পরোক্ষ ধূমপানে স্বাস্থ্যঝুঁকি


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ৩০ জুলাই ২০২২, ১৬:৫০

মিনহাজুল ইসলাম: ধূমপান দুই ধরণের হয়ে থাকে। একটা প্রত্যক্ষ, অন্যটি হলো পরোক্ষ। নিজে ধূমপান করলে সেটাকে বলা হয় প্রত্যক্ষ ধূমপান। আর, নিজে ধূমপান না করেও আশপাশে কারও ধূমপানের ফলে অনিচ্ছায় ধোঁয়া গ্রহণ করলে সেটাকে বলা হয় পরোক্ষ ধূমপান। ধূমপানরত ব্যক্তির সিগারেট থেকে নির্গত ধোঁয়া গ্রহণের মাধ্যমেই মূলত পরোক্ষ ধূমপানের ঘটনা ঘটে। আর এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমাদের দেশের প্রায় অধিকাংশ মানুষই প্রতিনিয়ত পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে।

অথচ, প্রত্যক্ষ ধূমপানের মতো পরোক্ষ ধূমপানও মারাত্মক ক্ষতিকর এবং কখনও কখনও তা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকজাত দ্রব্যের মধ্যে সিগারেট, বিড়ির মতো ধোঁয়াযুক্ত পণ্যগুলো শুধু সেবনকারীর স্বাস্থ্যেরই মারাত্মক ক্ষতি করে না, বরং আশেপাশের মানুষেরও সমান ক্ষতি করে। সিগারেটের ধোঁয়ায় সাত হাজারেরও বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ থাকে। যার প্রভাবে অধূমপায়ীরাও মারাত্মক রোগসমূহে আক্রান্ত হয়ে থাকে। পরোক্ষ ধূমপানের ফলে ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, স্ট্রোক ও প্রজনন সমস্যা দেখা দিতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, একজন অধূমপায়ী ব্যক্তি একটানা ৩০ মিনিট পরোক্ষ ধূমপান করলে হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচলে বাঁধার সৃষ্টি হতে পারে। বেড়ে যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি।

মাদকদ্রব্য নিরোধ সংস্থা (মানস) এর একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশে ৩৫ ভাগ নারী ও শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। পরোক্ষ ধূমপানের ফলে তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি ৫০-৬০ ভাগ বেড়ে যায়। এছাড়াও ধূমপায়ী ব্যক্তির ধূমপানের ফলে তার স্ত্রী ও সন্তান আক্রান্ত হতে পারে ফুসফুস ক্যান্সারসহ নানা রোগে। গর্ভবতী নারীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধূমপানের ফলে গর্ভের সন্তানের মারাত্মক ক্ষতি হয়। অপরিণত শিশু জন্ম নেবার আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়। এমনকি অকাল মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে প্রতিনিয়ত নিজের স্ত্রী ও শিশুর এতবড় ক্ষতি করে চলছেন ধূমপায়ীরা।

তাছাড়া ধূমপানের ফলে অপব্যায় হয় প্রচুর অর্থ। আর, ধূমপায়ী ব্যক্তিরা রোগাক্রান্ত হলে পরে তখন চিকিৎসার জন্য ব্যায় হয় বিপুল অর্থ। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বছরে ধূমপান ও তামাক গ্রহণের ফলে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা বাবদ দেশে প্রতিবছর ব্যায় হয় ৫ হাজার কোটি টাকা। ধূমপানের ফলে প্রতিবছর অর্থনীতিতে ক্ষতি হয় ২ হাজার ৬’শ কোটি টাকা।

প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে ২০০৫ সালে প্রণীত আইন অনুযায়ী, প্রকাশ্যে ধূমপানের জরিমানা ধরা হয়েছিল ৫০ টাকা। কিন্তু পরে ২০১৩ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের সংশোধনী এনে জনসমাগমস্থলে ধূমপানের শাস্তির অর্থ ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়। কিন্তু কোনোকালেও এই আইনের বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। হয়ত আইন তৈরিই হয়, তা অমান্য করার জন্য।

ফলে দেশের যত্রতত্র চলছে প্রকাশ্যে ধূমপান। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাঠ-ঘাট, হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশন, পার্ক সমস্ত জায়গা যেন আচ্ছন্ন হয়ে আছে তামাকের বিষাক্ত ধোঁয়ায়। এমনকি হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও মানুষ অহরহ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। অর্থ্যাৎ, এসব স্থানেও লোকেরা বিনা বাধায় ধূমপানের সুযোগ পাচ্ছে। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ধূমপায়ীদের ধোঁয়া তাণ্ডবে।

দেখা যায়, রাজধানীসহ দেশজুড়ে যত্রতত্র চলছে ধূমপান সামগ্রীর ক্রয়বিক্রয়। রাজধানীর রাস্তাঘাট, ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসটার্মিনালসহ সর্বত্রই চষে বেড়াচ্ছেন ধূমপান সামগ্রী বিক্রেতা হকাররা। ফলে জনবহুল জায়গাগুলোতে ধূমপানের প্রবণতা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর, পথচারী, নারী, শিশুসহ অধূমপায়ী ব্যক্তিরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এসব ধূমপায়ীদের দ্বারা। এছাড়াও দেখা গেছে, সিগারেটের ভেতর থেকে তামাক ফেলে সেখানে গাঁজা ভরে অনেকে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বিক্রি করছে।

সিগারেটের ভেতর বা সিগারেটের বক্সে অনেকটা নির্বিঘেœই বহন করা যায় মাদকদ্রব্য। ফলে, সিগারেটের পাশাপাশি মাদকদ্রব্যের রমরমা ব্যবসায় লিপ্ত হয়ে অধিক মুনাফা লাভের সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ তামাকজাত পণ্যের অনেক ব্যবসায়ীরা। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো অধিকাংশ মাদকসেবীদের খোঁজ নিলে দেখা যাবে, একটা সময় ধূমপানের মাধ্যমেই তারা ধীরে ধীরে অন্যান্য নেশাদ্রব্যে আসক্ত হয়েছে। যা উদ্বেগজনক।

এখন প্রশ্ন হলো, পরোক্ষ ধূমপানের ফলে অমূমপায়ীরাও ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানা রোগের ঝুঁকিতে পড়ছে, তার দায়টা দিনশেষে কে নিবে? প্রকৃতপক্ষে দায়টা কেউ নেয়না, রাষ্ট্রও নিবেনা এর দায়। কেবল ভুক্তভোগী হতে হয় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার ব্যক্তিদেরই। কিন্তু কেন সর্বত্র চলবে এমন ধোঁয়া সন্ত্রাস? কেন সর্বত্র নিকোটিনের বিষবাষ্প ছড়াবে একদল লোক? এ রকম হাজারও প্রশ্নের জবাব যে অজানাই থেকে যায়।

জনবহুল স্থানে ধূমপান আইনগত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আইনটি বাস্তবায়নের স্বার্থে সরকারের উচিত অন্ততপক্ষে জনবহুল স্থানে ধূমপান বন্ধের উদ্যোগ নেয়া। এজন্য সর্বপ্রথম যত্রতত্র ধূমপান সামগ্রীর ক্রয়বিক্রয় বন্ধ করা উচিত। একইসাথে সরকারকে প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে কঠোর আইন করতে হবে এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই প্রকৃতির বাতাস হবে নির্মল। আগামী প্রজন্মের জন্য অধিক বাসযোগ্য হবে এইদেশ। সেদিন যত্রতত্র থাকবেনা আর ধোঁয়ার বিষবাষ্প। এমনই একটি সুন্দর প্রকৃতি দেখার কামনা রইল।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar