আমলাতন্ত্রের যাঁতাকলে রাজনীতি, দায়টা কার?

সুজাত মনসুর
সুজাত মনসুর - ছবি : সংগৃহীত

  • সুজাত মনসুর
  • ২১ জুলাই ২০২১, ১০:৪৯

আশির দশকের মাঝামাঝি আমাকে একবার সচিবালয়ে যেতে হয়েছিল কোনো ব্যক্তিগত কারণে নয়, আমাদের এলাকার জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে চিঠি নিয়ে ঢাকায় গিয়ে জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের সাথে দেখা করি। সামাদ সাহেব চিঠি পড়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব আসাদুজ্জামান সাহেবকে ফোনে বিস্তারিত খুলে বললেন এবং আমাকে সচিবালয়ে পাঠান।

পাস রেডি ছিল, সুতরাং সচিবালয়ে ঢুকতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। আসাদুজ্জামান সাহেব আমাকে বসিয়ে ফাইল আনালেন এবং কাজটি করে দিলেন। এটাই ছিল সচিবালয়ে আমার প্রথম ও শেষ যাওয়া। এমনকি ছাত্রলীগের জেলা নেতৃত্বে থাকাকালীনও কোনো অফিসে যাইনি বা কাউকে ফোন করিনি তদ্বির করার জন্য।

এখন কোনো মন্ত্রী, এমপি কিংবা কোনো নেতাকে অনুরোধ করি না কোনোকিছুর জন্য। ঘটনাটি উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিত্ব, সততা, নৈতিক ও আদর্শিক বল খুবই প্রবল ছিল এবং আমলারা তা সমীহ করে চলত তা বুঝানোর জন্য।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ এমপি বয়োজ্যেষ্ঠদের অন্যতম রাজনীতিবিদ যিনি ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছেন। জীবনে একটা ভুল করার কারণে রাজনীতিতে অনেকটাই সাইড লাইনে আছেন, যা দেশ ও জাতির জন্য মোটেই সুখকর নয়।

চলমান পচনশীল রাজনৈতিক পরিবেশে কিছুটা হলেও সুবাতাস বইয়ে দিতে পারতেন তোফায়েল আহমেদের মতো শুদ্ধ রাজনৈতিক চরিত্রের অধিকারীরা। কিন্তু বিশ্বাস ও আস্থা একবার হারিয়ে ফেললে আর ফিরে পাওয়া যায় না। ফলে তিনি আজ দলের নীতি নির্ধারণী ফোরামের বাইরে অবস্থান করছেন।

নীতি নির্ধারণী ফোরামে কথা বলতে না পারার কারণেই হয়তো জাতীয় সংসদে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও উষ্মার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যে আমলাতন্ত্র রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের গিলতে বসেছে।

২৮ জুন বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তোফায়েল আহমেদ রাজনীতিবিদ ওপর আমলাদের খবরদারি কিংবা প্রাধান্য নিয়ে ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি কাজী ফিরোজ রশীদ এমপিও আমলাদের এক হাত নিয়েছেন। বিশেষ করে করোনাকালে সকল প্রকার কাজ সমন্বয় ও সম্পাদনের জন্য সচিব ও ডিসিদের দায়িত্ব দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

তাঁর মতে, এর মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের অবমূল্যায়ন ও তাঁদের ওপর আমলাদের খবরদারি করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তোফায়েল আহমেদের অভিযোগ প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই বলা যায়। কেননা, সচিব ও ডিসিদের দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্তটি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই নিয়েছেন। রাজনীতিবিদ বলতে আমার ধারণা তোফায়েল আহমেদ জনপ্রতিনিধিদের কথাই বলেছেন।

তাঁর অভিযোগ হচ্ছে, জনপ্রতিনিধিরা নিজস্ব উদ্যোগে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি নিজেও করেছেন। অথচ তাঁদের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে দেয়া ত্রাণসামগ্রীও সচিব ডিসিদের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে বলে জনগণ মনে করে। কিন্তু সচিব বা ডিসিরা অনেক এলাকায় এখনো যাননি। তাঁর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব এখনো সেখানে যাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

তিনি ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্ট’-এর কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সচিবরা হলেন পদমর্যাদার দিক থেকে এমপিদের নিচে। কাজী ফিরোজ রশীদ ও অন্যদের বক্তব্যের মর্মার্থও একই। তাদের মূল কথা হলোÑ রাজনীতি এখন আর রাজনীতিকদের হাতে নেই। আওয়ামী লীগ কৌশলে বিরাজনীতিকরণ করছে।

সরকারে তিনটি যে তিনটি অঙ্গ দেশ পরিচালনা করে তার মধ্যে প্রশাসন একটি, যাকে আমলাতন্ত্র বলা হয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই প্রশাসনিক কাজগুলো আমলারা করেন। জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ কর্মপন্থা ঠিক করে দেন আর আমলারা বাস্তবায়ন করেন। বাংলাদেশে আমলারা তাদের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও রাজনীতিবিদদের ওপর খবরদারি করার অভিযোগ রয়েছে।

আর তা যে করেন না তা বলা যাবে না। তবে এই খবরদারি করার সুযোগটাও করে দিয়েছেন রাজনীতিবিদরা। পাকিস্তানি শাসনামল বাদ দিয়ে বাংলাদেশের গত পঞ্চাশ বছরও যদি হিসেবে নেই তাহলে যে চিত্র ফুটে ওঠে তাহলো ক্রমান্বয়ে রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়া অর্থাৎ সকল প্রকার অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়া বিশেষ করে সরকারি দলের।

সময়ে সময়ে ক্ষমতার পালাবদলে অনৈতিক কাজের প্রতিযোগিতায় এক দল পিছিয়ে পড়ে, আরেকদল এগিয়ে যায়। আবার কখনো কখনো বিরোধী দলের নেতা হয়েও সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নেয়। বর্তমানে এ প্রবণতা মহামারী আকার ধারণ করেছে। এইসব অনৈতিক কাজে রাজনীতিবিদরা ব্যবহার করেন আমলাদের।

আমলারা তাই রাজনীতিবিদদের এই দুর্বলতার সুযোগ নেয়। আগের রাজনীতিবিদরা অনৈতিক কাজ করলেও এক ধরনের ব্যক্তিত্ব ও গাম্ভীর্য বজায় রাখতেন। ফলে আমলারা সমীহ করে চলতেন। কিন্তু বর্তমানের চিত্র বহুলাংশে ভিন্ন। আগে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন থাকলেও ব্যতিক্রমও ছিল। পচনশীলতার মাত্রা কম ছিল।

বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির দায়ে প্রায় চল্লিশজন সাংসদকে সংসদ ও দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। এখন যদি বঙ্গবন্ধু কন্যা পিতার পথ অনুসরণ করে এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যান তাহলে দেখা যাবে বহিষ্কৃতরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর সারাদেশে যদি একসাথে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেন তাহলে কমিটি করার লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

রাজনীতিতে আমলাদের আধিপত্য ও দুর্বৃত্তায়নের ক্রমবিকাশের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত আলোচনার অবকাশ সংক্ষিপ্ত পরিসরে নেই। সুতরাং করোনাকালে সচিব ও ডিসিদের দায়িত্ব দেয়া কতটুকু যৌক্তিক ও অপরিহার্য এবং সাংবিধানিকভাবে সঠিক কি না তা আলোচনা করা যেতে পারে।

আমি মনে করি নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ যে বলেছেন, সচিবদের দায়িত্ব দেয়া ছিল যুগান্তকারী, তা সঠিক। কেননা, প্রথমদিকে যখন ত্রাণ বিতরণ শুরু হয় তাখন প্রায় প্রতিদিনই ত্রাণসামগ্রীসহ গ্রেফতারের খবর পত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছিল। গ্রেফতারকৃতদের প্রায় সবাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ডিলার যারা সরকারি দলের সাথে সম্পর্কিত। সাংসদ-মন্ত্রীদের পোষ্য।

প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি বার বার সতর্ক করা সত্তে¡ও কেউ আমলে নিচ্ছিল না। এছাড়া জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতারা যখন ত্রাণ বিতরণ করেন তখন কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ও মাস্ক পরিধান করা হচ্ছিল না ঠিক মত। তাই প্রধানমন্ত্রী বাধ্য হয়ে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দিয়ে সচিব ও ডিসিদের দায়িত্ব দিয়েছেন।

ফলে ত্রাণ তৎপরতা কিছু কিছু ব্যাত্যয় ছাড়া ভালোভাবেই সম্পাদিত হয়েছে ও হচ্ছে। এরপর থেকে আর পত্রিকা পাতা কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পর্দায় ত্রাণসামগ্রীসহ জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীর গ্রেফতারের খবর সচরাচর দেখা যায় না। রাজনীতিবিদরাও অন্তত করোনাকালীন দুর্নীতির দায় থেকে রক্ষা পেলেন।

সচিবরা এলাকায় যান না এবং এমপিদের দেয়া সহায়তাও সচিবরা দিচ্ছেন বলেও তিনি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। এলাকায় না গিয়ে করোনাকালীন মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যবিধির একটা অন্যতম শর্ত। সচিবরা তা মেনে হয়তো অথবা ঢাকায় বসেও তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন বলেই হয়তো এলাকায় যাননি।

এখন তো ভার্চুয়ালিই অনেককিছু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই গণভবনে বসে ভার্চুয়ালি সব কাজ করছেন। এতে উস্মা প্রকাশের কি আছে, সচিবের দোষই বা কোথায়? বহু জনপ্রতিনিধি আছেন যারা করোনাকালীন সময়ে এলাকায় তেমন যাননি। আর কে ত্রাণ দিল সেটা বড় কথা নয়, মানুষ ত্রাণ পেল কি না সেটাই বড় কথা।

আরেকটি কথা, অতীতে বিরোধী দলগুলো ত্রাণ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দলীয়করণের অভিযোগ করতো। কিন্তু এবার দুই/ একবার বলার চেষ্টা করলেও জনগণ আমলে নেয়নি এবং ঢালাওভাবে দলীয়করণের অভিযোগ করার সুযোগ নেই। সুতরাং সমালোচনা নয় বরং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত অন্তত করোনাকালীন সময়ে রাজনীতিবিদ বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিদের গায়ে ঢালাওভাবে ত্রান আত্মসাৎ ও দুর্নীতির তকমা লাগতে দেননি।

ত্রাণ বিতরণ ও প্রণোদনার টাকা মোটামুটি সুচারুভাবে বন্টন সম্পাদন সম্ভব হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোন থেকে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক ও যথার্থ বলা যায়। তবে অনিয়মের অভিযোগ যে একেবারে নেই তা বলা যাবে না। কাজী ফিরোজ রশীদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে উনাকে প্রশ্ন করতে চাই, উনি যে দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং যে সরকারের মন্ত্রী ছিলেন সেই দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সরকারপ্রধান কি রাজনীতিবিদ ছিলেন? নাকি সামরিক শাসক ছিলেন?

রাজনীতিতে সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের অংশ নেয়ার সুযোগ ও পুনর্বাসন কারা করেছে? ব্যক্তি হিসেবে সাবেক প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। আর দল হিসেবে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। রাজনীতিকে বাণিজ্যিকিকরণও করেছে ঐ দুই দল। কিন্তু কিছু কিছু রাজনীতিবিদ, সুশীল কলামিস্ট এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এসব কিছুর জন্য শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে দায়ী করতে চান।

ভাবখানা এই গত এক যুগে বিশেষ করে ২০১৮-এর নির্বাচনই সবকিছুর জন্য দায়ী। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে শেখ হাসিনা এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে গিয়েও পারছেন না দলের জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের অসহযোগিতার কারনে। যে কথা বলে লেখাটি শেষ করতে চাই, তাহলো রাজনীতিবিদদের ওপর আমলাদের আধিপত্য বিস্তার বলেন আর রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে নেই বলে যতই উষ্মা প্রকাশ বা অভিযোগ করি না কেন, সে দায় কিন্তু রাজনীতিবিদদেরই।

সুতরাং এর থেকে বের হয়ে আসতে হবে কিংবা পুনরায় রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের হাতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদেরই নিতে হবে। সেজন্য সবকিছুর আগে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি। লোভ লালসা, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা, নেতাকর্মীদের মুক্ত রাখা, রাজনীতিকে ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করে নির্বাচনে জেতার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ না করা।

পেশিশক্তি ও প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্বাচনী বৈতরণী পাড় না হয়ে জনগণের ভালোবাসা ও ম্যান্ডেড নিয়ে জিতে আসা। আমলাদের দিয়ে কোন ধরনের অনৈতিক ও অবৈধ কাজ করিয়ে না নেয়া। জানি এগুলো অরণ্যে রোদন। নয় মণ তেলও হবে না, রাধাও নাচবে না। রাজনীতিবিদরা কখনোই শুদ্ধ হবেন না। আমলাতন্ত্রের কবল থেকে রাজনীতিও মুক্তি পাবে না।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।



poisha bazar

ads
ads