ত্যাগ তিতিক্ষা ও উৎসর্গের উৎসব-ঈদুল আজহা


  • আফতাব চৌধুরী
  • ২০ জুলাই ২০২১, ০৯:৩৮

ঈদুল আজহা। সমগ্র বিশ্বে পালিত হচ্ছে কোরবানির ঈদ। ত্যাগ, তিতিক্ষা ও আবেগের উৎসব। ‘ঈদ’ শব্দটি ‘আওদ’ থেকে উদ্ভ‚ত। এর অর্থ ফিরে আসা পুনঃপুনঃ আসা। ঈদের দিন অন্তত পুণ্যময়। এ দিনের ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই বিশেষ দিন মুসলমানদের জীবনে বছরে দু’বার ফিরে আসে। এর একটি হলো ঈদুল ফিতর অন্যটি ঈদুল আজহা।

ঈদুল আজহা শব্দগুলো আরবি। বিশ্বের মুসলমানরা ত্যাগের নিদর্শনস্বরূপ জিলহজ মাসের ঐতিহাসিক ১০ তারিখ মহাসমারোহে পশু জবেহের মাধ্যমে কোরবানির যে আনন্দ উৎসব পালন করে থাকেন তাই ঈদুল আজহা। বস্তুত হজরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালন করতে প্রাণপ্রিয় একমাত্র পুত্র হজরত ইসমাইল (আঃ)-কে কোরবানি করার মতো যে ঐতিহাসিক নজির স্থাপন গেছেন সে সুন্নত পালনে মুসলিম জাতি আজও কোরবানি করে থাকেন। এ মাসে বিশ্ব মুসলিম পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে গিয়ে ছোট-বড়, ধনী, নির্ধন- সবাই দুই রাকাত ঈদুল আজহার ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন।

‘ঈদুল আজহা’ বা কোরবানির তাৎপর্য কী? কেন এ কোরবানি। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কেন গুরুত্ব সহকারে পালন করে আসছেন এ উৎসব? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের ফিরে যেতে হবে হাজার বছর আগের এক ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে। হজরত ইব্রাহিম (আঃ) ছিলেন খুবই সহজ, সরল ও সাচ্ছা মানুষ।

প্রচলিত কোরবানি মূলত হজরত ইব্রাহিমের এক অপূর্ব আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবহ। তিনি অহঙ্কার ও ঐশ্বর্যের জীবনযাপনে মোটেই উৎসাহী ছিলেন না। ন্যায়বিচার ও সামাজিক বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমতা রক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন। দেশের স্বৈরাচারী রাজা সমস্ত দেশকে, প্রজাদের জীবনকে রাজশক্তির ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এ সময় বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করে তথা রাজশক্তি স্বীকার করে মানুষ জীবনে পরিত্রাণ খুঁজছেন। কিন্তু ইব্রাহিম মন থেকে এটা মেনে নিতে পারেননি। একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে নিজেকে ঈশ্বররূপে বা সব বিচারের ঊর্ধ্বে বলে দাবি করতে পারেন? তিনি দেখলেন মানুষের জীবন অজ্ঞতা ও অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলেছে। চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটছে না।

এ জগতের সবকিছু সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ এক মহাশক্তি ব্যতীত অন্য কেউ করতে পারে না। একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ইব্রাহিম তখন আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রাতদিন তন্ময় হয়ে থাকতেন। আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ইব্রাহিম জিলহজ মাসের ৮ তারিখের রাতে তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আঃ)-কে কোরবানি করার হুকুম স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত হন। পরদিন তিনি পুত্র ইসমাইলকে ডেকে বললেন, ‘হে বৎস !

আমি স্বপ্নে আদেশ পেয়েছি যে, তোমাকে আমি জবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল? পুত্র ইসমাইল বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনি যে আদেশ পেয়েছেন তা পালন করুন। আমাকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে আপনার পরীক্ষা ও ত্যাগের প্রমাণ দিন, আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ সে যুগে পিতার হাতে আপন পুত্রের এ কোরবানির কথা মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল।

ইব্রাহিম তখন আল্লাহর উদ্দেশে দোয়া জানালেন-‘হে প্রভু, আপনার সন্তুষ্টি লাভে আমার সবচেয়ে প্রিয় পুত্রের জীবন পর্যন্ত কোরবানি করতে প্রস্তুত।’ এরপর নিজ চোখ বেঁধে ইব্রাহিম পুত্র ইসমাইলকে ছুরি দ্বারা কোরবানি দিতে উদ্যত হলেন। কিন্তু আশ্বর্যজনকভাবে পুত্রের স্থলে দুম্বা (ছাগল জাতীয় পশু) কোরবানি হয়ে গেল।

অবাক ইব্রাহিম দেখেন পুত্র ইসমাইল তার পাশে দাঁড়িয়ে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন ইব্রাহিম। অতীতের উৎসর্গের এ স্মৃতিকে আল্লাহর নির্দেশে হযরত মোহাম্মদ (স.) মানুষকে স্মরণীয় রাখার আদেশ দিয়েছেন। এ পশু কোরবানিকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ বলে ভাবেন। তাই ইসলাম ধর্মে ইব্রাহিমের কোরবানির রেওয়াজে আজও পশু কোরবানি দেয়া হয়ে থাকে। মূলত হজরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর পুত্রকে কোরবানি দেয়ার এ অবিস্মরণীয় ঘটনাকে প্রাণবন্ত করে রাখার জন্যই আজও পশু কোরবানি দেয়া হয়।

কোরবানিকে আরবি ভাষায় ‘উজহিয়্যা’ বলা হয়। ‘উজহিয়্যা শব্দের আভিধানিক অর্থ পশু কোরবানির দিন জবেহ করা। শরিয়তের ভাষায়, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করাকে কোরবানি বলা হয়। কোরবানির তাৎপর্য হলো ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রিয়বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য উৎসর্গ করা।

এ ছাড়া হাদিসে প্রত্যেক সামর্থ্য থাকা ব্যক্তিকে কোরবানি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোরবানির সময় জিলহজের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত এ তিন দিনের যে কোনো দিন কোরবানি করা যাবে। তবে প্রথম দিন কোরবানি করা সর্বাপেক্ষা উত্তম। ঈদুল আজহার নামাজের আগে কোরবানি করা যাবে না। নামাজের পরে করতে হবে।

কোরবানির মাংস নিজের পরিবারের সদস্যদের খাওয়া ছাড়াও আত্মীয়স্বজন এবং দরিদ্র লোকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। মাংস তিন ভাগ করে এক ভাগ পরিবার-পরিজনের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনদের জন্য এবং এক ভাগ দরিদ্র লোকদের জন্য দেয়ার বিধান রয়েছে।

ছয় প্রকার পশুকে কোরবানি দেয়া যায়। উট, গরু, ছাগল, দুম্বা, ভেড়া, মহিষ। এসব ছাড়া অন্য পশু কোরবানি করার নিয়ম নেই। কোনো ব্যক্তি যে উদ্দেশ্যে মানত করেন তা পূর্ণ হলে সে গরিব বা ধনী হোক তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। এ ছাড়া যদি পিতার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়, কিন্তু কোনো কারণবশত তিনি কোরবানি না করে মারা যান তবে তার সন্তানরা তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে কোরবানি করবে।

কোনো ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব ছিল, কিন্তু কোরবানির তিনটি দিনই গত হয়ে গেল অথচ সে কোরবানি করল না, এমতাবস্থায় তাকে একটি বকরি কিংবা এর মূল্য ছদকা (দান) করতে হবে। আর যদি গরিব ব্যক্তি কোরবানির পশু ক্রয় করা সত্তে¡ও কোরবানি করতে না পারেন তবে তাকেও এ পশুটি ছদকা করে দিতে হবে। মানতকারীদের ওপরও এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

তা ছাড়া যে ব্যক্তি কোরবানি করবে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর চুল, নখ কাটবে না। আর যার কোরবানি করার সামর্থ্য নেই তার জন্য উত্তম কোরবানির দিন কোরবানির পরিবর্তে চুল, নখ কাটা। ঈদ আসে বিশ্ব মুসলিমের দ্বারপ্রান্তে বার্ষিক আনন্দের বার্তা নিয়ে। আসে সীমাহীন প্রেমপ্রীতি-ভালোবাসা কল্যাণের সংঘাত নিয়ে। ঈদকে যথার্থ মর্যাদায় উদযাপন করা এবং নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।

কোরবানির মাধ্যমে আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তা দুনিয়াকে বেহেস্তের (স্বর্গের) বাগানে পরিণত করে। বর্তমান বিশ্বে যেভাবে ধ্বংসলীলা সংঘটিত হচ্ছে, হত্যাকাণ্ড, অপরাধ, অমানবিক কার্যকলাপ বেড়েই চলেছে এসবের বিরুদ্ধে কোরবানির ত্যাগে, উৎসর্গে বিশ্ব মুসলিমকে এগিয়ে আসতে হবে।

কোরবানির ফজিলত হাসিল করেতে হলে প্রয়োজন আবেগ, অনুভূতি, প্রেম, ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতা। যে আবেগ-অনূভ‚তি প্রেম, ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতা নিয়ে কোরবানি করেছিলেন আল্লাহর খলিল হজরত ইব্রাহিম (আঃ)। কেবল মাংস ও রক্তের নাম কোরবানি নয়। বরং আল্লাহর রাহে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার এক দৃপ্ত শপথের নাম কোরবানি। সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে এক অনুপম দৃষ্টান্ত প্রদর্শনের উৎসব হয়ে উঠুক ঈদুল আজহা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।


poisha bazar

ads
ads