নজরুলের জীবনের শেষ অধ্যায়

আফতাব চৌধুরী
আফতাব চৌধুরী - সংগৃহীত।

  • আফতাব চৌধুরী
  • ২৯ আগস্ট ২০২১, ০৯:৩২,  আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২১, ১৬:৫৬

কবি নজরুল ইসলাম ছিলেন মানবপ্রেমিক, চিরদুর্দম, বিদ্রোহী, আত্মভোলা, পরোপকারী, স্বাধীনচেতা ও সর্বোপরি আল্লাহনির্ভর। কিন্তু সেই আল্লাহনির্ভর, চিরদুর্দম বিদ্রোহী কবিও এক সময় জীবনের কাছে হেরে গেলেন, অসহায় শিশুর মতোই এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়লেন এক দুরন্ত দুরারোগ্য মস্তিষ্কের কঠিন ব্যাধিতে।

তারিখটি ছিল ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই। এর আগে ১৯৪০ সালে কবিপত্নী প্রমীলা ইসলাম নিদারুণ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। স্ত্রীর নিরাময়তার জন্য তিনি অজস্র অর্থ ব্যয় করেন। কিস্তিতে কেনা মোটরগাড়ি, বালিগঞ্জের ভক্তের দান করা জমি, গ্রন্থাবলির কপিরাইট, রেকর্ড করা গানের রয়ালটির টাকা সবই স্ত্রীর চিকিৎসায় খরচ করলেন। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি।

এদিকে অসুখের জন্য কবির কথা বলার ও লেখার শক্তি আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ চলে যায়। ১৯৪২ সালের ১৭ আগস্ট কবি তার অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুজপ্রতিম সুফি জুলফিকার হায়দারকে যে পত্র লিখেছিলেন তাতে তার মানসিক অবস্থার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। পত্রটির কিয়দংশ এখানে উদ্ধৃত করা হলো :

‘প্রিয় হায়দার,
.........Blood pressure- এ শয্যাগত। অতিকষ্টে চিঠি লিখছি। আমার বাড়ীতে অসুখ, ঋণ, পাওনাদারের তাগাদা প্রভৃতি worries, সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত খাটুনী। তারপর নবযুগের worries ৩/৪ মাস পর্যন্ত। এই সব কারণে আমার nerves shattered হয়ে গেছে। ৬ মাস ধরে হক সাহেবের কাছে গিয়ে ভিখারীর মত ৫/৬ ঘণ্টা বসে থেকে ফিরে এসেছি। .....আমি ভাল চিকিৎসা করাতে পারছি না।

.....আমার হয়ত এই শেষ পত্র তোমাকে। ....কথা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অতি কষ্টে দু’একটা কথা বলতে পারি, বললে যন্ত্রণা সর্বশরীরে। হয়ত কবি ফেরদৌসীর মত ঐ টাকা আমার জানাজার নামাজের দিন পাব। কিন্তু ঐ টাকা নিতে নিষেধ করেছি আমার আত্মীয়-স্বজনকে। চিকিৎসার ব্যাপারে অবশ্য প্রথমদিকে বেশ কিছু ত্রুটি হয়েছে এবং বলা ঠিক হবে অবহেলাই করা হয়েছিল।

নতুবা কে জানে হয়তোবা আজকের দিনের মতো এমনি এক ‘অসুখ সারাবার নয়’ বলবার মতো দিন নাও আসতে পারত। তথাপি যতদিন কবিপত্নী প্রমীলা জীবিত ছিলেন কবির প্রতি যতুআত্তি ভক্তি ভালোবাসার কোনো ত্রুটি ছিল না। পক্ষাঘাতাক্রান্ত অবস্থায় শুয়ে শুয়ে সংসার চালানো ছাড়াও কবির সেবা শুশ্রুষা করে গেছেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত।

কবির যত্নের ব্যাপারে প্রমীলা সম্বন্ধে কবির পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী বলেছেন : ‘যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রমীলা বেশির ভাগ দিন-ই তিনি নিজের হাতে বাবাকে খাইয়ে দিতেন। খাওয়া শেষ হলে তার হাতমুখ ধুইয়ে সযত্নে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিতেন। তিনি খাবার পরিবেশন না করলে, বা তার সামনে বসে না খেলে আমাদের তৃপ্তি হতো না।

বাবার সম্বন্ধে তার দায়িত্বজ্ঞান ও কর্তব্যবোধ ছিল অসাধারণ, গভীর রাত্রে সবাই যখন সুপ্তিও কোলে নিমগ্ন তখন তিনি একা খেলে চলেছেন হয় লুডো, নয় তাস, নয়ত বা চাইনিজ চেকার। উদ্দেশ্য, বাবাকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দেয়া। কারণ, বাবা ঠিক এক নাগাড়ে ঘুমোতেন না। তাই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম, ঠক্ ঠক্ করে ঘুঁটির আওয়াজ হচ্ছে আর থেকে থেকে একটি কণ্ঠস্বর বলে উঠছে- এসো, বাইরে যেয়ো না। শোনো, শুয়ে পড়ো।’

আগেই উল্লেখ করেছি, প্রথম অবস্থায় কবির সুচিকিৎসা হলে হয়তো আমরা কবিকে জীবন্ত অবস্থায় না পেয়ে সুস্থ অবস্থায় পেতাম। যে জাতিকে কবি অকাতরে অনেক কিছুই বিলিয়ে দিয়েছেন, তার দিকে তাকিয়ে দেখার সময় এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কয়েক বছর সরকার বা আমাদের হয়ে ওঠেনি। প্রথম অবস্থায় কবি পরিচিত কাউকে দেখলেই মুখে অদ্ভুত শব্দ করে কী যেন বলতে চাইতেন।

হয়তোবা তাই : যে দেশ এবং জাতির জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করলাম, ওরা কেন আজ আমার খোঁজ নেয় না? আমার আজ এই দুর্দশা কেন? এই প্রসঙ্গে ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে শ্রদ্ধেয় মুজাফফর আহমেদ লিখেছেন: ‘১৯৪২ সালে জুলাই মাসে তার রোগ যখন সকলের চোখে প্রকাশ পেল তখন চিকিৎসা হয়েছিল বটে কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা অত্যন্ত অপরিমিত ও অসম্পূর্ণ হয়েছে।

তখন অবশ্য কোন কোন ডাক্তার বলেছিলেন যে বড় দেরি হয়ে গেছে, তখন যদি কবিকে ইউরোপে পাঠানো যেত তাহলে তার মস্তিষ্কে অপারেশন অন্তত হতে পারতো...কিন্তু নজরুল নিরাময় সমিতি গঠিত হয়েছিল বড় দেরিতে- ১৯৫২ সালের জুন মাসে।’ এর সম্পাদক ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ এবং প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

তিনি কবিকে দেখে ব্যথিত হলেন এবং হাতে পাঁচশ’ টাকা দিয়ে নানা রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন। কবি এবং তার পত্নীকে পাঠানো হলো লন্ডনে। তারিখটি ছিল ১৯৫৩ সালের ১০ মে। ডা. উইলিয়ম স্যারগ্যান্ট, ই এ বেটন, রাসেল ব্রেন নজরুলকে পরীক্ষা করেন। কিন্তু চিকিৎসার ব্যাপারে তারা একমত হতে না পারায় কবি ও তার স্ত্রীকে পাঠানো হয় ভিয়েনাতে।

৯ ডিসেম্বও নজরুলের ওপর সেরিব্র্যাল অ্যানজিওগ্রাফি পরীক্ষা করা হয়। ফলস্বরূপ প্রখ্যাত স্নায়ু বিশেষজ্ঞ ডা. হ্যান্স হক বলেন যে, নজরুল ‘পিকসডিজিজ’ নামক এক প্রকার মস্তিষ্কের রোগে ভুগছেন, যা নিরাময়ের বাইরে। এই রোগে রোগী শিশুর মতো ব্যবহার করেন এবং মস্তিষ্কের সামনের ও পাশের অংশগুলো সংকুচিত হয়ে যায়।

১৯৭৫ সালে চলে গেলেন কবির কনিষ্ঠ পুত্র ‘নিনি’ অর্থাৎ কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম। স্তব্ধবাক কবি কিছুই বুঝলেন না, কিছুই জানলেন না। কবি নজরুলের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের আর এক কবি মাইকেল মধুসূধন দত্তের কথা মনে পড়ে গেল, জানি না ইতিহাসের ডাস্টবিনের তলায় এরা একদিন তলিয়ে যাবেন কি না।

মাইকেলের অন্তরঙ্গ বন্ধু গৌরদাস বসাক তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘পাশাপাশি দুটি বিছানায় দুটি রোগগ্রস্ত জীবন, জীবন সাধনা শেষে সিদ্ধির সাথে এগিয়ে চলেছেন, মাইকেল আর হেনরিয়েটা, স্বামী আর স্ত্রী।....এক দুর্গন্ধযুক্ত গন্ধ, মোষের খাটালের উপর তলায় মশার ঝাঁক আর নোংরা জঞ্জাল স্তূপের দুর্গন্ধের অবাঞ্ছিত আবহাওয়ায় বাংলা দেশের বিস্মৃতপ্রায় আর এক কবি আর তার নম্রসহচরী....জনমানবের অবহেলার বস্তুর মতো পড়েছিলেন।’

মাইকেলের শেষ জীবনের সঙ্গে নজরুলের শেষ জীবনের এ যেন এক অদ্ভুত মিল। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের কথাতেই তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়, ‘বাড়ির নীচ থেকে ভেসে আসে গোবর পচা ভ্যাপ্সা দুর্গন্ধ। মোষের খাটালের একঝাঁক মশা এসে ঘরের অন্ধকার কোণে কবিকে করে অভিনন্দন। ....মশারা অন্তত সে সম্বন্ধে উদাসীন নয়।

অদূরে অনড় অবস্থায় প্রমীলা স্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছেন।’ ১৯৭১ সালে জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশের। ১৯৭২ সালের ২৪ মে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে কবিকে নিয়ে আসা হলো ঢাকায়। জীবনের শেষ চার বছর কবি এখানেই ছিলেন।

নজরুল সংগীত গুরু প্রয়াত ধীরেন বসু কবি সম্বন্ধে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক জায়গায় বলেছিলেন, ঢাকায় কবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকীতে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে কাজী সব্যসাচী, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, কল্যাণী কাজী, ধীরেন বসু সকলেই কবিকে মাল্যদান করতে গেছেন, কিন্তু কবি কিছুতেই মাথা তুলছেন না। এমতাবস্থায় কাজী সব্যসাচী ধীরেন বসুকে বললেন, ‘ধীরেন তোমার গাওয়া সেই গানটি ধরো।’

হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে ধীরেন বসু গাইলেন, ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি।’ গান শেষ হলো, কবি মাথা তুলে সকলকে দেখলেন, মাল্যদানের পালা শেষ হলো। কবি আজ আমাদের মধ্যে নেই, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি চিরকালের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, যদিও তার মানসমৃত্যু হয়েছিল ১৯৪২ সালেই।

তার কবিতা, গান দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করবে কোটি কোটি মানুষকে, অনুপ্রাণিত করবে বীবত্বপূর্ণ ও নিঃস্বার্থ কাজে আত্মনিয়োগ করতে। যে যেখানে আছি সেখানে দাঁড়িয়ে নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী বুঝবার চেষ্টা করব কবির সেই উক্তি : ‘বন্ধুগো। সুরু! আঁখি খোলো, খোলো শ্রবণ হইতে ঐ হের পথে গর্খা সেপাই উড়াইয়া যায় তুলা ধুলা। ঐ শোনো আজ ঘরে ঘরে কত উঠিতেছে হাহাকার, ভ‚ধর প্রমাণ উদরে তোমার এবার পড়িবে মার।

তোমার আর্টের বাঁশরীর সুরে মুগ্ধ হবে না এরা, প্রয়োজনে বাঁশে তোমার আর্টের আর্টশালা হবে নেড়া। প্রেমও আছে গুরু, যুদ্ধও আছে, বিশ্ব এমনি ঠাঁই, ভালো নাহি লাগে, ভালো ছেলে হয়ে ছেড়ে যাও, মানা নাই!....যত বিদ্রুপই কর গুরু তুমি জান এ সত্য-বাণী।

কারুর পা পেটে মরিব না, কোন প্রভু পেটে লাথি হানি ফাটাবে না পিলে, মরিব যেদিন মরিব বীরের মত, ধরা-মার বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত! আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস, ততদিন গুরু সকলের সাথে করে নাও পরিহাস।’

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।


poisha bazar

ads
ads