শিশুকে নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিন


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২২ নভেম্বর ২০২২, ২১:৩২

বিপুল দাস: শিশুদের বাসযোগ্য নিরাপদ আবাস নেই এই পৃথিবীতে। ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয় শিশু। যে ধরনের সহায়ক পরিবেশে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার কথা, সে ধরনের কোনো পরিবেশই তাদের জন্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সব দিক থেকেই শিশুরা অনিরাপত্তায় ভুগছে। শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, দেশে শিশুর নিরাপত্তা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। শিশুরা দীর্ঘকাল যাবৎ দেখা গেছে মা ছাড়া আত্মীয় স্বজন- শিক্ষক কারও কাছে নিশ্চিন্ত নিরাপদ জীবনলাভ করেনি। এটা আমাদের জন্য বিশাল এক দুঃখের ভার। শিশুর প্রতি যেকোনো ধরনের নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ পেতে দেশে সুশিক্ষা ব্যবস্থা, সুস্থ সামাজিক পরিস্থিতি ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারা ফিরিয়ে আনা একান্ত জরুরি। এসবই আমরা বুঝি। তারপরও শিশুর জন্য নিরাপদ বিশ্ব ক্রমশ সুদূর পরবাসী হয়ে যাচ্ছে।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত এক হাজার ৯৭৪ শিশুর অধিকার হরণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে হত্যা ও অপমৃত্যুর শিকার হয় ৫৬৬ শিশু, নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করে ৬৬, ধর্ষণের শিকার হয় ১৮২, গণধর্ষণ করা হয় ২৩ শিশুকে। সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ২০১৫-১৬ সালে শিশু নির্যাতনের ধরন ও পরিধি বেড়েছে। নির্যাতনের ক্ষেত্রে নৃশংসতার মাত্রাও বেড়েছে বহুগুণ। ২০১৪ সালে ২২ এবং ২০১৫ সালে ৯৯ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ২৩ শিশু ধর্ষণের মতো পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিশু ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতরা তাদের নিকটাত্মীয় অথবা প্রতিবেশী।

নিম্নবিত্তের কর্মজীবী নারীদের ঘরে তাদের সন্তানদের সুরক্ষা নেই। কর্মস্থলে শিশু-কিশোরীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শিশুর নিরাপত্তা তাহলে কোথায়? রাস্তাঘাটে, যানবাহনে শিশু ও নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে তৎপর হওয়ার বিকল্প নেই। সবারই পেশাগত জীবনের কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনো না কোনো শিশু। তার যতœ, বিকাশ এবং শিক্ষা, বাবা-মার শিক্ষা, শিক্ষকদের শিক্ষা ছাড়া শিশুর জন্য বাসযোগ্য বিশ্ব গড়া দুরূহ। সব সময় শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ব্যক্তি হিসেবে শিশুর মা-ই সেরা।

মায়ের বুক, মায়ের কোল শিশুর সবচেয়ে প্রিয় ও নিরাপদ স্থান। করোনায় শুধু ভারতেই উনিশ লাখ শিশু মা, মা-বাবা, বাবা হারিয়ে চরম নিরাপত্তাহীন হয়েছে। অন্য দেশেও এমন সব ঘটনা ঘটেছে। এখন রাশিয়া-ইউক্রেন, ইয়েমেনের যুদ্ধে বাবা-মা হারা হচ্ছে কত হাজার শিশু, দুর্ভিক্ষে-অনাহারে মারা যাচ্ছে কত লাখ শিশু! অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয় না। হলেও আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে আসামিরা পার পেয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে আবার সমঝোতায় পার পায় অপরাধীরা। এসব কারণে চ‚ড়ান্ত কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না অপরাধীদের। আর এ সুযোগে দুর্বৃত্তরা শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে অনেকটাই বেপরোয়া। ফলে প্রতিনিয়তই শিশু নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ঘরে-বাইরে সর্বস্তরে শিশু নিরাপদ থাকবে- এটাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা। কিন্তু শিশুর জন্য নিরাপদ বিশ্ব কি আমরা গড়তে পেরেছি? সরকার শিশুদের কল্যাণে নানা প্রকল্প গ্রহণ করছে। কিন্তু কোথাও ফলপ্রসূ কোনো অবস্থা গড়ে ওঠেনি।

শিশুদের নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ঘরে-বাইরে কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। শহর-গ্রাম কোথাও শিশুদের বেড়ে ওঠার ভালো পরিবেশও নেই। শিশুদের জন্য সুদৃৃঢ় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও আরো সচেতন হতে হবে। শিশুদের ওপর নির্যাতনকারীরা জাতীয় শত্রু। সবাই মিলে এ শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। শিশু অধিকার পরিস্থিতি উন্নত করতে হত্যা-ধর্ষণসহ সব ধরনের নির্যাতনের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রায় দ্রুত কার্যকর করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক : সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমকর্মী


poisha bazar