• বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
  • ই-পেপার

সড়ক দুর্ঘটনা: জনসচেতনতাই প্রধান সমাধান


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৬ আগস্ট ২০২২, ১৬:৩২

বাদশাহ আবদুল্লাহ: বর্তমান সময়ের আলোচিত ও মর্মস্পর্শী ঘটনা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। এ দুর্ঘটনায় প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষ। ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে হাজারো স্বপ্ন। বর্তমান সময়ে আমাদের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের সৃষ্ট স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোরে সংবাদপত্র হাতে নিলেই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের মর্মান্তিক দুঃসংবাদ। বর্তমানে শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় পায়ে হেঁটে বা যানবাহনে চলাফেরা রীতিমতো বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সড়ক দুর্ঘটনার ফলে অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে।

দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঠিকই ঘটছে কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘর থেকে রাস্তায়  বের হলেই দেশের প্রত্যেকটি মানুষের মনে একটি আতঙ্ক তাড়া করে। এই সড়ক দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সড়ক দুর্ঘটনা আকস্মিক ছিনিয়ে নেয় পরিবারের একমাত্র আশা অন্ন -বস্ত্রের সংস্থানকারীকে যাহা কখনো কাম্য নয়। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কাউকে এককভাবে দায়ী করা যাবে না। নানারকম কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এই সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে পড়ে কিছু তাজা প্রাণ। দুর্ঘটনাগুলো বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর জন্যই বেশি হচ্ছে। দুর্ঘটনাগুলো  আরও ঘটে থাকে সড়ক ও মহাসড়কে ঝুকিপুর্ণ বাক ও রাস্তার বেহাল দশায় অসতর্কতাভাবে গাড়ি চালানো, অদক্ষ অযোগ্য ও লাইসেন্সবিহীন চালকের কারণে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচলে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অসাবধানে রাস্তা পারাপার বা রাস্তা পারাপারের নিয়ম না মানা, জনসংখ্যার চাপ এবং অপ্রতুল পরিবহন ব্যবস্থা ইত্যাদির কারণে। এছাড়াও রাজনৈতিক অস্থিরতা পথ সভা,পথ অবরোধ, হরতাল ইত্যাদি কারণে যানজট সৃষ্টির ফলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।

সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ আইন অমান্য করে গাড়ি চালানো। জরিপে দেখা গেছে, ৯১ শতাংশ চালক জেব্রা ক্রসিংয়ে অবস্থানরত পথচারীদের অধিকার আমলই নেয় না। পাশাপাশি ৮৫ ভাগ পথচারী নিয়ম ভেঙে রাস্তা পার হয়। এক সমীক্ষায়  দেখা গেছে, ঢাকা শহরে শতকরা ৯৫ জন রিকশাচালক ট্রাফিক আইন ও নিয়মের প্রাথমিক বিষয়গুলো ও জানে না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। সড়ক দুর্ঘটনার ফলাফল কেবল মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি নয়, অপূরণীয় আরো অনেক ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দেয় সাধারণের জীবনে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মানুষ প্রাণে বেঁচে থাকে বটে কিন্তু জীবনের স্বাভাবিক গতি তারা হারিয়ে ফেলে চিরকালের জন্য। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি অপূরণীয় এবং অসীম। এই সড়ক দুর্ঘটনার কারণে হঠাৎ একটি পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। ২০১০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে সারা পৃথিবীতে প্রায় ১০ লক্ষ  ১৮ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। ২ কোটির ও বেশি মানুষ আহত হয় এবং ৫০ লাখের  ও বেশি মানুষ পঙ্গু হয়। এছাড়াও ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু মারা যায় যাদের বয়স ১৫ বছরের ও কম। বাংলাদেশে পুলিশের এফআইআর অনুযায়ী ২০১৪ সালে শুধু মহাসড়কগুলোতেই ২ হাজার ২৭টি দুর্ঘটনা ঘটে এবং এতে ২ হাজার ৬৭ জন নিহত হয় এবং অন্তত ২ হাজার জন আহত হয়।

বাংলাদেশের যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয় ২০১৭ সালে প্রায় ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। এই সব দুর্ঘটনার মধ্যে ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়। এর মধ্যে হাত-পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গু হয়েছে ১ হাজার ৭২২ জন। ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিল। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ, নিহতদের সংখ্যা প্রায় ২২.২শতাংশ বেড়েছে এবং আহতদের সংখ্যা বেড়েছে ১.৮ শতাংশ। অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশে মহাসড়কসহ নিহতদের সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ১২-২০ হাজার জন। সম্প্রতি এক জরিপে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫% থেকে ৩০% শয্যায় দুর্ঘটনা কবলিত রোগীদের  ভর্তি করতে হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করছে অপ্রত্যাশিত চাপ। এর ফলে স্বাস্থ্যখাতে সীমিত সম্পদের অনেকখানিই চলে যায় সড়ক দুর্ঘটনার আহতদের সেবায়। নিঃশব্দ আততায়ীর মতো প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের চার হাজার স্বজনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুগুলো আমাদের মনভারী করে দেয়। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজন একটু সচেতনতা, ধৈর্য, সতর্কতা আর ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতা বেশি দেখা যায় ট্রাক, মিনিবাস আর দূরপাল্লার বাস চালকদের মধ্যে। এসব গাড়ির চালকগণ ভুলে যায় বেশ কিছু মানুষের জীবন কিছু সময়ের জন্য তাদের জিম্মাদারিতে রয়েছে। চালকগণ একটু সহনশীল হলে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোজনিত সড়ক দুর্ঘটনা সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। ট্রাফিক আইনের যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে যদি কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেক কমে যাবে। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করার জন্য গাড়ির লাইসেন্স ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের জালিয়াতি প্রতিরোধ করতে হবে।

বর্তমানে দেখা যায় লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ  অনভিজ্ঞ ড্রাইভারদের হাতে ছেড়ে দেন নিরীহ যাত্রীদের ভাগ্য। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, দেশের বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী গাড়ির মধ্যে অর্ধেকের বেশি গাড়ি লাইসেন্সবিহীন। আবার লাইসেন্সবিহীন গাড়ির মধ্যে অধিকাংশেরই রাস্তায় চলাচলের উপযোগী ফিটনেস নেই। ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল বন্ধ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালকদের কারণে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে যায় কত প্রাণ। স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়, কিন্তু তবুও মানুষকে পথ চলতে হয়। মানুষের পথ চলা যতদিন থাকবে দুর্ঘটনা ও ততদিন থাকবে। সচেতন হতে হবে চালক, হেলপার, যানবাহন মালিক, যাত্রী, পথচারী, ট্রাফিক পুলিশ সবাইকে। শক্ত হাতে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে তবেই এ নিঃশব্দ ঘাতকের রোধ করা যাবে। তাই বাড়াতে হবে জনসচেতনতা।

লেখক: সাংবাদিক।  

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar