উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভুলের মাসুল জনতার ঘাড়ে

আকমল হোসেন
আকমল হোসেন - ছবি : সংগৃহীত

  • আকমল হোসেন
  • ২৭ আগস্ট ২০২১, ১২:০৩

সম্প্রতি দেশের কয়েকটি প্রথমসারির দৈনিক পত্রিকায় সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কতগুলো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নানাবিধ ভুলের কারণে সরকারি অর্থের অপচয়ের খবর প্রকাশিত হওয়ায় উপরোক্ত প্রবাদ বাক্য দুটির কথা মনে পড়ল। উপরোক্ত ঘটনায় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করলেও তেমন একটা কাজ হয়নি।

ফলে সরকারি অর্থের অপচয় অব্যাহতভাবে চলছে। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হওয়া, কিছু প্রকল্প পরিকল্পনাজনিত ত্রুটি, কিছু প্রকল্পের স্থায়িত্বকাল অতিক্রম না করার কারণে উপযোগিতা বিবেচনায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। এ সকল কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে সরকার, চূড়ান্তভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে দেশের জনগণ।

নতুন কোনো স্থাপনা/উন্নয়ন কাজ করার পূর্বেই তার সমীক্ষা/ফিজিবিলিটি করা হয়। সমীক্ষা/ফিজিবিলিটির জন্যও দেশি-বিদেশি পরামর্শকও নিয়োগ করা হয় । রেলের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের দিয়ে কাজ করানোর পরও রেলকে লোকসানবিমুখ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়নি, তাহলে মোটা অংকের টাকায় নিয়োজিত ঐ পরামর্শকদের কাজটা কি এবং কেনইবা তাদের নিয়োগ দেয়া হয়? এমন প্রশ্ন সবার মনে।

সরকারি কাজে নিয়োজিত এই সকল মানুষ জনগণের সেবক এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী (সার্ভেন্টস অব দি স্টেট)। জনগণের খাজনা কর ও ভ্যাট থেকে তাদের বেতন চলে সেই কারণেই জনগণের সেবক হিসেবে জনগণের সম্পত্তির নিরাপত্তাবিধান করা তাদের দায়িত্ব। দায়িত্বের অবহেলা মানে আমানতের খেয়ানত করা।

জনগণ এবং রাষ্ট্র তাকে সেই অধিকার দিয়েছে কি? দেয় নাই। ৬ বছর পূর্বে নেয়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েল গেজ রেল লাইনের পরিকল্পনাগত ত্রুটির কারণে নতুনভাবে কাজের জন্য অতিরিক্ত ৪ শত কোটি টাকা লাগছে (যুগান্তর ২৯ জুলাই/২০২১)। করোনা থেকে নিরাপদ থাকতে সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়েও রেলের বড় ধরনের আর্থিক অপচয়ের নজির রয়েছে।

৮ টাকার গ্লাভস ৩২ টাকায়, ১০ টাকার মিনি সাবান ২৫ টাকায়, ১২০ টাকা দামের গুঁড়া সাবান ১৮৮ টাকায় ক্রয়ের ঘটনা ঘটেছে (প্রথম আলো, ১৫ নভেম্বর/২০২০)। ২০০৯ সালে ঢাকার বসিলায় ৮৪ কোটি টাকা খরচে সেতু নির্মাণের ১২ বছরের মাথায় এসে সেটি নির্মাণ ত্রæটির কথা বলে, সেতুটি ভেঙে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে নতুন করে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

যুক্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, ঐ নদী দিয়ে গাবতলীতে কার্গো জাহাজ যেতে অসুবিধা হচ্ছে সেই কারণে সেটি ভেঙে উঁচু করতে হবে। কিন্তু গাবতলীতে আগেও কার্গোর মাধ্যমে মাল পরিবহন এবং লোড-আনলোড হতো, তাহলে সেই ভাবনাটি আগে ভাবলেই জনতার দুর্ভোগ যেমন হতো না সাথে সাথে অতিরিক্ত টাকাও খরচ হতো না।

মুন্সীগঞ্জের টুঙ্গিবাড়ীতে সেতু উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়েছে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের জন্য জানালার পর্দা, ৩০০ টাকার বাল্ব ৩৭০০ টাকায়, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মেশিনপত্র ক্রয়, করোনা প্রতিরোধে মাস্ক ক্রয়ে অতিরিক্ত টাকা ব্যয়, পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঘটনা, সর্বশেষ জনগণের খাজনা কর ও ভ্যাটের টাকায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে বসতবাড়িহীন মানুষগুলোকে যে দুই কক্ষের ঘর দেয়া হচ্ছে, সেটিতে মানুষ ওঠার আগেই ভেঙে পড়ছে, ৩৪টি উপজেলায় এমনটা ঘটেছে।

যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ১৭টি প্রকল্পে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় দেখানো, এর মধ্যে ১২টি প্রকল্পে ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে এমন প্রতিবেদন দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগ (১৩/৮/২০১৩, মানবকণ্ঠ)। ২০১০ সালে জিয়া বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের কারণে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল (২০/২/২০১০,আমাদের সময়)।

স্বাধীনতার পরে ৩৮ বছরে বাংলাদেশ বিমান লোকসান করেছে ১ হাজার ১ শত কোটি টাক। বিমান কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা এবং বিমান ক্রয়ে অস্বচ্ছতার কারণে এটা হয়েছে বলে বিমান বিষয়ক সংসদীয় কমিটি এমন মন্তব্য কমরছিল (৭/৫/২০০৯, প্রথম আলো)।

নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় পরিবেশকে মানুষের বাসযোগ্য রাখতে প্লাস্টিকের পরিবর্তে সুতি ও পাটের গুরুত্ব বাড়লেও আদমজী জুট মিলকে লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করা হয়েছিল, বিশেষজ্ঞদের মতামত ছিল ২৩০ কোটি টাকা ব্যয় করে এর যন্ত্রপাতিকে আধুনিক করলে লোকসান অভারকাম করা যেত, কিন্তু সেটা না করে বিশ্বব্যাংক থেকে ৮৩১ কোটি টাকা ঋণ করে আদমজীকে বন্ধ করে বেকার করা হয়েছিল শ্রমিকদের, তখনও আদমজীর ৩০০ একর জমির দাম ছিল ৯০০ কোটি টাকা (১১/১১/২০০২,সাপ্তাহিক একতা)।

আদমজী যখন বন্ধ করা হয় তখন বিশ্ব ব্যাংকের টাকায় ভারতে ১৯টি পাটকল গড়ে উঠেছিল। উচ্চ শিক্ষার মান উন্নয়নের নামে বিশ্বব্যাংকের ঋণে (বিশ্বব্যাংক-৫৯৮.২০ কোটি, দেশি-৮২ কোটি টাকা) ৬৮০ কোটি টাকার প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ ঘুরিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষককে গবেষণা পেপার লেখার প্রশিক্ষণ দিয়ে সাধারণ জনতার টাকার শ্রাদ্ধ করা হয়েছে (২৫/৩/২০১৫,মাসিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমা)।

সরকারি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিকট বিআরটিসিকে ভাড়া দেয়ায় সাধারণ পাবলিক এর সুবিধা পায় না। তারপরও ২০১৬ সালে রাজধানীবাসীকে নিরাপদ পরিবহন সুবিধা দেয়ার কথা বলে ১০০ কোটি টাকায় ১৩৮টি বাস ১২ বছরের ওয়ারেন্টিতে ক্রয় করলেও ২ বছরের মাথায় সব লক্কড়-ঝক্কড় হয়ে পড়লে সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, (২৬/১/২০১৬, সমকাল)।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে মিরপুর জোনের ৮৪৭.৮৫ একর জমি বেহাত হয়েছে যার বাজার মূল্য ১১ হাজার ৮ শত ৩৪ কোটি টাকা (প্রথম আলো ২০ জুন/২০২১)। ঢাকা ওয়াসার কাজের মান খারাপ হওয়ায় চলমান ২ শত ২২ কোটি টাকার প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে, ইতোমধ্যেই প্রকল্পের ৩২ ভাগ কাজের জন্য ১৭৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে (যুগান্তর ১ জুলাই/২০২১)। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ স্থাপন কাজে অনিয়মের বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।

সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মসহ আর্থিক অস্বচ্ছতার বিষয়টিও রয়েছে। ২০১২-২০১৪ সালের মধ্যে কাজ সমাপ্ত করতে ২৭৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয় একনেকে অনুমেদিত হয়, এর পর দুই দফায় কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয় একং ব্যয় বেড়ে হয় ৬১১ কোটি টাকা (যুগান্তর ২ আগস্ট/২০২১)।

সরকারি এই সকল কাজে অর্থের অপচয়ের কারণ অনুসন্ধান করার জন্য সংসদীয় কমিটি, প্রকল্প বাস্তবায়ন মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগ, অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির মতামতে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া যায় কিন্তু এই সকল অনিয়মের সাথে জড়িতদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকায় এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না।

এই সকল নেটওয়ার্কে রাজনীতিক আমলা, প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং ঠিকাদাররা জড়িত। প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই চক্র গড়ে উঠেছে যাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। এই চক্রের সম্পত্তির হিসাব করলে তা সহজেই ধরা সম্ভব। সরকারি চাকুরেদের ৫ বছর পর পর সম্পত্তির তালিকা জমা দেয়ার বিধান থাকলেও তা জমা হয় না।

এইভাবে সরকারি সম্পদের হরিলুট এবং উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ বৃদ্ধির কারণে জনগণের ওপর খাজনা কর ও ভ্যাটের অংক বাড়ছে। এই চক্রের বিরাট একটা অংশ আলিসান জীবনযাপন দেশের বাইরে টাকা পাচার, বিদেশে সেকেন্ড হোম তৈরির সঙ্গে জড়িত। এইভাবে দেশে দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে। ১৯৭৩-১৯৮২ দেশে মাঝারি আকারের দুর্নীতি, ১৯৮৩-২০০১ উচ্চ আকারের দুর্নীতি, ২০০২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ দুর্নীতির বিস্তার হয়েছে (১৯/২/১৯ প্রথম আলো)।

ফলে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। ১৯৭৫ সালে কোটিপতি ছিল ৪৭ জন, ২০০৮ সালে সেটা হয়েছে ১৯ হাজারের বেশি, ৩৮ বছরে সেটি বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ২৬৩ জন, চার দশকে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৫০০ গুণ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ মার্চ/২০১১)।

দেশে কোটিপতি বাড়ছে, সেইসাথে ঋণ খেলাপির সংখ্যাও বাড়ছে এবং টাকা পাচারের সংখ্যাও বাড়ছে। ২০১৪ সালে টাকা পাচার হয়েছিল ৭৪ হাজার ৬ শত ২০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে পাচার হয়েছিল ৭৫ হাজার ৩ শত পঁচানব্বই কোটি টাকা, যে টাকায় ৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত (সমকাল, ৩ মে/২০১৭)।

শুধু সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলিতেই (সুইচব্যাংক) ২০১৫ সালে জমা হয়েছিল ৪ হাজার ৭ শত ৩০ কোটি আর ২০১৬ সালে জমা পড়েছিল ৫ হাজার ৬ শত ৮৫ কোটি টাকা। দিন দিন এই সংখ্যাটা বাড়ছেই। নানাভাবে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের টাকার নয়-ছয়ের কারণে অতিরিক্ত টাকার সংস্থান করতে সরকারকে ঋণ করতে হচ্ছে, ২০১৭/১৮ অর্থবছরে ঋণ ছিল ৮ হাজার ২ শত ৮ কোটি, ২০১৮/১৯ অর্থ বছরে ৩০ হাজার ৮ শত পঁচানব্বই কোটি এবং ২০১৯/২০ অর্থ বছরে সেই ঋন বেড়ে হযেচে ৪৯ হাজার ১ শত পাঁচ কোটি টাকা(প্রথম আলো ২১ ফেব্রুয়ারি/২০২০)।

সরকারের বাড়তি এই ঋণ পরিশোধে সাধারণ জনগণের উপর মাথা পিছু এ বছর করের বোঝা চেপেছে ৮৫ হাজার টকা। অন্যের অনিয়মের দায় সাধারণ জনতার ঘাড়ে যাতে না পড়ে সে জন্য সরকারকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইনের শাসনের বাস্তবায়ন, সরকারি চাকুরেদের জন্য চাকরিবিধি কার্যকর করাসহ দায়িত্ব প্রাপ্তদের আইনের মুখোমুখি করা জরুরি।

লেখক: অধ্যক্ষ ও সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, (কেন্দ্রীয় কমিটি)।


poisha bazar

ads
ads