'শেখ হাসিনার কূটনৈতিক নেতৃত্বে সুসংহত বাংলাদেশ'


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:৩৬,  আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:৪৪

ড. এ কে আব্দুল মোমেন: ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের পর বাংলাদেশের শাসনভার নিজের কাঁধে নিয়ে যে শান্তি ও প্রগতির রাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছেন সামনে।

‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরীতা নয়’ বিশ্বশান্তির পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এই অমোঘ নীতিই এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। এই মূলমন্ত্রের ওপর ভর করেই সকল বাঁধার পাহাড় ডিঙিয়ে দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এদেশের সর্বকালের সফল প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। তার শাসনামলের প্রতিটি পদে পদে রচিত হচ্ছে সফলতার ইতিহাস। তার দূরদর্শী কূটনৈতিক নেতৃত্বের কারণে শেখ হাসিনা সরকারের বিগত ১৩ বছরে অজস্র কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন দেশ ও বিশ্বপরিমণ্ডলে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব সভায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এক সময়ের ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশটি আজ আর্বিভূত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করছে দেশের পররাষ্ট্রনীতি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট ভিশন নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বিশ্বের কাতারে উন্নীত করার লক্ষ্যে রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এর আলোকে কার্যকর ও যুগোপযোগী সহায়ক নীতি গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের নীতি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপসমূহ বিদেশি কূটনৈতিক মিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম, সভা ও সেমিনারে তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান সরকারের দক্ষ নেতৃত্বে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫২ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ, রপ্তানি ও বিদেশে কর্মসংস্থানের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৫ সালে ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, এখন তা ৪০ বিলিয়ন হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের অবিসংবাদী ভাষণ ‘বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দলিল’ হিসাবে ইউনেস্কোর ইন্টারন্যাশনাল মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের ইউনেস্কো সদর দপ্তরে মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভার ঘোষণার মাধ্যমে এটি বাস্তবায়িত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিদের্শনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অব্যাহত ও ঐকান্তিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় এ স্বীকৃতি। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা আর স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির গৌরবময় অবদান মানব ইতিহাসে চিরস্থায়ীভাবে ঠাঁই করে নেয় এ স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। বাঙালির এ অর্জন আজ বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য, যা মানবজাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়; অনুপ্রেরণা, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে।

শেখ হাসিনা সরকারের সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত স্থলসীমানা ও সমুদ্রসীমা শান্তিপূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়েছে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারত স্থলসীমানা চুক্তি ১৯৭৪-এর প্রটোকল স্বাক্ষর এবং ২০১৫ সালে স্থলসীমানা চুক্তির অনুসমর্থন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদীর্ঘ প্রচেষ্টারই সুফল। ইন্সট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন এবং লেটার অব মোডালিটিস স্বাক্ষরের মাধ্যমে তৎকালীন ১১১টি ভারতের ছিটমহল বাংলাদেশের এবং আমাদের ৫১টি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়ে যায়। ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে এর আগে নাগরিকত্বহীন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব লাভ করে।

সদর দপ্তরসহ বিদেশস্থ সকল মিশনে বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপন, গণহত্যা কেন্দ্র (জেনোসাইড সেন্টার) স্থাপন, জনকূটনীতির পদক্ষেপসমূহ, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে দশদিনব্যাপী ‘মুজিব চিরন্তন’ অনুষ্ঠান আয়োজনে সক্রিয় অবদান, বঙ্গবন্ধু রিসার্চ সেন্টার ফর ফরেন পলিসি এন্ড ডিপ্লোম্যাসি স্থাপন, বঙ্গবন্ধু লেকচার সিরিজ প্রবর্তন, বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমেটিক এ্যাওয়ার্ড অফ এক্সসেলেন্স প্রবর্তন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ প্রবর্তন ও বঙ্গবন্ধু চেয়ার স্থাপন, বঙ্গবন্ধু-ইউনেস্কো এ্যাওয়ার্ড ফর ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ‘বিশ্ব শান্তি সম্মেলন’ আয়োজন, জাতিসংঘ এবং ছয়টি দেশের সাথে বঙ্গবন্ধু স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ, একাধিক বিদেশি ভাষায় বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশ এবং বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার জীবন, দর্শন ও বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে অবদানের উপরে বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রকাশনা- বিগত কয়েক বছরে শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে সমস্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। নিজস্ব অর্থে ২৭ টি মিশনের নিজস্ব অফিস বা রাষ্ট্রদূতের বাড়ি কেনা হয়েছে। এসব উদ্যোগের সমন্বিত প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনার বিস্তার ঘটানোর সুযোগ যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমনই আর্ন্তজাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে আরো শক্তভাবে তুলে ধরবার পথ সুগম হয়েছে।

পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য সুপেয় ও নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিতকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিবেচনায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও পানি সম্পদ বিষয়ক আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের আলোচনায় পানিকে অন্যতম ‘মানবাধিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে মানবজাতির অস্তিত্ব সুরক্ষায় পানির অপরিহার্যতার বিষয়টি পুর্নব্যক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের পানি বিষয়ক ‘হাই লেভেল প্যানেল অন ওয়াটার’র (এইচএলপিডবলিউ) একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সবার জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিবিড়ভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার।

ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান প্রফেসর ক্লাউস শোয়াবের বিশেষ আমন্ত্রণে ২০১৭ সালের ১৭-২০ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের ডাভোস শহরে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ৪৭তম বার্ষিক সভায় অংশ নেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ইতিহাসে এটিই প্রমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো নির্বাচিত সরকারপ্রধান এ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রিত হন, যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার বিষয়। ডাভোস আলোচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিল্প কারখানাগুলোতে যথাযথ পরিবেশগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার সরকারের আন্তরিকতা ও গৃহীত পদক্ষেপসমূহের ওপর আলোকপাত করেন। ‘রূপকল্প ২০২১’ এবং ‘রূপকল্প ২০৪১’ সামনে রেখে সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কর্মসূচির কথাও বিশ্বনেতৃবৃন্দের সামনে তুলে ধরেন তিনি। বার্ষিক এ সভা চলাকালে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের দ্য ইনক্লুসিভ গ্রোথ অ্যান্ড ডেভালপমেন্ট রিপোর্ট ২০১৭-এ বলা হয়, উন্নয়নশীল ৭৯টি দেশের মধ্যে সুষম উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ আজ বাংলাদেশকে আরো গভীরভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ভাষায় অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রকাশের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন, তার মতবাদ, তার ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহুবিধ উদ্যোগের ফলে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম, বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ-তিতিক্ষা, বাংলাদেশের নীতি ও মূল্যবোধ এবং সেই সাথে এদেশের সর্বকালের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতির ধারাবাহিকতায় স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কূটনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধসমৃদ্ধ বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির অনুসরণে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিবিড়করণসহ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেখানে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। কারণ বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক যে গুরুত্ব, সে গুরুত্বটি বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের ভূ-রাজনৈতিক লড়াই বা প্রতিযোগিতা চলছে। সে প্রতিযোগিতার ফলে এবং বাংলাদেশের ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ফলে বাংলাদেশ এ অঞ্চলে একটি নতুন পরিচিতি লাভ করতে পেরেছে।

শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব ও সফল কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়। ঐতিহাসিক এই নিষ্পত্তিতে বঙ্গোপসাগরে ১,১৮,৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র-এলাকার ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বিরোধ নিরসনে বিরল এ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানে উপনীত হওয়ার এ নীতি আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রশংসিত করেছে। এ রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় সম্ভাবনাময় সকল সম্পদ আহরণের সক্ষমতাবৃদ্ধিতে ২০১৮ সালে ভারত ও চীনের সাথে ‘ব্লু ইকোনমি’ এবং ‘মেরিটাইম খাতের মান উন্নয়নে সহযোগিতা’ বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের দূরদর্শী কূটনৈতিক তৎপরতায় ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) বিভিন্ন দেশের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গতি সঞ্চার হয়েছে। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে যুক্তরাজ্য সফর করেন। সেখানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থা ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে অর্জিত সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বর্তমান সরকার এশীয়, বিশেষত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে ক‚টনৈতিক স¤পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্ক, বিমসটেক, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝে কার্যকর সংযোজক বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিআইএম-ইসি), বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) প্রভৃতি আঞ্চলিক/উপ-আঞ্চলিক জোট/ফোরামকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আওতায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধি, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে গৃহীত বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপের অন্যতম সফল পদক্ষেপ হচ্ছে ঢাকায় বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন-এর (বিমসটেক) স্থায়ী সচিবালয় স্থাপন। বিমসটেক সচিবালয় বাংলাদেশে কোনো আঞ্চলিক সংস্থার প্রথম সদর দপ্তর। ঢাকায় বিমসটেক সচিবালয়ের সফল প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য।

করোনা ভাইরাসের মহামারির এ কালে বঙ্গবন্ধু প্রণীত পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভর করেই ভ্যাকসিন কূটনীতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেছে বাংলাদেশ। জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার দক্ষ কূটনীতির কারণে করোনা মহামারির এ দুঃসময়ে বিশ্ব সম্প্রদায় যেভাবে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের পাশে, তা অতুলনীয়। বিশ্বের বড় বড় দেশ যেখানে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় রীতিমত হিমশিম খেয়ে যায়, সেখানে বাংলাদেশ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার পাশাপাশি দ্রুততার সাথে নাগরিকদের জন্য ভ্যাকসিন সরবরাহের ব্যবস্থা করে। যার ফলে করোনা মহামারি বাংলাদেশকে ততটা কাবু করতে পারেনি। বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় থাকার ফলেই এত দ্রুততার সাথে ভ্যাকসিন পেয়েছে বাংলাদেশ।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের দুরদর্শী, দায়িত্বশীল পররাষ্ট্রনীতি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বশান্তি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে সফল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দারিদ্র দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ফলে বিশ্বে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আরো সুদৃঢ় হয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশের এই অবস্থান আরো সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে তার দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতিও পেয়েছেন ব্যাপকভাবে। ভূষিত হয়েছেন অজস্র আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননায়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০১৮ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বের ৩০তম ক্ষমতাশালী নারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা সম্পর্কিত ‘ভিশনারি অ্যাওয়ার্ড’ এবং ইউনেস্কোর ‘শান্তি বৃক্ষ’ পুরস্কার লাভ করেন।
২০১৫ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশকে মর্যাদাপূর্ণ ‘উইমেন ইন পার্লামেন্ট (ডব্লিউআইপি) গ্লোবাল ফোরামঅ্যাওয়ার্ড ২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ২০১৬ সালে ইউএন-উইমেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের একই অধিবেশনে নারী সমাজকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করে বিচক্ষণ নেতৃত্বদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ’ শীর্ষক সম্মানজনক পুরস্কারে ভ‚ষিত করে। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা এবং ইউএন পিস বিল্ডিং কমিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা বিশ্বে বিপুলভাবে প্রশংসিত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ধারাবাহিকভাবে সর্বাধিক সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে নিজের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে তারা।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনে শুধু মহিলাপুলিশ সদস্য নিয়ে গঠিত একটি সম্পূর্ণ কন্টিনজেন্ট প্রেরণ করেছে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী ক্ষমতায়ন ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দেশটি।

২০১৫ এ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। একই অধিবেশনে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘আইসিটিজ ইন সাসটেইনেবল ডেভালপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে। ২০১৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে ‘আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট’ পুরস্কারে ভূষিত হন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ। স্বাস্থ্যখাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা প্রদানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড ২০১১-এ ভূষিত হন। একই বছরে, ইউনেস্কো সদর দপ্তরে নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে বক্তব্য প্রদানকালে গণতন্ত্র সুসংহতকরণ ও নারীর ক্ষমতায়নে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ডাফিন ইউনিভার্সিটি গোল্ড মেডাল ২০১১-এ ভূষিত হন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের স্কেলিং আপ নিউট্রিশন (এসইউএন) মুভমেন্টের শীর্ষ সাত নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১২ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের শীর্ষনেতাদের লিড গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হন শেখ হাসিনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ-সাউথ কোঅপারেশনের পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন, এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বর্তমান সরকারের অসামান্য সাফল্যের জন্য অ্যাচিভমেন্ট ইন ফাইটিং পোভার্টি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কারণে ২০১৩ সালে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এফএও ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড, ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পদক এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গ্লোবাল ডাইভার্সিটি অ্যাওয়ার্ড ২০১১ লাভ করেন। এগুলো ছাড়াও আরো অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা তিনি লাভ করেছেন। ট্রি অব পিস অ্যাওয়ার্ড, কালচারাল ডাইভারসিটি মেডাল ২০১২, গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০১৮, অ্যাওয়ার্ড ফর হিউম্যানিটারিয়ান লিডারশিপ ফ্রম গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন ২০১৮ এবং অনন্য নেতৃত্বের জন্য ২০১৮ সালে ইন্টার প্রেস সার্ভিস থেকে পাওয়া আইপিএস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড বিশ^ব্যাপী বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে বহুগুণ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদেশের মানুষের আশা আকাঙ্খার শেষ ভরসাস্থল। এদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির রূপকার তিনি। তার যোগ্য নেতৃত্বে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আজ ধ্রুব তারার মতোই উজ্জ্বল। তার নেতৃত্বেই একদিন উন্নতির চরম শিখরে পৌছে যাবে আমাদের এই প্রিয় দেশটি। ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর ৭৬তম জন্মদিন। জন্মদিনে অশেষ শ্রদ্ধা জানাই তাকে।

লেখক: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার


poisha bazar