গণপরিবহনে ধূমপান বন্ধে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:২৫

আফরোজা আক্তার: ধূমপান একটি নীরব ঘাতক। এটি স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত বিড়ি, সিগারেট বা পাইপের মাধ্যমে জ্বলন্ত ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে টেনে নেওয়া এবং বের করার যে প্রক্রিয়া তাকেই ধূমপান বলা হয়। ঘুণপোকা যেমন কাঠকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে ফেলে, ঠিক তেমনি ধূমপান আমাদের শরীরকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে ফেলে। দেশে তামাকবিরোধী আইন রয়েছে। কিন্তু সে আইন কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে? ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ। আইনের পাশাপাশি রয়েছে জরিমানার বিধানও। কিন্তু মানুষের মধ্যে নেই সতর্কতা।

গণপরিবহনে ধূমপান করার ফলে এর ভয়াবহ প্রভাব যে শুধু ধূমপায়ীর ক্ষতি করে, তা নয়। পরোক্ষভাবে তা পাশের জনেরও ক্ষতি করে। পরোক্ষ ধূমপানের সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও অন্তঃসন্ত্বানারীরা। বাংলাদেশের সর্বত্রই দেখা যায় বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন যাত্রীবাহী যানবাহনে সিগারেট বিক্রি করতে। আর এর সঙ্গে পাবলিক পরিবহনে শিশুসহ যারা ধূমপান করে না তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওই সব ধূমপায়ীর হাতে, যা প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। ধূমপানের ফলে শরীরে নিকোটিন নামক বিষ প্রবেশ করে। প্রতি একটি সিগারেট পানের ফলে মানুষের জীবন থেকে ৫-৬ মিনিট আয়ু কমে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বিশ্বে ৬ কোটি মানুষ ধূমপানজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে যার মধ্যে ৬ লাখ পরোক্ষ ধূমপানজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি সিগারেট জ্বালানো হলে তামাক জ্বলতে থাকে এবং ধোঁয়া তৈরি হয়, যাতে উচ্চ স্তরের ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ থাকে যা ধূমপান সম্পর্কিত রোগগুলোর প্রাথমিক কারণ।

জ্বলন্ত সিগারেট-বিড়ি থেকে নিঃসৃত ধোঁয়ায় ধূমপায়ী ব্যক্তির পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীগণও ক্যান্সার, হার্টঅ্যাটাক, উচ্চরক্তচাপ, রক্তনালির রোগ, হৃৎপিণ্ড, লিভার ও ফুসফুসের বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (২০১৭) এর বাংলাদেশ বিষয়ে বলা হয়েছে, সরাসরি ধূমপান না করেও শুধুমাত্র বিভিন্ন পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন ৩ কোটি ৮৪ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। এদের মধ্যে রকমফেরও আছে। ৪৯.৭ শতাংশ মানুষ রেস্তোরাঁয় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়েছেন, যেখানে গণপরিবহনে ৪৪ শতাংশ এবং আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্রে ৪২.৭ শতাংশ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়েছেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের (১৩-১৫ বছর) মধ্যে পাবলিক প্লেসে এই হার ৫৯ শতাংশ।

রাজধানীর গণপরিবহনগুলোতে ধূমপান করা একটি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাড়ি চালনাকালে চালক এবং তার সহকারী প্রকাশ্যে সিগারেট টানে, যা যাত্রীদের জন্য বিরক্তির উদ্রেক করে। যাত্রীরা বাসে ধূমপান না করলেও, চালক ও তারা সহকারী প্রায়ই ধূমপান করে থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, পরিবহনশ্রমিকদের ৬২ শতাংশ এখনও গণপরিবহনে ধূমপান করে থাকে। সরকার একদিকে যেমন সর্বজনীন স্থানে তামাক ব্যবহারের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে লঙ্ঘনকারীরা তাদের আচরণে আগ্রাসী এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সর্বত্র উপেক্ষা করছে।

গণপরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হলে জনসচেতনতার পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯ এবং ১৪ ধারায় বলা আছে যে, কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঘটনা পরিদর্শন সাপেক্ষে লিখিত মামলা করতে পারবে এবং শুধু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জরিমানা করতে পারবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে ঠিকমতো আইনটি প্রয়োগই হচ্ছে না। এমনকি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের কোনো প্রকার নজরও নেই। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পুলিশকে সরাসরি জরিমানার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তবে আইন সংশোধনীর মাধ্যমে পুলিশকে এ ক্ষমতা দেওয়া হলে তা তামাক নিয়ন্ত্রণে আশানুরূপ সফলতা আসবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা উচিত। বিশেষ করে বাস টার্মিনালগুলোতে এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি গণপরিবহনেও নো-স্মোকিং সাইন স্থাপন করা প্রয়োজন। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও ধূমপায়ীদের নিরুৎসাহিত করতে হবে। ধূমপানের চাহিদা কমানোর জন্য তামাক পণ্যের সহজলভ্যতা কমানোর দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

পাশাপাশি, গণপরিসর এবং গণপরিবহন শতভাগ ধূমপানমুক্ত রাখতে চালক, হেল্পার, যাত্রী সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা জরুরি। জনস্বাস্থ্য সকলের বিষয়। তামাক দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো সকলের সামনে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সামনে বেশি করে তুলে ধরতে হবে। সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও সেগুলো পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করাসহ এ ধরনের বিষয়গুলো কতটুকু প্রয়োগ হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। টার্মিনালগুলো নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, ইজারাদার, বাস-মালিক কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক ইউনিয়ন একসঙ্গে সমবেতভাবে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাপক জনসচেতনতা ছাড়াও পরিবহন সংস্থাসহ বিআরটিএ, বিআরটিসি, বিআইডবিউটিএ এবং পুলিশ বিভাগকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সঠিক বাস্তবায়নে তদারকি জোরদারকরণ এবং সে অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে গণপরিবহনকে ধূমপানমুক্ত করা যাবে বলে আশা করি।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar