমার বাবা ও দাদীকে বাচাঁন, না হয় আমরা একবারে এতিম হয়ে যাবো, আমাদের দেখার কেউ থাকবে না।

ঘাতকের দায়ের কোপে গুরুত্বর আহত হয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন রিক্সা চালক বাবা নুরুল ইসলাম (৫০) ও দাদী মাজেদা বেগম(৬৫)। ওই দিন ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছিলো মা নাজমা আক্তারের। জান্নাতরা দুই ভাই ও দুই বোন। জান্নাত সকলের বড়। সে রাধানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। ছোট ভাই নাজমুল হাসান সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে আবু নাঈম, সকলের ছোট বোন সানজিদা আক্তার পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে।

জান্নাত জানায়, ঘাতক মোখলেছের মেয়েও তার সাথে পড়ে। সেই সুবাদে মোখলেছের ঘরে আসা যাওয়া ছিল জান্নাতের।
সে বলে, ঘটনার দিন (১০ জুলাই বুধবার) সকাল ৮টার দিকে আমি ওদের ঘরে যাই। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন আমি ভাত খেয়েছি কিনা? না খেয়ে থাকলে তাদের ঘরে ভাত খেতে বলেন। আমি বলি না মোখলেছ কাকা, আমি আম মুড়ি খেয়ে এসেছি, এখন ভাত খাব না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাদের ঘর থেকে এসে স্কুলে যাই আমি। এর প্রায় দুই ঘন্টা পর ছোট ভাই আবু নাঈম স্কুলে গিয়ে আমাকে জানায় মোখলেছ আমার মাকে খুন করেছে এবং বাবা ও দাদীকেও দা দিয়ে কুপিছে। দৌড়ে এসে দেখতে পাই বাড়ির সামনে রাস্তায় মায়ের রক্তমাখা নিথর দেহটা পড়ে আছে। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কেউ আমার মাকে এত নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করতে পারে।

জান্নাত আক্তার আরও জানায়, আমার ছোট ভাই বোনগুলো কিছুই মুখে দিতে চায় না। শুধু মা মা করে। মাকে দেখতে চায়। বাবাকে দেখতে চায়। কী উত্তর দেবো ভাই-বোনদের?
এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জান্নাত। তার বুকফাটা কান্নায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস। যে-ই সান্ত্বনা দিতে আসে সে-ই কাপড় দিয়ে চোখ মুছে।

স্থানীয় আবদুল হাকিম বলেন, তাদের কী সান্তনা দেবো? এই মা হারা এতিম শিশুদের দেখলে নিজেই তো সান্তনা খুঁজে পাই না।

উল্লেখ্, গত ১০ জুলাই সকাল সাড়ে দশটার দিকে দেবিদ্বার উপজেলার রাধানগর গ্রামের মুর্তজ আলীর ছেলে রিক্সা চালক মোখলেছুর রহমান একটি ধারালো দা দিয়ে আকস্মিক লোকজনকে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। এ সময় প্রতিবেশী নুরুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা আক্তার (৪০), মৃত শাহ আলমের ছেলে আবু হানিফ(১০) এবং স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪৫) কে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘাতক মোখলেছের দায়ের কোপে আব্দুল লতিফ (৪৫), মাজেদা বেগম (৬৫), নুরুল ইসলাম (৫০), রাবেয়া বেগম (৪০), ফাহিমা (১০), জাহানারা বেগম (৫০) ও লোকমান হোসেন (১৭) সহ ৭ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে মাজেদা বেগমের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ওই সময় গণপিটুনীতে ঘাতক মোখলেছ ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads




Loading...