রিফাত হত্যা : গডফাদারদের গ্রেফতার দাবি স্বজন ও এলাকাবাসীর

শাহীন করিম ও সালেহ টিটু


poisha bazar

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ০৪ জুলাই ২০১৯, ১১:২৪

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনিচক্রকে দীর্ঘদিন ধরে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিলেন সরকার দলীয় স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। তারাই নয়ন ও রিফাত ফরাজীর মতো দুর্ধর্ষ তরুণ অপরাধীদের নেপথ্যের গডফাদার এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

তাছাড়া মাদক কারবারি ও পুলিশের সোর্স হওয়ার সুবাদে মাঠ পর্যায়ের কতিপয় অসাধু পুলিশ সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল অপরাধচক্রটি। বরগুনা শহরের মানুষ তাদের নাম জেনেও ভয়ে তা প্রকাশ করতে পারেনি বলে অভিযোগ তাদের। অপরাধের মূল উৎপাটন করতে সেই সব নেপথ্যের গডফাদারদেরও আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন নিহত রিফাতের স্বজন ও সচেতন এলাকাবাসী।

এদিকে বরগুনা শহরে প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রীর সামনে স্বামী রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজীকেও মঙ্গলবার রাতে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে আদালতে হাজির করে তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। দেশজুড়ে সাড়া ফেলা ওই হত্যাকাণ্ডে পরিকল্পনাকারী সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের (বন্দুকযুদ্ধে নিহত) সন্ত্রাসী বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড এই মাদকসেবী ও কারবারি রিফাত।

হত্যাকাণ্ডে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছে রিফাত শরীফকে। রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই রিশান ফরাজী রিফাত শরীফকে পেছন থেকে ধরে রাখছে। স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নি স্বামীকে রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে।

অপরদিকে একটি গোয়েন্দা সূত্র বলছে, গ্রেফতার হওয়া রিফাতের আপন ছোট ওই হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামি রিশান ফরাজী, মুসা, রাব্বি আকন ও মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাতও গোয়েন্দাজালে আটকা পড়েছে। তারা যে কোনো সময় গ্রেফতার হবে। তবে তাদের আটকের বিষয়টি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বীকার করেনি পুলিশ।

স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, বরগুনার মতো একটি ছোট শহরে রাজনৈতিক ও পুলিশের পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে কেউ দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিসহ নানা অপরাধ চালিয়ে যেতে পারত না। নেপথ্যের গডফাদারদের প্রশ্রয়েই নয়ন-রিফাতরা ধরাকে সরা জ্ঞান করত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বরগুনার সরকার দলীয় এমপিপুত্র অ্যাডভোকেট সুনাথ দেবনাথ নয়ন বন্ডকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিত। এছাড়া মাদক কারবার চালিয়ে যেতে সদর থানার একাধিক এসআই ও এএসআইয়ের সঙ্গেও সখ্যতা সন্ত্রাসী নয়ন বন্ডের। সে একাধিকবার গ্রেফতার হলেও এমপিপুত্রের সহায়তার কারণে দ্রুত ছাড়া পেয়েছে। নয়ন ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয়ে সব ধরনের অপকর্ম চালিয়ে আসছিল। যদিও এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দিকে ইঙ্গিত করেছেন সুনাম দেবনাথ।

অন্যদিকে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি এবং বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে ছাত্রলীগ নামধারী রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী কাউকেই পরোয়া করত না। তবে রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীকে ভায়রার ছেলে হিসেবে স্বীকার করলেও তারা মাদকাসক্ত হওয়ায় ওই পরিবারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে প্রধান ঘাতক নয়ন বন্ড নিহত ও রিফাত ফরাজী গ্রেফতার হওয়ায় তাদের মধ্যে কিছু স্বস্তি এসেছে। তবে নেপথ্যের হোতাদের গ্রেফতার করা না হলে কিছুদিন পর নতুন করে নয়ন বন্ড ও রিফাতদের মতো অপরাধীর জন্ম হবে। সমাজে জঘন্যতম অপরাধও চলতে থাকবে।

নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ ও মা ডেইজি শরীফও বলেছেন, আমাদের ছেলের প্রধান দুই খুনি নয়ন গুলিতে নিহত ও রিফাত ফরাজী গ্রেফতার হওয়ায় আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে কাদের কারণে এমন জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটাতে সাহস পেল, অবশ্যই তাদের খুঁজে বের করা জরুরী। আমরা চাই না, কারো আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা কোনো খুনিচক্র অন্য কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি করুক।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বরগুনার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, প্রথমে আমরা রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত ঘাতকদের একে একে আইনের আওতায় আনছি। এদের পেছনে কোনো গডফাদার থাকলে তদন্তে তা বেরিয়ে আসবে। সম্পৃক্ততা পেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী:
সম্পর্কে তারা আপন ভাই। একসঙ্গেই তারা সব অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। বরগুনা পৌরসভার ধানসিঁড়ি সড়ক এলাকার দুলাল ফরাজীর বড় ছেলে রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী। ওই এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, নয়ন বন্ডের ডান হাত ও বাম হাত হিসেবে কাজ করত এই দুই ভাই। মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসাই ছিল এদের মূল পেশা। এদের বিরুদ্ধে একাধিক ছিনতাই ও ছাত্রদের মেসে ঢুকে মুঠোফোন কেড়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক যখম করে রিফাত ফরাজী। তার বিরুদ্ধে মাদক কারবারির অভিযোগসহ চারটি মামলা রয়েছে।

এলাকাবাসী ও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, নয়ন ও রিফাত দীর্ঘদিন ধরে নানা অপরাধে জড়িত থাকলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলত না। বারবার আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ত তারা। রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিফাত ও নয়নের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা।

জানা গেছে, চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে রিফাত ফরাজীকে পুলিশ মাদকসহ আটক করেছিল। ওই ঘটনার পর তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল।

এর আগে বরিশালের মাদক নিরাময় কেন্দ্র হলিকেয়ারের সাবেক চেয়ারম্যান বরগুনার বাসিন্দা আরিফ খান বলেন, বছর তিনেক আগে রিফাতের পরিবার তাকে হলিকেয়ারে ভর্তি করেছিল। কিছুদিন চিকিৎসার পর হলিকেয়ার থেকে নিয়ে আসে। পুরো চিকিৎসা না করানোর ফলে বরগুনায় এসেই রিফাত আবার মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে বরগুনা সরকারি কলেজ থেকে ফেরার পথে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীসহ একদল সন্ত্রাসী রিফাত শরীফের ওপর হামলা চালায়। তারা ধারালো রামদা দিয়ে রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায়। রিফাতের স্ত্রী আয়শা হামলাকারীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিফাতের মৃত্যু হয়। এ হত্যার ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে পরের দিন সকালে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা সদর থানায় মামলা করেন। প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে সারাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...