৪৪ বছরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়!


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২২ নভেম্বর ২০২২, ২১:২৬

আবু তালহা আকাশ: ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির ব্যাসবাক্য ‘বিশ্ববিদ্যার আলয়’ অর্থাৎ বিশ্বের সার্বিক বিষয়ের জ্ঞান যেখানে চর্চার ও অধ্যয়নের মুক্ত সুযোগ থাকে। সে ধরনের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যেই আজ থেকে কয়েক শত বছর পূর্বে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে বিখ্যাত মৌর্য সম্রাট অশোক নালন্দাতে প্রথম বৌদ্ধ উপাসনালয় গড়েন, যা পরে বৌদ্ধ গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকই একমত যে রাজা কুমারগুপ্তের সময়ে ৪২৭ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা মগধে নালন্দা প্রতিষ্ঠিত হয়। নালন্দা মূলত বৌদ্ধধর্মের গবেষণা ও ধর্মচর্চার জন্য নির্মিত হলেও সেখানে হিন্দু দর্শন, বেদ, ধর্মতত্ত্ব, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত¡, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অনেক বিষয় পড়ানো হতো। এই বিদ্যালয়ে বিদ্যার্জনের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হতে বহু শিক্ষার্থীর সমাগম হতো। এ বিশ্ববিদ্যালয় এতই জনপ্রিয় ছিল যে, এখানে বিদ্যার্জন করতে সে সময়ে তিব্বত, চীন, কোরিয়া, গ্রিস, পার্সিয়া, তুরস্ক থেকে শিক্ষার্থী আসত। এই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে মানব সভ্যতার যত বিকাশ ঘটেছে, পৃথিবীর বুকে অসংখ্য বিদ্যালয় এবং উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। তারই ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ (ইবি)।

বেশ কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানের ৪৩তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস আজ। দুটি অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগে মোট ৩০০ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, বর্তমানে আটটি অনুষদের অধীনে ৩৬টি বিভাগের অন্তর্গত প্রায় ১৬০০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এছাড়াও ২০১৮ সালে প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম অনুসারে প্রস্তাবিত বিভাগসহ মোট ৫৯টি বিভাগ চালু করার কথা রয়েছে। দেশের ইসলামী শিক্ষার উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া জেলায় প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৮৬ সালের ২৮ জুন তাদের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ইসলামী শিক্ষার প্রসার হলেও বর্তমানে এখানে সকল ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা মুক্তভাবে জ্ঞানারোহণের সুযোগ পাচ্ছে। প্রতিষ্ঠাকালীন কোনো হল না থাকলেও বর্তমানে এখানে ছাত্রদের জন্য পাঁচটি এবং ছাত্রীদের জন্য তিনটি হল রয়েছে এমনকি আরো ২টি হল নির্মাণাধীন। দেশের ক্যাম্পাসভিত্তিক সবচেয়ে বড় শহীদ মিনার ইবি ক্যাম্পাসেই অবস্থিত। ক্যাম্পাসভিত্তিক সবচেয়ে বড় মসজিদও রয়েছে এখানে (তুর্কি স্থাপত্য-শৈলীর এক অনন্য নিদর্শন)।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি হিসেবে রয়েছে স্মৃতিসৌধ এবং মুক্ত বাংলা ভাস্কর্য। রয়েছে দেশের ২য় উচ্চতম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি ম্যুরাল ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’, নান্দনিক সততার স্মারক ‘সততা ফোয়ারা’। এছাড়াও রয়েছে ১২০০ আসন বিশিষ্ট সম্পূর্ণ শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তন, নয়নাভিরাম, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় লেক’ যেটা ‘মফিজ লেক’ অধিক পরিচিত। যেখানে প্রতিনিয়ত অসংখ্য দর্শনার্থী এসে ভিড় জমায় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যে বিমোহিত হতে! দেশি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্তর্জাতিকীকরণের পথে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও বেশ এগিয়ে ইবি।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল ও মহিলা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় আছে এই ইবিতে এবং পরপর তিনবার আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবলে বিজয়ী প্রতিষ্ঠান। এমনকি শিক্ষার্থীরা দেশি-বিদেশি অসংখ্য খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতায় গর্বের সাথে সাফল্য এনে উজ্জ্বল করছে ইবির মুখ! অসংখ্য প্রাপ্তির পেছনেও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নানারকমের অসংগতি ও অপ্রাপ্তি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদীর্ঘ ৪৩ বছরের পথচলার পরবর্তী সময়ে এসে সমস্যাগুলোর উত্তরণ সকল শিক্ষার্থীর এক প্রাণের দাবি।

শুরুতেই যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় তা হলো বিদ্যাপীঠের নাম। এই নাম নিয়ে যে বিড়ম্বনা তা সত্যিকার অর্থেই অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার! কারণ চাকরির আবেদন ফর্মসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে আমরা দেখতে পাই, ‘ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়’ আবার কোথাও ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ এ অংশটুকু সুনির্দিষ্ট থাকলেও এর পরবর্তী শব্দগুলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া; কোথাও ঝিনাইদহ; কোথাও কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ, কোথাও শান্তিডাঙ্গা, কোথাও আবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ! নামক নানা রকম শব্দের ব্যবহার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সামনের ব্যানারগুলোসহ ক্যাম্পাসের একান্ত নিজস্ব কাজের ক্ষেত্রেই বিভিন্ন স্থানে, নানা রকম নামের ব্যবহার করা হয়; যা সত্যিকার অর্থেই কষ্টদায়ক। আবার পত্র-পত্রিকা, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে হরহামেশাই শুধুমাত্র ‘কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে, কোথাও আবার একে ‘শেখপাড়া বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে পরিচয় প্রদান করা হচ্ছে। পরিচয় বহনের ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া কিংবা ঝিনাইদহ বলা যেতেই পারে কিন্তু সর্বক্ষেত্রে অন্যান্য ক্যাম্পাসের মতো শুধুমাত্র, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ পরিচয়টি সর্বক্ষেত্রে উল্লেখ করাটা সকলের প্রত্যাশা।

কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ শহরের সীমান্তে যথাক্রমে ২৪-২২ কি.মি. দূরে শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুর নামক এলাকায় অবস্থিত ইবি। যদিও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী শতভাগ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু আসন সংখ্যা কম হওয়ার জন্য তাদের বাসস্থানের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে ক্যাম্পাস পার্শ্ববর্তী এবং কুষ্টিয়া কিংবা ঝিনাইদহ শহর। ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় স্বাভাবিক চাহিদার পণ্য, এমনকি ওষুধ-পত্রের জন্যও ছুটে যেতে হয় অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে সেই শহরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে নিজস্ব পরিবহন সংকট থাকায়, ভাড়ায় চালিত হয় অধিকাংশ বাস। সেখানে শিক্ষার্থীদের নিকট ভাড়া আদায়, ছাত্র-ছাত্রীদের যেকোনো টপেজ হতে গাড়িতে না ওঠানো, এমনকি ভাড়ায় যাত্রী ওঠানোর অভিযোগ অনেক পুরোনো। এ সমস্যার উত্তরণের জন্য নেই যথাযথ ব্যবস্থা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য যে খাবার সরবরাহ করা হয় তা শরীরের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই এক বড় চ্যালেঞ্জ! নিয়মিত একই পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মূল্য রাখা হয়। এমনকি হলগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্যও নেই সুব্যবস্থা! ক্যাম্পাসের অধিকাংশ হল চার ও পাঁচ তলাবিশিষ্ট হলেও খাবার পানির জন্য একমাত্র ভরসা হলের নিচে অবস্থিত একটিমাত্র টিউবওয়েলের ওপর। তাই হলের প্রতিটি বøকে বিশুদ্ধ পানির লাইনের ব্যবস্থা করাও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চার তলাবিশিষ্ট অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরম পরিবেশের একটি লাইব্রেরি রয়েছে। যেখানে রয়েছে অসংখ্য একাডেমিক বইপত্র। কিন্তু শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বইয়ের কিছু অংশ ফটোকপি করে নেবে সে সুযোগ নেই! পাশাপাশি বর্তমান দেশের চাকরির বাজারে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সে সকল বইপত্র। তা নিয়ে সেখানে গিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। ছোট সামান্য একটা রুম থাকলেও সেখানে ২০ জনের বেশি বসার মতো কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা যদি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির দিকে তাকাই সেখানে দেখি শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বই পত্র নিয়ে লাইব্রেরিতে দীর্ঘ সময় লেখাপড়ার সুযোগ পায়, এতে করে চাকরির বাজারে তারা অনেক এগিয়ে। যেখানে দিনে দিনে পিছিয়ে পড়ছে ইবি শিক্ষর্থীরা। এ থেকে উত্তরণ ও সকল সুবিধা প্রাপ্তি সকলের প্রাণের দাবি।

বিশ্ববিদ্যায়ের বিভিন্ন ফি প্রদান, ফরম ফিলাপ, সার্টিফিকেট উত্তোলন, প্রত্যয়নপত্র উত্তোলনসহ সার্বিক বিষয়ে ব্যাংকে দীর্ঘ লাইন ধরে টাকা প্রদান করতে হয়। আবার হল কার্ড, লাইব্রেরি কার্ড, মেডিকেল কার্ডসহ প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা কার্ড করতে হয়। এর জন্য গুনতে হয় আলাদা আলাদা ফি! কিন্তু এমন যদি হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মাত্র ডিজিটাল কার্ড থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৪২ বছরের পথ চলায় শিক্ষার্থীদের নেই, ‘প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল’! নেই ফেসবুকে একটি নির্দিষ্ট পেজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অসংখ্য ভুয়া পেজে ছেয়ে আছে ফেসবুক জুড়ে। এতে করে নানা সময়ে অসংখ্য গুজব ছড়িয়ে থাকে, যা বাংলাদেশ তথা বিশ্ব পরিমণ্ডলে ক্যাম্পাসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে!

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত সার্টিফিকেটধারী গ্যাজুয়েট নয়, ‘মানুষ’ তৈরির পথে কাজ করা। সর্বোপরি দীর্ঘ ৪৩ বছর অতিক্রম করে ৪৪ বছরে পদার্পণ করছে ইবি। অনেক ক্ষেত্রেই যেমন হয়েছে অভূতপূর্ব উন্নয়ন, ঠিক তেমনিভাবে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার পথে নানা বিষয়েই পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে তাই প্রত্যাশা থাকবে সার্বিক বিষয়ে ডিজিটালাইজেশন, পড়াশোনা, মুক্তচর্চার বিচরণ কেন্দ্রসহ সার্বিক সকল বিষয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রাণের ক্যাম্পাসের শিক্ষার দ্যুতি বাংলাদেশ পেরিয়ে বিশ্বের বুকে আলো ছড়াবে সে প্রত্যাশাই একান্ত কাম্য।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়


poisha bazar