স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর: বাস্তবতার মুখোমুখি

সুতপা বেদজ্ঞ
সুতপা বেদজ্ঞ - ছবি : সংগৃহীত

  • সুতপা বেদজ্ঞ
  • ২৫ আগস্ট ২০২১, ১০:০২,  আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২১, ১০:০৫

বাংলাদেশের মানুষের একটা বিরাট অংশের মধ্যে দেশ, দেশের সম্পদ, দেশের মানুষ, দেশের পরিবেশ প্রতিবেশ, কর্মসংস্থানসহ প্রায় প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে বিশেষ উদাসীনতা বা সকল অন্যায় সহ্য করার নেতিবাচক প্রবণতা স্বাধীনতার পর থেকেই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, এদেশের শিক্ষা, রাজনীতি এমনকি স্বাস্থ্য খাত চরম উপেক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষিত-সচেতন সাধারণ মানুষকে মুখে রা পর্যন্ত করতে দেখা যায় না।

আদিবাসী-সংখ্যালঘুুদের ওপর বারবার আক্রমণ শিক্ষিত সমাজের চেতনা জগতে নাড়া দেয় না বললেই চলে। নারীর প্রতি কোনো অন্যায়-অবিচার ঘটলে গুটিকয় মানুষকেই প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাবার সংবাদে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় না।

এমনকি কাজের সন্ধানে হাজার হাজার যুবক সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মারা যাওয়ার সংবাদে বা সড়কে নিয়মিত শত শত তাজাপ্রাণ ঝরে যাওয়ার খবর শুনলে বড়জোর উঃ আঃ ছাড়া কোনো সক্রিয়তা চোখে পড়ে না। এই সুযোগে সরকারি-বেসরকারি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি-লুটপাট এখন বৈধতা পেয়েছে, অন্যায়-অনাচার সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে, অনৈতিক পথে উপার্জনকে সমাজ অন্যায় কাজ বলে ভাবতেই ভুলে গেছে।

কারণ হিসেবে অনেকেই সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকা, জবাবদিহিতার অভাব এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতিকে দায়ী করে থাকেন। কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু শুধুমাত্র এজন্য সাধারণ জনগণের ক্রমাগত অন্যায় সহ্য করার প্রবণতা সমাজে শিকড় গেড়েছে এ কথাও পুরোপুরি মেনে নেয়া যায় না।

রাজনীতি মানুষের অর্থনীতি-সংস্কৃতি পরিচালনায় বিরাট ভ‚মিকা রাখে একথা ঠিক। কিন্তু দায়িত্বশীল সচেতন সৎ মানুষ যদি রাজনীতির প্রতি আগ্রহ না দেখায়, ক্রমাগত নিজের স্বার্থচিন্তার আবর্তে ঘুরপাক খাওয়ার প্রবণতা বিকাশ লাভ, সর্বোপরি সবসময় ঝুঁকি এড়িয়ে গা বাঁচিয়ে চলার নীতি গ্রহণ করে- সে দায় নিশ্চয়ই রাজনীতির ওপর চাপানো যায় না।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এত এত রক্তক্ষয় হলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে দেশের মানুষ মনোযোগী হবে এই প্রবণতা স্বাভাবিক ছিল। যুদ্ধে কেউ সন্তান হারিয়েছে, কেউ স্বামী, কেউবা পিতা-মাতা। অনেকের বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়েছে। শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে লাখ লাখ মা-বোনের ওপর দিয়ে যে অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন ঘটে গেছে তা তো ভুলে যাবার নয়।

এ রকম একটি বাস্তবতায় একে অপরের কষ্ট ভাগাভাগি করে নেবে, পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ-সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে সেটাই স্বাভাবিক ছিল। ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং একই ভ‚খণ্ডের অধিবাসী, একই জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা নাগরিকদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ বিকশিত হয়ে একটি মহান মানবিক রাষ্ট্র গঠিত হবে। শহীদদের আত্মদান সার্থক হবে এটাই ছিল প্রত্যাশা।

সকল প্রত্যাশা উপেক্ষা করে স্বাধীনতার পর পরই দেখা গেল রিলিফ কার্যক্রমে দুর্নীতি। দেখা গেল মানুষে মানুষে বৈষম্য ঘোচাবার বদলে নব্য ধনীশ্রেণির সংখ্যা বাড়তে লাগল। অবিভক্ত ভারতে স্বদেশী আন্দোলনের কথা সবারই জানা। সে আন্দোলনে বর্তমান বাংলাদেশ অংশের শিক্ষিত-সচেতন মানুষ অংশ নিয়েছিল। বিদেশি পণ্য বর্জন করেছিল।

সেই মানুষদেরই স্বাধীন বাংলাদেশে নিজের দেশের পণ্য বর্জনের প্রবণতা লক্ষ করার মতো। আশির দশকে আমরা যখন বেড়ে উঠেছি তখন দেখেছি নারীরা ভারতীয় শাড়ি পাবার জন্য আকুল হতেন। পুরুষেরা জাপান, থাইল্যান্ড বা আমেরিকান পোশাক। প্রসাধনীর ক্ষেত্রে বিশেষ পছন্দের ছিল ভারত, আমেরিকা। একথা ঠিক সদ্য স্বাধীন দেশ ছিল আমদানিনির্ভর।

যখন এদেশে মানসম্মত পণ্য উৎপাদন শুরু হলো তখনো মানুষের বিদেশনির্ভর প্রবণতার ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি দেখা গেল না। মানুষের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে বাজার ব্যবস্থা। এই প্রবণতার ফলে মানুষের চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে ব্যবসায়ীরা অসাধু পথে হাঁটতে শুরু করেন। নিজের দেশের পণ্য কখনো ভিন্ন দেশি লেবেল দিয়ে কখনোবা অসত্য কথা বলে বিক্রয়ের পথ বেছে নেন। এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির কল্যাণে এই ধারা আরো বিকাশ লাভ করেছে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় এদেশে কর্মসংস্থান সীমিত একথা ঠিক। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে রাষ্ট্রীয় প্রায় সকল কল-কারখানা বন্ধ বা বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছে এ কথাও ঠিক। নিজের দেশের সরকারি খাতের শিল্প বিকাশে বাধা কোথায় বা কিভাবে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে- সে সকল বিষয়ে কোনো আগ্রহ সাধারণের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না।

বরং কোনো রকম দক্ষতা অর্জন না করে এদেশের তরুণদের একটি বিরাট অংশের প্রবণতা হলো বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন করা। যে যুবক বা তার পরিবার দেশের মধ্যে পেশা গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্মান-অসম্মান খুঁজে বেড়ায় সেই মানুষেরাই বিদেশে গিয়ে যে কোনো অড জবের (হোটেলে থালা পরিষ্কার করা, ড্রেন সাফাই, ময়লা কুড়ানো) ক্ষেত্রে কোনো অসম্মান বোধ করে না।

একঘরে গাদাগাদি করে মানবেতর জীবন-যাপনের মধ্যেই তারা বিরাট সফলতা খুঁজে পায়। এই প্রবণতার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যসহ উন্নতদেশসমূহ সস্তায় শ্রমিক পেতে এদেশের শ্রমজীবীদের খুঁজে নেয়। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এদেশের মানুষের বিশেষ প্রবণতা নিজের দেশের সমস্যার চেয়ে আন্তর্জাতিক সমস্যা সম্পর্কে জানা-বোঝা এবং একাত্ম হওয়া।

দেশের ছেলেমেয়েরা খেলাধুলার জন্য যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে কি-না, তাদের মনোবিকাশের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে কি-না, মাদক বা মিডিয়া শিশুদের মনোজগতকে কিভাবে তৈরি করছে তার চেয়ে বেশি আগ্রহদেখা যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ইস্যুতে নিজেদের মধ্যে বিভাজন করে রক্তক্ষয় করতে।

ইউরোপের বনে আগুন লাগলে এদেশের মানুষকে যতটা উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায় তার এক শতাংশ উদ্বিগ্নতাও দেখা যায় না যখন সেজান জুস কারখানায় প্রায় অর্ধশত শিশু আগুনে পুড়ে লাশ হয় অথবা তাজরীন ফ্যাশন ধসে গিয়ে হাজার শ্রমিক লাশ হয় অথবা প্রতিবছর কোনো না কোনো বস্তিতে আগুন লাগে বা আগুন লাগিয়ে ভিটেমাটি-সহায়-সম্বলহীন মানুষদের নিঃস্ব করে দেয়া হয় অথবা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করে সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন চলে।

আফগানিস্তানে তালেবানরা প্রায় দু’ যুগ পরে ক্ষমতা দখল করেছে। তালেবানি মতাদর্শ নারী প্রশ্নে প্রতিক্রিয়াশীল বিধায় সে দেশের মেয়েদের পরিণতির কথা ভেবে আমাদের দেশের মানুষেরা ভীষণ চিন্তিত। অন্যদিকে দেশে যখন পরীমণিসহ মেয়েদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়মিত ঘটে চলেছে তখন এই মানুষদেরই কোনো উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না।

পরীমণিদের বুকফাটা আর্তনাদ তাদের কানে পৌঁছায় না। মাদক আইনে তিন তিনবার যখন পরীমণিকে রিমান্ডে নেয়া হয় তা নিয়েও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। এদেশের নারীরা যখন গৃহপরিচারিকা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যায় এবং দাসের মতো জীবনযাপনে বাধ্য হয় তখনো এটি আলোচনার জন্য গুরুত্ব বহন করে না। ভারতীয় যে সকল টিভি চ্যানেল নাটক- সিনেমায় প্রতিনিয়ত সংসারের কুটিলতা সামনে নিয়ে আসে সে সব দেখতে যত আগ্রহ দেশের শিল্পী-কলাকুশলীদের তৈরি সুস্থ বিনোদন বা নাটক দেখতে ততটাই অনাগ্রহ লক্ষ করা যায়।

ধর্ম অবমাননার নামে বিদেশি লেখক সালমান রুশদির ফাঁসি চেয়ে লাখো লোকের মিছিল হয় এই দেশে। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানের ওপর হামলার শুধু প্রতিবাদ করা হয় না, প্রায় সাত লাখ ভিনদেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে জাতি হিসেবে গর্বিত হয় এই দেশ। অথচ নিজের দেশে যখন বৌদ্ধ মন্দির গুঁড়িয়ে দেয়া হয়, পাবনায়, সুনামগঞ্জের শাল্লায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়, কিছু দিন পর পর সংখ্যালঘু আদিবাসীদের ওপর হামলা হয়, তাদের বসতি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, খুলনার শিয়ালীতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ ধর্মীয় উপাসনালয় ভেঙে দেয়া হয় তখনও এমনকি স্ব স্ব সম্প্রদায়ের শিক্ষিত সচেতন মানুষদের একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস দেখাতে দেখা যায় না।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব পালনে নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করতে হয়, সাধারণ মানুষ পাড়ায় পাড়ায় উৎসব উদ্যাপনের দায়িত্ব নিতে পারে না। ফেসবুকে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্যের বিরুদ্ধে লেখার অভিযোগে ঝুমন দাস মাসের পর মাস জেল খাটলেও অন্যায় এর প্রতিবাদ হতে দেখা যায় ছিটেফোঁটা এবং তা সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এই প্রবণতার রেশ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আরো ফুলে-ফলে বিকশিত হয়েছে। দেশে এখন নিয়মিত প্রবণতা হলো নির্বাচন এলে হিন্দুদের মন্দির ঘর-বাড়ি ভাঙা। কথায় কথায় ধর্ম অবমাননার বানোয়াট ধুয়ো তুলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো। আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন, তাদের বসতি থেকে উচ্ছেদ এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

একটি নেতিবাচক প্রবণতা রুখতে না পারলে তা নতুন নতুন প্রবণতার জন্ম দেয়। আজকের বাংলাদেশ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখানে যাদের কিছুটা সামর্থ্য আছে তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই প্রবণতা দেশের বাইরে বসতি স্থাপন। এখনকার শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদেও সাধারণ প্রবণতা এদেশে তারা ক্যারিয়ার গড়তে চায় না।

ভয়ংকর এই প্রবণতা রুখতে না পারলে আগামী ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এদেশে শিক্ষিত-সচেতন ও নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের একসাথে বসবাসের ঐতিহ্য যে হারিয়ে যাবে তা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। জাতি হিসেবে আমাদের গৌরব করার অনেক কিছুই আছে। সবচেয়ে বড় গৌরবের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত অসাম্প্রদায়িক ভূখণ্ডের পরিচয়।

আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য। শুধুমাত্র নেতিবাচক প্রবণতার জন্য তা শেষ হয়ে যেতে পারে না। লাখো শহীদের রক্তে জন্ম নেয়া এই দেশের স্বার্থে আগামী ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি রক্ষা করার স্বার্থেই সকল অশুভ প্রবণতা ঝেড়ে ফেলা দরকার। সমাজের একঝাঁক সচেতন-শিক্ষিত-প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানুষের সচেতন সক্রিয় উদ্বোধনই কেবল এই প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

লেখক: নারী মুক্তি আন্দোলনের নেত্রী।


poisha bazar

ads
ads