শেয়ারবাজারে বাজেটোত্তর বিনিয়োগ ভাবনা

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম - সংগৃহীত।

  • মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
  • ২৭ জুলাই ২০২১, ১৫:১৫

মাহাবুব সাহেব প্রতিদিনই হাউসে যান। এটি তার অভ্যাস। দুপুরবেলা বেয়ারা রহমানের এক কাপ চা আর বিস্কুট মাঝে মাঝে শিঙ্গারা, ছমুচা, কেকও থাকে। আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে সময় কাটাতে তার ভালোই লাগে। মনে মনে ভাবে ২০১০ সালের কথা। বাজার কতটা চাঙা ছিল। আজ এ শেয়ার তো কাল আর এক শেয়ার কিনেছেন-দাম বেড়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ।

বিক্রি করেছেন, প্রচুর লাভ করেছেন। কিন্তু সময়মতো বাজার থেকে বের হতে পারেননি। তাই লাভের টাকা ধরে রাখতে পারেননি। যা-ই হোক, শেয়ারবাজারে সেই ব্যবসা এখন আর নেই। গত দশ-এগারো বছর বাজার একেবারে নিস্তেজ, নিষ্প্রাণ। মাহাবুব সাহেব জানেন, এটাকে বলা হয় বিয়ারিশ মার্কেট।

তবে তার মতে, বাজারের এই আচরণকে ভাল্লুকের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না, এটি কচ্ছপের মতো ধীরলয়ে চলছে, কিছুটা শম্বুক গতিও বলা চলে। বর্তমান বাজার তার কাছে বানরের সেই তৈলাক্ত বাঁশে ওঠা গল্পের মতো। ব্যবসা করা কঠিন, সূচক একদিন বাড়ে তো তিনদিন পড়ে। মাঝে মাঝে সিদ্ধান্ত নেন শেয়ার ব্যবসা ছেড়ে দিবেন।

তবে ভালো করে খোঁজ-খবর নিয়ে দু-একটা আইটেম কিনে পিছনের লোকসানটা পুশিয়ে নেন। তাই হাউসে আসেন, খোঁজ-খবর রাখেন। যোগাযোগটা ভালো রাখেন বেয়ারা রহমানের সঙ্গে। এর আগে যত নিউজ রহমানের মাধ্যমেই পেতেন, তথাকথিত দরবেশ, আউলিয়াদের সঙ্গে ওর যোগাযোগটা খুব ভালো। ইতোমধ্যে বাজেট পাস হলো।

পাস হওয়া অর্থবিলে-শেয়ারবাজারে প্রশ্নাতীতভাবে কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগই শেষ পর্যন্ত রাখা হলো। এত দিন ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করা গেলেও তা বাড়িয়ে এখন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ার, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটসহ বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্টে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ কর করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ওই করের ওপর বাড়তি ৫ শতাংশ জরিমানাও গুনতে হবে।

এই জরিমানার বিধান আগে ছিল না। ২৫ শতাংশ কর ও করের ওপর ৫ শতাংশ জরিমানা দিলে সব মিলিয়ে কর দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। আবার কালো টাকায় কেনা শেয়ার এক বছরের মধ্যে বিক্রি হলে সে ক্ষেত্রে জরিমানা দিতে হবে ১০ শতাংশ হারে। তবে বরাবরের মতো এবারও কালো টাকা সাদা করলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ছাড়া অন্য কোনো সংস্থা এ নিয়ে প্রশ্ন করবে না।

মাহাবুুব সাহেব ভেবে দেখলেন কেউ প্রশ্ন করুক বা না করুক-জরিমানার পরিমাণের দিক থেকে সুযোগটি আগের চেয়ে কঠিন হয়েছে। এই শর্তাদি মেনে কালো টাকার মালিকেরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবে কিনা সেটি ভেবে দেখার বিষয়। আমাদের দেশে কালো টাকার মালিকেরা বিনিয়োগের চেয়ে টাকা পাচারই বেশি নিরাপদ মনে করেন।

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান এমনই বলছে। তাই মাহাবুব সাহেব নতুন করে তার সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে কিছুটা সরে আসলেন। মাথা থেকে কালো টাকার অলীক চিন্তা ঝেড়ে ফেলে, নতুন করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু এর মধ্যে তিনি পত্রিকান্তরে জানতে পারলেন। ভারতের শেয়ারবাজারের সূচক বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (এনএসই) ব্লুচিপ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের সূচক নিফতি ৫০, ১৫ জুন মঙ্গলবার ১৫ হাজার ৯০১ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। এছাড়া বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) এসঅ্যান্ডপি সেনসেক্স সূচক বৃদ্ধি পেয়ে ৫২ হাজার ৮৬৯ পয়েন্ট অতিক্রম করেছে। দুটো সূচকই এযাবতকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। অথচ দেশটি বিশ্বে করোনায় আক্রান্তে শীর্ষ দ্বিতীয় অবস্থানে।

শুধু এই করোনাকালীনই নয়, ১৯৯১-এরপর আর্থিক প্রবৃদ্ধির গতি গত কয়েক বছর ধরেই সবচেয়ে ধীর বা তলানিতে। গত পাঁচ দশকের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি-ফলে বেড়েছে দারিদ্র্য। এক কথায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত। কিন্তু এর মধ্যেও শেয়ারবাজারের গতি ঊর্ধ্বমুখী। যা এই করোনাকালীন ভঙ্গুর অর্থনীতিতে জনসাধারণের প্রত্যাশার বাইরে। তবে কেন ভারতের শেয়ারবাজারের এই উল্লম্ফন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী এখন ধনসম্পদের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা চলছে। ভারতও ওই ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে। তারল্য তথা নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার শুরু হবে এমন আশাবাদ দেখা দেয়াতেই মূলত এমনটা ঘটছে। মাহাবুব সাহেবের মনে প্রশ্ন-বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার নিরিখে আমরা ভারতের চেয়ে এগিয়ে।

বিশেষ করে জাতীয় মাথাপিছু আয় যা এখন বাংলাদেশের ২ হাজার ২২৭ ডলার, রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পেছনেই রয়েছে বাংলাদেশ। আর বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৪ তম। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে পণ্য রফতানি আয়ও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

গত অর্থবছরে ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলারের রফতানি হয়েছে। এই আয় ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। করোনার আগে গত এক দশক ধরে ব্যাপক দারিদ্র্যহ্রাস, সর্বোপরি বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের পথে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথা সরকারি তথ্য নিঃসন্দেহে আগের মতো এখন আর জনমনে গ্রহণযোগ্য নয়।

দেখা যাক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কি বলছে, বিদায়ী ও চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে বাংলাদেশ।

আর চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। গত ৬ এপ্রিল আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, চলতি ২০২১ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন ৫ শতাংশ ও ২০২২ সালে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে। অন্যদিকে জাতিসংঘের এসকাপ তাদের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

এভাবে যেখানে বড় বড় দাতা সংস্থা বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে চলছে। সেখানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার হতাশায় খাবি খাচ্ছে। মাহাবুব সাহেব খুব বিস্মিত হলেন। তাই তিনি ভারত ও বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুঁজতে থাকলেন। ভয়াবহ বিপর্যস্ত অর্থনীতির মধ্যেও ভারতীয়রা শেয়ারবাজারে তাদের বিনিয়োগকৃত কোম্পানির ওপর ভরসা করতে পারছে।

তাদের প্রত্যাশা তারা যে কোম্পানির অংশীদারিত্ব কিনেছেন তা নিশ্চয়ই দীর্ঘমেয়াদে ভালো করবে। অধিক মুনাফা দিবে। এভাবে সবার প্রত্যাশার প্রতিফলনই শেয়ারবাজারকে ঊর্ধ্বমুখী করেছে। অন্যদিকে মাহাবুব সাহেব বিনিয়োগকৃত কোম্পানির ওপর বিশ্বাস তো দূরের কথা, ইদানীং তিনি যে হাউসে ব্যবসা করেন, সেখানেই হয়তোবা ঝুঁকিতে আছেন বলে তিনি মনে করেন।

কারণ, অতি সম্প্রতি বানকো সিকিউরিটিজ ও এর আগে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ কর্তৃক বিনিয়োগকারীদের টাকা পয়সা তছরুপ। অবশেষে মালিক পক্ষের দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে। এমনিতেই বিনিয়োগকারীরা বড় বড় রাঘব বোয়ালদের কারসাজির অংশ হয়ে আজ গিনিপিগে পরিণত হয়েছেন। মাহাবুব সাহেবের চিন্তার পারদ ঊর্ধ্বমুখী।

কারণ, তারা দায়িত্ব নেয়ার পরই শেয়ারবাজার কিছুটা গতি ফিরে পেয়েছে। দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, লন্ডনভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডন গ্লোবালের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মরিটস পট বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য রয়েছে।

লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছর বাংলাদেশের শেয়ারবাজার থেকে রিটার্ন এসেছে এশিয়ার তুলনায় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন এসেছে ২১ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ বাজারের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

ফলে বাজারের গভীরতা বাড়বে ও লেনদেনে থাকবে চাঙাভাব। মাহাবুব সাহেব কিছুটা আশান্বিত হলেন। তবে ভয়ও পাচ্ছেন। কারন,গত জুন মাসে দেশের শেয়ারবাজারে রেকর্ড লেনদেন হয়েছে যা ৪৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে। জুন মাসে লেনদেন হওয়া ২২ দিনের মধ্যে ১২ দিনই দুই হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছে। আর প্রতি কার্য দিবসে গড় লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা।

এর আগে ২০১০ সালের জুন মাসে লেনদেন হয় ৩৮ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। কমিশনের চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম তো বারবার বলেই আসছেন। আমাদের শেয়ারবাজারে কিছু দিনের মধ্যে লেনদেন ছাড়াবে ৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে। লেনদেন যদি একটি বাজারের মুখ্য বিষয় হয়।

তাহলে ভেবে দেখার বিষয় হলো-কোথায় কোন খাতে লেনদেন হচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু দুর্বল, রুগণ মৌলভিত্তি সম্পন্ন খাত-বীমা, বস্ত্র অথবা কোনো গ্রুপের নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির শেয়ার এমনকি সদ্য ওটিসি মার্কেট থেকে ফেরা বন্ধ, দুর্বল কোম্পানির শেয়ার বছরব্যাপী লেনদেনের ও দর বাড়ার শীর্ষে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো ভাবেই কারসাজির অংশ ছাড়া কিছু নয়।

কমিশনের এ বিষয়ে আরও তৎপর হতে হবে। খতিয়ে দেখতে হবে-কোথায় কারসাজি হচ্ছে। লেনদেন বা বিনিয়োগ হচ্ছে ঠিকই-তবে তা গুণগত মানের হচ্ছে কি? ভালো মানের শেয়ারে লেনদেন না হলে এই লেনদেন বা সূচকের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ভালো মৌলভিত্তি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেই।

আগ্রহের শীর্ষে রয়েছে ওই সমস্ত ছোট মূলধনী কোম্পানির জাঙ্ক শেয়ারে। যা সবসময়ই মাহাবুব সাহেবদের কাছে আকর্ষণীয়, বিশেষজ্ঞ বা প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ এবং বছর শেষে লোকসান গুনতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।


poisha bazar

ads
ads