মুনিয়ার মতো কি মামলারও অপমৃত্যু ঘটবে?

রণেশ মৈত্র
রণেশ মৈত্র - ছবি : সংগৃহীত

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৯ জুন ২০২১, ১০:১১

একটি জাতীয় দৈনিকে বিগত ৩০ মে তারিখে ‘মুনিয়ার মৃত্যু : ৩৩ দিন পর জনসমক্ষে আনভীর’ শীর্ষক খবরটির নিচে উল্লেখ করছি নেহায়েত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে রীতিনিষ্ঠতা বজায় রাখার লক্ষ্যে। খবরটিতে বলা হয়েছে: রাজধানীর গুলশানের অভিজাত ফ্ল্যাটে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার (২১) রহস্যজনক মৃত্যুর পর গা-ঢাকা দেন তার প্রেমিক বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোহান আনভীর। দীর্ঘ ৩৩ দিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর হঠাৎ করেই জনসমক্ষে এলেন ঐ মামলার প্রধান আসামি আনভীর।

বিগত ২৯ মে শনিবার কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্নে বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে তাকে দেখা গেল। গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথাও বলেন তিনি। মুনিয়া হত্যার পর দীর্ঘদিনেও বসুন্ধরার এমডিকে গ্রেফতার না করায় ও একটি চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি হয়েও নিরাপদে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার ঘটনায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

এ নিয়ে উদ্বেগ, হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুনিয়ার বড় বোন ও মামলার বাদী নুসরাত জাহান তানিয়া ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কম্যান্ডের সভাপতি মেহেদী হাসান। তারা বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কন্যা মোসারাত জাহান মুনিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে করছি। এ মামলার আসামি ও মুনিয়ার ঘাতক প্রেমিক বসুন্ধরা এমডিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

এমন একজন আসামির প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেআইনি। ফলে জনগণের কাছে এমন বার্তা যাচ্ছে যে ক্ষমতাশালী ও বিত্তবানরা যেন আইনের ঊর্ধ্বে। অথচ আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান হওয়ার কথা। মুনিয়া হত্যাকাণ্ডে তার প্রেমিককে গ্রেফতার না করে তাকে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দেয়ার ঘটনায় বিভিন্ন মহলে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

মাত্র তিনদিন আগেও তার গ্রেফতারের দাবিতে আমরা জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছি। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্তসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। তারা শুধু বলছেন, আমরা এখনো ময়নাতদন্তসহ ফরেনসিক প্রতিবেদন পাইনি। তবে তদন্ত থেমে নেই।

তবে আর একটি গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দুই সন্তানের জনক আনভীরের পরকীয়া কাণ্ডে প্রেমিকা মৃত্যুর ঘটনায় আপাতত তিনি ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকলেও শেষ রক্ষা নাও হতে পারে। এখনো তিনি গ্রেফতার না হলেও গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। শীর্ষ মহলের সবুজ সংকেত পেলে যে কোনো সময় আনভীরকে গ্রেফতার করা হবে। কারণ মুনিয়া-আনভীরের গভীর প্রেম ও পরবর্তীতে তাকে বিয়ে না করে এক পর্যায়ে ঐ তরুণীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার বিষয়টি মামলার তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

মুনিয়ার ফ্ল্যাটে আনভীরের যাতায়াতের প্রমাণ তারা পেয়েছেন। শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনকালে বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবহান আনভীরকে ছাই রঙা টুপি, কালো সানগ্লাস, কালো মাস্ক, কালো টি-শার্ট ও গাঢ় নীল প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে। এ খবর একাধিক অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে ছবিসহ।

গুলশানের ফ্ল্যাটে কলেজছাত্রী মুনিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা’ মামলায় একমাত্র অভিযুক্ত আসামি এই আনভীর ঘটনার পর তিনি দেশে আছেন নাকি বিদেশে পালিয়ে গেছেন, এ নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দেয়। গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে ঘটনার রাতেই ভাড়া করা কার্গো বিমানে করে দেশ ছেড়েছেন বসুন্ধরার এমডি।

তবে তার অবস্থান সম্পর্কে ওই সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী দাবি করেন, আনভীরের দেশত্যাগের বিষয় পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই। অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন আসামি (আনভীর) বাংলাদেশেই আছেন। তার দুটি (বাংলাদেশ ও শ্লোভাকিয়া) পাসপোর্ট তিনি ব্যবহার করেন। ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশ ত্যাগের কোনো রেকর্ড নেই।

তবে মুনিয়ার মৃত্যুর পর তিনদিনের মাথায় ২৯ এপ্রিল রাতে চার্টার্ড ফ্লাইটে (ভাড়া করা বিমান) দেশ ছাড়েন বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকের পরিবারের আট সদস্য। এ তালিকায় ছিলেন সায়েম সোবহান আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা সোহবান, তাদের দুই সন্তান, ছোট ভাই সাফিয়া সোবহানের স্ত্রী ইয়াসির সোবহান ও তাদের মেয়ে ও দুই পরিবারের তিনজন গৃহকর্মী ডায়না হার্নান্ডেজ চাকানান্দো, মোহাম্মদ কাদের মীর ও হোসনে আরা খাতুন। এর আগে ২৭ এপ্রিল আনভীরের ছোট ভাই সাফওয়ান সোবহানও দেশ ছাড়েন।

আর বসুন্ধরার এমডি আনভীর নিজে ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। মুনিয়ার আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় গত ২৭ এপ্রিল তার দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আদালত। অন্যদিকে আলোচিত এই মামলায় আনভীরের গ্রেফতারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচি পালন করে অনেক সামাজিক সংগঠন। সর্বশেষ গত ২৬ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড।

এতে বীর মুক্তিযোদ্ধার কন্যা কলেজছাত্রী মুনিয়াকে হত্যা মামলার আসামি আনভীরকে অবিলম্বে গ্রেফতারসহ পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, সাধারণত কোনো এজাহার হলেই পুলিশ সচেষ্ট হয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

এমনকি, অভিযুক্তকে না পেলে তার বাবা, মা, স্ত্রী, পরিবারের সদস্যদের কিংবাদ সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু মুনিয়া হত্যা মামলার ক্ষেত্রে প্রধান আসামি আনভীর প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশের ভ‚মিকা নিয়ে জনগণের মনে সংশয়, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে যা আমরাও প্রত্যক্ষ করছি। আমরা কি তবে বুঝে নেব, প্রশাসন তাদের হাতে জিম্মি?

প্রসঙ্গত, ২৬ এপ্রিল গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাসায় তৃতীয় তলার একটি অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া বাদী হয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, মীরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মোসারাত জাহান মুনিয়া। আনভীরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মুনিয়ার। প্রতি মাসে এক লাখ টাকার ভাড়ার বিনিময়ে আনভীর মুনিয়াকে ঐ ফ্ল্যাটে রেখেছিল। একটি ছবি ফেসবুকে দেয়াকে কেন্দ্র করে আনভীর তার বোনের ওপর ক্ষিপ্ত হয়। ফলে মুনিয়াকে হত্যা করা হতে পারে।

ঘটনার সবিস্তার জানার পর নিশ্চয়ই পাঠক-পাঠিকার মনে যে প্রশ্নটি জোরে শোরে উঠবেৃ মুনিয়াদের ঘটনা কি শেষ পর্যন্ত ধামাচাপাই পড়ে যাবে? প্রায় দেড় মাস হতে চলল, অভিযুক্ত ধনী ব্যক্তিটি তবু ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেলেন। শুধু তাই নয়, তিনি নির্বাচন, সভা-সমিতিতেও যোগদানের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন- যাকে বলা হয় সংশ্লিষ্টদেরকে ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেছেন? গোয়েন্দ সংস্থা বলছে, তাকে ধরতে ওপর থেকে গ্রিন সিগন্যাল লাগবে। কোন আইনে তা লেখা আছে? সংবিধান বলছে আইনের চোখে সবাই সমান। সায়েম সোবহান আনভীর তাহলে ব্যতিক্রম হলেন কেন? অঢেল টাকার মালিক- তাই?

মহান মুক্তিযুদ্ধের এই সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান একুশ বছর বয়সী কলেজছাত্রীর এমন মৃত্যু ঘটানো হবে অথচ মামলা দায়ের করার পরেও এবং সারাদেশ থেকে সমাজের নানা স্তরের মানুষ আসামি গ্রেফতারের দাবি জানানো সত্তে¡ও সরকার নির্বিকার। বিচারের বাণী এবার নীরবে নিভৃতে নয়- প্রকাশ্যেই কাঁদছে।

বলা হচ্ছে, উপরের গ্রিন সিগন্যাল লাগবে? এই ‘উপরটাকে তিনি কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, না কি স্বরাষ্ট্র সচিব, নাকি আইজি পুলিশ? জানানো হোক মানুষকে তার পরিচয়। নাকি সবাই ‘ম্যানেজড’?

মুনিয়ার বড় বোন মামলা দায়েরের পর তাকে হুমকি দেখানো হয়েছে কিন্তু ব্যবস্থা নেয়া হয়নি হুমকিদাতার বিরুদ্ধে। মুনিয়া ও তার বড় বোনের নৈতিক চরিত্র নিয়েও বহু অশ্লীল কথাবার্তা ছড়ানো হয়েছে নানা পত্রিকায় ও সামাজিক মাধ্যমে। এসবের সূত্র খোঁজা জরুরি। এসব অপপ্রচার যিনি বা যারা চালালেন তাদেরকে চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বা পেনাল কোডের আইনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা হোক।

পরিশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে চাই, ন্যায়বিচার পাওয়া নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বারংবার শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে যে, অপরাধী সে যেই হোক উপযুক্ত শাস্তি তাকে পেতেই হবে। বারংবার কর্তাব্যক্তিদের মুখ থেকে উচ্চারিত হয় যে “আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।”

এ কথাগুলো যদি ঠিক হয় তবে মুনিয়া সম্পর্কিত মামলাটি গতিহীন কেন? তার মামলার আসামির প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে অপরাপর মামলার আসামিদের প্রতিও কি অনুরূপ আচরণ করা হচ্ছে? না হয়ে থাকলে আইনের বৈষম্যমূলক প্রয়োগ কেন?

আমি আনভীরের শত্রু নই। তবে অপরাধী যে সে কিন্তু জাতির শত্রু। তাই অবিলম্বে মুনিয়া হত্যা বা তার আত্মহত্যা প্ররোচনাদানের অভিযোগে অভিযুক্ত সায়েম সোবহান চৌধুরীকে অবিলম্বে গ্রেফতার করা হোক- ফরেনসিক বা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার অযুহাত বা গ্রিন সিগন্যাল জাতীয় বেআইনি কথাবার্তার অবসান হোক।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।



poisha bazar

ads
ads