নজরুলের কবিতায় প্রেম-প্রকৃতি ও দ্রোহ


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৫ মে ২০২৩, ১৫:০২

সাব্বির রেজা: প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে ২৪ মে ভারতের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারের জরাজীর্ণ মাটির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। দ্রোহ, প্রেম ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম (দুখু মিয়া) দুখু মিয়ার জন্ম ভিটার উত্তর পাশে অজয় নদী, চৈত্রে জেগে ওঠা ধুধু বালুচর। কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনেও নদী একটি প্রিয় অনুষঙ্গ তার কবিতা, গান, গল্প প্রবন্ধে বারবার নদীরা ফিরে ফিরে এসেছে। অজয় কবির জীবনে শৈশব, কৈশোরের নদী। নদী, বালুচর, মরুভূমি, দারিদ্র্য, দুঃখ, কষ্ট মানুষকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। আমাদের মতো গড়পড়তা মানুষকে তো বটেই, কবি লেখকদের ক্ষেত্রেও গভীরভাবে নদ-নদীর প্রভাব পরিলক্ষিত। কবি কাজী নজরুল ইসলামও তার ব্যতিক্রম নয়। অজয় নদীর পাড়ের সন্তান কাজী নজরুল। জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, পরাজিতও হয়েছেন কিন্তু তার কবিতা, গান, গল্প প্রবন্ধে তিনি বিজয়কেতন উড়িয়েছেন বীরদর্পে।

পূর্বেই বলেছি, কবির জীবনে নদ-নদীর প্রভাব বহুমাত্রিক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, বিভ‚তিভ‚ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিকদের জীবনে নদীর প্রভাব অনস্বীকার্য। কবি কাজী নজরুল ইসলামও এর ব্যতিক্রম নয়। নদীর ভাঙাগড়া, বালিয়ারি নজরুল ইসলামের জীবনে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। সুতিয়া, খিরু, ব্রহ্মপুত্র শৈশব কৈশোরের অজয় দামোদর, যৌবনের ভাগিরথি গঙ্গা, গৌমতি, পদ্মা কবির লেখনিতে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। শৈশব থেকেই কবি নদ-নদীর বৈরিতার সঙ্গে পরিচিত। শৈশবে দেখেছে অজয়-দামোদরের ভাঙাগড়ার খেলা। বর্ধমানের ঊষর অনুর্বর ভূমির ফসল উৎপাদনের অপারগতা। কবির জীবনের ত্রিশাল ও কুমিল্লা অধ্যায়ের বিষয়টিও অনুধাবনযোগ্য। ত্রিশালে এসে কবি পরিচিত হয় শুকনি বিল, সুতিয়া ও খিরু নদীর সাথে, কুমিল্লায় গৌমতি নদীর তীরে বসে তিনি অনেক গান কবিতা রচনা করেছেন।

নজরুলের জীবনে নদী প্রসঙ্গে অন্যকোন সময় বলবার অভিপ্রায় থাকলো। এবার বহুমাত্রিক নজরুলকে নিয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চেষ্টা করছি। কালোত্তীর্ণ লেখার জন্য মানুষের দীর্ঘ জীবনের প্রয়োজন হয় বলে মনে হয় না (কবিগুরু অবশ্যই ব্যতিক্রম)। সাতাত্তর বছরের জীবনে নজরুল লিখেছেন মাত্র ২৩ বছর। ১৯৪২ সালের জুলাই থেকে কবি চিরদিনের জন্য নির্বাক হয়ে যান। এ প্রসঙ্গে কীটস, পার্সি বিশি শেলী, সুকান্তের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। লেখালেখির জন্য কীটস পেয়েছিলেন মাত্র ৪ বছর (১৮১৭-১৮২১), শেলী ৯ বছর (১৮১৩-১৮২২), আমাদের সুকান্তের তো আরও কম সময়। উপরে উল্লেখিতরা সবাই কালজয়ী লেখক হিসেবে স্বীকৃত। মোমবাতি যেমন নিজে না পুড়ে অন্ধকার তাড়ানিয়া আলো দান করতে পারে না, কবি লেখকরাও তেমনি দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণার আগুনে না পুড়ে জ্ঞানের আলো জ্বালাতে পারে না। দহন ছাড়া কোনো শিল্পের সৃষ্টি হয় না। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার উজ্জ্বল উদাহরণ। জন্ম থেকেই নজরুলের জীবন পুড়েছে দুঃখ-কষ্ট-অভাবের অনলে। কবি শৈশব থেকেই অভাব-অনটন-দুঃখ-কষ্টের হাত ধরেই বেড়ে উঠেছেন। আর এই দুঃখ-কষ্টই কবির আজন্ম লালিত প্রিয় বান্ধব। শৈশব থেকেই বৈষম্য কবিতে পীড়িত করেছে। তাইতো কবির কলমে প্রকাশ পেয়েছে জ্বালাময়ী ভাষা। বিদ্রোহী কবিতাসহ অসংখ্য দ্রোহের কবিতা।

যৌবনে কবি প্রেমে পড়েছেন, প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন; প্রেম প্রতিটি মানুষের জীবনে অনিবার্য অনুষঙ্গ, কবি লেখকের জীবনে তো অনিবার্যভাবেই তা স্বীকৃত। প্রেম বহুধা ধারায় বিভক্ত একটি প্রিয় অনুষঙ্গ। প্রেম শব্দটি মানব জীবনে বহুমুখী ধারায় বিভক্ত একটি জনপ্রিয় শব্দ। সেটা হতে পারে মানব-মানবীর প্রেম, বাবা-মা’র প্রতি প্রেম, দেশাত্ববোধক প্রেম, প্রকৃতি প্রেম ও ঈশ্বর প্রেম ইত্যাদি। প্রেম-দ্রোহ ও সাম্যের কবি নজরুলও এর ব্যতিক্রম নয়। দু’একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কবিরাও মানুষ, কবিরাও প্রচলিত প্রেমে পড়ে। এর ঊর্ধ্বেও কবিরা দেশপ্রেমিক, প্রকৃতি প্রেমিক, মানবতাবাদী প্রেমিক হয়ে থাকে। তবে সাধারণ মানুষও দেশ বা প্রকৃতি প্রেমিক হতে পারে না বিষয়টি এমন নয়। কবিরা যেমন তাদের লেখনির মাধ্যমে প্রেমের সর্বোরূপে প্রকাশ ঘটাতে পারেন। অন্যেরা তা পারেন না। এখানেই কবির সাথে অন্যের পার্থক্য। এজন্যই কবি সমাজের অগ্রসর বা অগ্রগণ্য মানুষ। কবিরা দ্রষ্টা, সাধারণেরা যা ভাষায় শিল্পীতভাবে প্রকাশ করতে পারে না, কবিরা সেটা পারেন।

যেমন- প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর দোলনচাপা কাব্যগ্রন্থে কবিতার প্রিয়তমার কাছে সমর্পণ কবিতায় নিজেকে সমর্পণ করেছেন বারবার। দ্রোহের জন্য কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা বিদ্রোহী কবি অভিধায় অভিষিক্ত করে বিদ্রোহী কবি হিসেবে সম্বোধন করে থাকি। কবির বিদ্রোহী হয়ে ওঠার পেছনের কারণগুলো আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। সমাজে নানাবিধ বৈষম্য, অনাচার, দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণায় পীড়িত কবি দ্রোহের কবিতা লিখতে সচেষ্ট হয়েছেন। কবির বিদ্রোহী কবিতা লেখার শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে তবুও লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষের ভাগ্যের কী কোনো পরিবর্তন ঘটেছে? ঘটেনি! তাই বলে কবিরা তো নিশ্চুপ থাকতে পারে না। দ্রোহের কবি নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’তে এইভাবেই দ্রোহের কথা প্রকাশ করেছেন- ‘বল বীর চির উন্নত মমশির, শির নেহারি আমারই নতশির, ঐ শিখর হিমাদ্রির, উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রির...’ সমাজের অনাচার-বৈষম্যের বিরুদ্ধের কবির দৃঢ় কণ্ঠের নির্ভয় উচ্চারণ- ‘মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেইদিন হব শান্ত যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারির খর্গ কৃপাণ ভিম রণভ‚মে রণিবে না...’

নজরুল শুধু প্রেম ও দ্রোহের কবিই ছিলেন না। তিনি একাধারে সাম্যের কথাও বলেছেন। তাঁর বহুবিধ কবিতা ও গানে এর উদাহরণ পাওয়া যায়। তাঁর লেখনিতে নিপীড়িত-নির্যাতিত-বৈষম্যপীড়িত মানুষের জয়গান করেছেন। নজরুল লেটোদলে যুক্ত থেকে লেটোগান রচনা করেছে, রুটি দোকানের কর্মচারী, মোয়াজ্জিন, গোরখোদক ছিলেন- এসব আমাদের কমবেশি সবারই জানা। প্রেম আর দ্রোহের কবি হিসেবে নজরুল যতটা পরিচিত তার গান ও কবিতা সাম্যবাদী হিসেবে ততটা উচ্চারিত নয়। অথচ তিনি আপাদমস্তক একজন সাম্যবাদী কবি। তাঁর গান-কবিতায় অজস্র উদাহরণ রয়েছে। স্বল্পপরিসরে বিস্তারিত উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তাই সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চেষ্টা করছি।

শৈশবের পারিবারিক প্রভাব কাটিয়ে যুদ্ধফেরৎ সৈনিক নজরুল ইসলাম কলকাতায় ফিরে এসে বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের সান্নিধ্য লাভ করেন। মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির মানুষ কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের সাথে একই কক্ষে থাকার সুবাদে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বটা আরও দৃঢ় হয়।

একদিন কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ কবিকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি রাজনীতিতে যোগ দিবেন কিনা? নজরুল খোলাখুলি বললেন, ‘রাজনীতিই যদি না করবো তাহলে যুদ্ধে গিয়েছিলাম কেনো।’ দেশ ও মানুষের প্রতি ছিল কবির গভীর মমত্ববোধ। কবি মানবতার পক্ষে যুদ্ধ করেছেন তিনি সৈনিক, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ। কবি ‘লাঙল’ ও ‘ধূমকেতু’ নামে পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। সাম্যবাদী রাজনৈতিক দলেও তিনি যোগদান করেছিলেন। একজন কবি সাম্যবাদে বিশ্বাসী না হলে তাঁর কলম থেকে এমন পঙ্ক্তিমালা লেখা হয়তো সম্ভব হতো না।

সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের অন্তভুক্ত সাম্যবাদী কবিতায় কবি উচ্চারণ করেছেন- ‘গাহি সাম্যের গান/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/সেখানে মিশিবে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীশ্চান/গাহি সাম্যের গান...’।

উপরে উল্লেখিত কবিতার পঙ্ক্তিসমূহে কবি মানবতার যেমন জয়গান করেছেন, তেমনি কুলি মজুর ও বাবুদের বৈষম্যের চিত্রও এঁকেছেন, নারী-পুরুষের সাম্যের কথা বলেছেন। একজন কবি মানবতা ও সাম্যবাদী আদর্শ লালন না করলে এভাবে ভাবতে পারতেন না। কবিতা, গান, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা, রাজনীতিবিদ, সম্পাদক, সব্যসাচী লেখক, মানবতাবাদী কবি নজরুল ইসলাম যেন বহুমাত্রিক প্রতিভার মেলবন্ধন।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar