ছোট দলের বড় নেতাদের আস্ফালন


  • মোনায়েম সরকার
  • ১৯ নভেম্বর ২০২১, ১১:৪৯

১৯৪৭ সালের পর থেকেই মূলত বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্বাধিকার আন্দোলন প্রবল হতে থাকে। ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষা ও উর্দুর ভাষার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ১৯৫২ সালে রক্তাক্ত রূপ নেয়। ১৯৪৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (জন্ম মুহূর্তে নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ) নামের রাজনৈতিক দল গঠিত হলে পূর্ববঙ্গের মানুষ নতুনভাবে স্বাধিকারের পক্ষে জেগে ওঠে। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো বরেণ্য নেতৃবৃন্দ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিভিন্ন সময় যুক্ত ছিলেন। এসব মহান নেতার হাত ধরে রাজনীতিতে আসা শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পান, তখন তিনি ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের বলে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করেন বাঙালি জাতিকে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের ইতিহাসই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জš§ আওয়ামী লীগের হাত ধরেই হয়। তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও আওয়ামী লীগকে সে সময় সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করে। কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের উনিশ হাজার গেরিলা যোদ্ধা সেদিন রণাঙ্গণে যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন বাংলার ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। রক্ত আর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠিত হলে বাংলাদেশে এক বিপ্লবী অস্থিরতা শুরু হয়।

মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান তুলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে লক্ষচ্যুত করতে উঠে পড়ে লাগে। জাসদের কর্মকাণ্ড যারা স্বচক্ষে দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারবেন, সমাজতন্ত্রের নামে জাসদ কী অরাজকতা সেদিন সৃষ্টি করেছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সবকিছুই জাসদ নেতারা গুঁড়িয়ে দিতে বদ্ধ পরিকর ছিলেন। জাসদই পলিটিক্যালি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পৃথিবীর ইতিহাসে যে নির্মম ঘটনা ঘটে সেই কলঙ্কিত ঘটনার পেছনেও ছিল জাসদের নীলনকশা।

জাসদের আ স ম আবদুর রব ও হাসানুল হক ইনু-র ভূমিকা নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না, শুধু এটুকু বললেই বোধ করি সব বলা হবে, যে আ স ম আবদুর রব বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, সারাক্ষণ বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে বসে থেকে নির্দেশনা মাথা পেতে নিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে সেই রবের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড শুধু তাকেই আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেনি, বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে বামপন্থিদের বিপদ বামপন্থিরা নিজেরাই ডেকে এনেছেন।

এ দেশের বাম নেতাগণ কখনোই ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেন না। তারা কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেন না। প্রত্যেকেই মনে করেন তিনিই সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও বিপ্লবী। অথচ সংকটের সময় ওই ‘বড় তাত্ত্বিকই’ সবার আগে ভোল পাল্টিয়ে স্বৈরাচারীর সঙ্গী হন। পূর্বে আমরা এমনটাই বারবার দেখেছি। এ কারণেই আজ বাংলাদেশের বামপন্থিদের এই করুণ দশা। জাসদ আজ বহুভাগে বিভক্ত। রব, ইনু, আম্বিয়া ও নাজমুল প্রধানের নেতৃত্বে এই দল আরো কত টুকরো হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

জাসদের জন্মের আট বছর পরে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর জš§ হয়। ১৯৮০ সালের ৭ নভেম্বর কমরেড খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে বাসদ গঠিত হলেও আত্মকলহে নিপতিত হয়ে দলটি ভাঙনের মুখে পড়ে হীনবল হয়ে পড়ে। বাসদ এখন আর আগের মতো শক্তিশালী নেই, তবে পত্র-পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে, কর্মীহীন সভা-সেমিনারের আয়োজন করে এই দল তার সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কতদিন এভাবে চলবে তা কেউই বলতে পারে না। তবে দলীয় কোন্দল পর্যবেক্ষণ করে বলা যায়, অচিরেই এই দল মুখ থুবড়ে পড়বে। ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগের একজন সাবেক নেতা। মন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি প্রার্থীসহ ব্যক্তিগত স্বার্থ কানায়-কানায় পূর্ণ করে তিনি আওয়ামী লীগের ভরাডুবি করেন।

তার সুযোগসন্ধানী আচরণ ও দলীয় আনুগত্য ভঙ্গের দায়ে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে গিয়ে ১৯৯৩ সালে গণফোরাম নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। গণফোরাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম না হলেও কথায় এরা রাজা-উজির মারতে বিশেষ পারঙ্গম। গণফোরামের পক্ষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করা অসম্ভব। এরা এয়ারকন্ডিশন ঘরে বসে শুধু সেমিনার করে আর পত্রিকায় উল্টাপাল্টা কথা বলে আলোচনায় থাকতে ভালোবাসে। এদের আস্ফালন শুনে মনে হয়, এরা অনেক শক্তিশালী, কিন্তু ভোটের সময় যখন এদের শতভাগ জামানত বাজেয়াপ্ত হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, বাংলাদেশের জনগণ গণফোরামের রাজনীতি ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। ড. কামাল হোসেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধে তার তেমন কোনো অবদান না থাকলেও দীর্ঘদিন তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি ছিলেন। আওয়ামী লীগ তাকে মূল্যায়ন করলেও আওয়ামী লীগের ক্ষতি ছাড়া কখনো তিনি উপকার করেননি।

এখনও তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানান অপপ্রচারে লিপ্ত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ড. কামাল হোসেন ও তার গণফোরাম স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নির্বাচন মুহূর্তে যেসব বেফাঁস কথাবার্তা বলেছেন, তা শুনে এদেশের মানুষ হতবাক হয়ে গেছেন। ড. কামাল হোসেন আমার বিশেষ বন্ধু ছিলেন। বয়সে তিনি আমার বড় হলেও আমাদের বন্ধুত্ব গভীরই ছিল। দীর্ঘদিন রাজনীতি করে ২০০৪ সালে আমি রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিই। ড. কামাল হোসেনকেও পরামর্শ দিব আপনি অবসর গ্রহণ করুন। গণফোরামের অনেকেই আপনাকে ছেড়ে গেছে, ধীরে ধীরে সবাই ছেড়ে যাবে। যতটুকু সম্মান এখনো অবশিষ্ট আছে ততটুকু নিয়ে ঘরে ফিরে যাওয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৪১টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আছে। পূর্বে এই সংখ্যা ছিল ৪৪টিতে। তিনটি দলের নিবন্ধন নানা জটিলতায় বাতিল হয়ে যায়। এর মধ্যে যারা নিবন্ধন হারিয়েছেন তারা চেষ্টা করছেন নিবন্ধন ফিরে পেতে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের বাইরেও আরো কিছু অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে যাদের গণসমর্থন নেই কিন্তু গলার জোরে এরা চারপাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি দল ছাড়া তাদের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, এমনকি পার্লামেন্টে প্রার্থী দেয়ার ক্ষমতা নেই।

২০১২ সালের ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সামনে রেখে ‘নাগরিক ঐক্য’ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। দুইবার ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। মাহমুদুর রহমান মান্নার উদ্যোগে ৩ জন উপদেষ্টা ও ১৮৬ জন সদস্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে নাগরিক ঐক্য। ‘নাগরিক ঐক্য’ যে প্রত্যাশা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছিল, তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, এটাও একটি সাইনবোর্ডসর্বস্ব রাজনৈতিক দল। এই দলের মাঠ পর্যায়ের কোনো কার্যক্রম না থাকলেও পত্র-পত্রিকায় সরব উপস্থিতি আছে।

টকশোতে গিয়েও মান্না সাহেব জানান দিচ্ছেন তার দলের উপস্থিতি। আজকাল ভাড়া করা কিছু সুশীল বুদ্ধিজীবী পাওয়া যায়, যারা সবখানেই উপস্থিত থেকে মানুষের মগজ ধোলাই করেন। এই পতিত বুদ্ধিজীবীগণ আওয়ামী লীগের কোনো কাজেই ভালো কিছু খুঁজে পান না। আওয়ামী লীগ সরকার যে দেশের জন্য এত উন্নয়ন করছেন, বিশ্বসভায় বাংলাদেশের গৌরব বৃদ্ধি করছেন, এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন আত্মবিক্রীত বুদ্ধিজীবীগণ। এসব স্বার্থলোভী বুদ্ধিজীবীর কথায় মানুষ আজকাল কান দেয় না।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ‘গণ অধিকার পরিষদ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে। ২৬ অক্টোবর, ২০২১ সালে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে এই দল গঠিত হয়। এই দলের আহ্বায়ক নির্বাচত হন আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার পুত্র ড. রেজা কিবরিয়া। ড. রেজা পূর্বে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম পার্টির মহাসচিব ছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচন করে পরাজিত হয়ে সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরুকে নিয়ে ‘গণ অধিকার পরিষদ’ গঠন করেন।

জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় আসেন নুরু। জামায়াতে ইসলামীর মৌলবাদী আদর্শ বাস্তবায়ন করতে নতুন একটি দল গড়া খুব প্রয়োজন ছিল। সেই কাজটিই কৌশলে করা হলো ‘গণ অধিকার পরিষদ’ গঠনের মধ্য দিয়ে। পত্র-পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিনই এই নতুন দলের নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছেন। এদের মিথ্যাচারিতায় ক্রমে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নত এদের উদ্দেশ্য নয়, এদের উদ্দেশ্য হলো স্বাধীনতা ও বাংলাদেশবিরোধী গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামীকে পুনর্বাসন করা। সম্প্রতি আফগানিস্তানে ধর্মান্ধ তালেবান গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার ফলে বাংলাদেশেও মৌলবাদী গোষ্ঠী আরো উজ্জীবিত হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরে এদেশ যেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল সেখানে পৌঁছাতে পারেনি কেবল বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে। আজ একথা প্রমাণ হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই শুধু বাংলাদেশের উন্নতি হয়। এদেশের মানুষ খেয়ে পরে ভালো থাকে।

আজ বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে এক হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে সরিয়ে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় আনতে। এদেশের মুক্তিকামী লড়াকু জনগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে অপরাজনৈতিক কৌশল পরাজিত করবেন এমনটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা। ঠোঁটের কথায় কিংবা জোটের আস্ফালনে নয়, মানুষের ভোটেই বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচালিত হোক।

লেখক: রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট


poisha bazar

ads
ads