রেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ গেটম্যানের অবহেলা


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০১ আগস্ট ২০২২, ১৫:৫৯

ডা. মু.মাহতাব হোসাইন মাজেদ: রেল দুর্ঘটনা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এলেও বড় দুর্ঘটনা থামানো যাচ্ছে না। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে রেললাইনের ত্রুটি বা রেলক্রসিংয়ে গাড়িচালকদের গাফিলতির কারণে। এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে বড় দুর্ঘটনা ঘটছে রেলকর্মীদের গাফিলতিতে।

সম্প্রতি মিরসরাইয়ের রেলক্রসিংয়ে (২৯ জুলাই ২০২২ ) শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে খৈয়াছড়া এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় পর্যটকবাহী মাইক্রোবাসের ১১ যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও সাতজন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হতাহতরা সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী এবং তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমানবাজার এলাকায়। দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনছার আলী জানান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসছিল ‘মহানগর প্রভাতী’ এক্সপ্রেস। খৈয়াছড়া এলাকায় একটি লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস লাইনে উঠে পড়ে।

সংঘর্ষের পর মাইক্রোবাসটি ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়। ওই অবস্থায় মাইক্রোবাসটিকে বেশ খানিকটা পথ ছেঁচড়ে নিয়ে থামে ট্রেন। সেসময় রেল কর্মকর্তা আনছার দাবি করেন, ‘ট্রেন আসায় সিগন্যাল পেয়ে গেটম্যান সাদ্দাম বাঁশ ফেলে ব্যারিকেড দিয়েছিলেন। কিন্তু মাইক্রোবাসটি বাঁশ ঠেলে ক্রসিংয়ে উঠে পড়ে।’ পরে পূর্বাঞ্চল বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আবুল কালাম চৌধুরী দাবি করেন, ‘ঘটনার সময় গেটম্যান উপস্থিত ছিলেন। তিনি বার বার লাল পতাকা উঁচিয়ে তাদের বারণ করলেও মাইক্রোচালক শোনেননি। তার অবহেলার কারণেই এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শী মফিজুল হক দাবি করেন, দুর্ঘটনার সময় সেখানে কোনো গেটম্যান ছিলেন না। তিনি জুমার নামাজ আদায়ে মসজিদে গিয়েছিলেন। ‘রেলপথে দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৯’ অনুসারে ৩৯৩টি রেল দুর্ঘটনায় ৮৯ নারী ও ৪৬ শিশুসহ ৪২১ জন নিহত এবং চার নারী ও ৩৩ শিশুসহ ৩৬৬ জন আহত হয়েছে। আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুসারে ২০১৯ সালে রেলপথে ৪৮২টি দুর্ঘটনায় ৪৬৯ জন নিহত ও ৭০৬ জন আহত হয়েছে।

২০২১ সালে রেল পথে ২৭০টি দুর্ঘটনায় ২৫৪ জন নিহত ও ৪২ জন আহত। বাংলাদেশে রেল দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে আর সবেচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে।
বাংলাদেশে নিয়মিত ঘটতে থাকা বিভিন্ন দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায় এমন সব কাঠামোগত কারণে বারবার মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা ঘটে যার অধিকাংশ কারণই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা থাকার কথা এবং সুনির্দিষ্ট কতগুলো পদক্ষেপ নিলে সেইসব দুর্ঘটনার হার বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু নানা কারণে এই অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো না নেয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা চলমান থাকাই বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য লাভজনক, ফলে এসব গোষ্ঠীর প্রভাবে কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের পথে বাধা তৈরি হয়।

আবার দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য যে বাড়তি বিনিয়োগ করতে হয় তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হলেও তাৎক্ষণিক লাভ লোকসান বিবেচনায় অনেকেই এই বিনিয়োগটুকু করতে চায় না। আর এ কারণেই নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি এক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দেখে দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের কোনো শাস্তি বা ক্ষতিপূরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না তাহলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিনিয়োগের কোনো তাগিদ সেই প্রতিষ্ঠানের থাকে না। বিপরীতক্রমে দুর্ঘটনা ঘটলে যদি তার পুঙ্খানুপঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার পূর্বশর্ত ও অন্তরালের বিভিন্ন কাঠামোগত কারণ উন্মোচন করে তার জন্য সংশ্লিষ্টদের সকলকে শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের মুখোমুখি করা হয় তাহলে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সকল ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে বাধ্য হয়।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar