পশ্চিমবঙ্গে মমতার জয়, বিজেপির আপাত পরাজয়


  • মো. মোজাহিদুল ইসলাম নয়ন
  • ০৯ মে ২০২১, ১৭:৩৯

টানা আট দফা নির্বাচন অনুষ্ঠান শেষে গত ২ মে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ফলাফল ঘোষিত হয়েছে এবং সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো জয় ধরে রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির সম্ভাব্য উত্থানের আশঙ্কাকে আপাতত থামিয়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল রীতিমতো ২১৩টি আসনে জয় নিয়ে নবান্নে বসেছে।

গত ৫ এপ্রিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার মধ্য দিয়ে তৃণমূল সরকারের তৃতীয় মেয়াদ শুরুও হয়ে গেছে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি একটি চমকজাগানিয়া নির্বাচনী সাফল্য দেখিয়ে বিরাট জয় পাবে বলে যে প্রোপাগান্ডা চাউর হয়েছিল তা কার্যত হয়নি। এক্ষেত্রে যদিও বিজেপির আসন গতবারের চেয়ে অনেক বেড়েছে কিন্তু তাদেরকে ৭৭টি আসন নিয়ে আপাতত বিরোধী আসনেই থাকতে হচ্ছে।

অন্যদিকে রাজ্যে সুদীর্ঘ তিন যুগ শাসন করা জোট বামফ্রন্ট এবার একেবারে ঝাড়েবংশে বিদায় নিয়েছে। আক্ষরিক অর্থে সিপিএম-এর নেতৃত্বে বামফ্রন্টের আসন সংখ্যা-শূন্য! এবারের নির্বাচনে বামেদের সঙ্গে কৌশলগত জোট করা জাতীয় কংগ্রেসের পাতেও কোনো দানাপানি পড়েনি! এমন ফলাফলকে পশ্চিমবঙ্গের চিরাচরিত রাজনীতি আর নির্বাচনী ঐতিহ্যে যা একেবারে বেমানান।

পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্য যা কিনা ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিক দিক থেকে ভারতের আর দশটা রাজ্যের চেয়ে সেক্যুলার সেখানে বাম ঘরানার রাজনীতির এমন সঙ্গিন দশা খুব স্বাভাবিক কিছু নয়। অবিশ্বাস্যই বলতে হবে! অন্যদিকে দেশটির সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল যে দলটি কিনা স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী— তারাও বিগত সব নির্বাচনের চেয়ে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করল?

সবকিছু মিলিয়ে রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে যে কয়েকটি ইস্যুতে আলোচনা-সমালোচনা চলছে তার মধ্যে এই একটি বিষয় কিন্তু ঘুরেফিরেই আসছে। সেই আলোচনা থেকে কী বেরুচ্ছে এবং আদতে কি উপসংহার দাঁড়াবে সে আলোচনার আগে চোখ ফেরানো যাক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দক্ষতা এবং অতি উচ্চমার্গীয় সাফল্যের দিকে।

নির্বাচনের সর্বশেষ ফলাফলে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টি জয় পেয়েছে, যা ২০১৬ সালের নির্বাচনের অর্জিত আসনের চেয়ে ২টি বেশি। নির্বাচন কমিশনের তরফে সর্বশেষ যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে তাতে তৃণমূল দল হিসেবে পেয়েছে ৪৮.৪৮ শতাংশ ভোট যা গত দুটি নির্বাচনের ভোটপ্রাপ্তির হারের চেয়ে বেশি। তারা গত ২০১১ ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে ভোট পেয়েছিল যথাক্রমে ৩৯ ও ৪৫ শতাংশ।

আর বিজেপি এবার ভোট পেয়েছে ৩৭ শতাংশের কাছাকাছি। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান মেনে বলতে হচ্ছে, রাজ্যের এবারের নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপি দুটি দলেরই ভোট বেড়েছে। বিশেষ করে বিজেপির ভোটবৃদ্ধি তো অভূতপূর্ব। অসাম্প্রদায়িকতা, অতি হিন্দুত্ববাদবিরোধী যে সেন্টিমেন্ট সেটার লেন্স দিয়ে নির্বাচনের সার্বিক ফলাফলকে বিশ্লেষণ করলে বিজেপির ভোটপ্রাপ্তির হারকে বিশেষ বিবেচনায় নিতেই হবে।

কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলটির পক্ষে হিন্দুত্ববাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিভেদনীতি, তৃণমূলের বিরুদ্ধে আমফান দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সংখ্যালঘু তোষণ ইত্যাদি নানা ইস্যুতে চালানো প্রবল বিরোধী প্রোপাগান্ডা সবকিছু মিলিয়ে বিজেপির প্রচারণার রসদ কিন্তু কম ছিল না। তা সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস যে ফলাফল করল তা অনেকের মতে রীতিমতো ঈর্ষণীয়।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির দিক থেকে জোর ধাক্কা খাওয়ার পরও দলটি রাজ্যে যেভাবে ঘুরে দাঁড়াল তা একাধারে বিজেপিবিরোধী শিবিরের জন্য আশাজাগানিয়া এবং অভিনন্দনযোগ্য। মমতার এ আশাতীত সাফল্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও চক্ষুু চড়কগাছ হয়েছে। সবাই যেখানে ধরে নিয়েছিল- আঞ্চলিক একটি দল হিসেবে তৃণমূল কী পারবে সর্বভারতীয় পর্যায়ে প্রবল প্রতাপে এগিয়ে চলা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ জুটির ঝড়ে টিতে থাকতে?

তৃণমূল কী পারবে তৃতীয়বারের মতো নবান্নে যেতে? হিন্দুত্ববাদ তথা সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী রাজনীতির বাড়-বাড়ন্তের এ দুঃসময়ে তৃণমূল কী পারবে সেই ধাক্কা সামাল দিতে? না, ভারতের রাজনীতিতে নিজের ক্যারিশম্যাটিক ভূমিকার জোরে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মমতার দল নবান্নে থেকে গেল।

মমতা প্রমাণ করলেন, মন দিয়ে রাজনীতি করলে এবং জনঘনিষ্ঠ ইস্যুতে একনিষ্ঠ থাকলে প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষকেও ঘায়েল করা যায়। মমতার নেতৃত্বে রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নবীন এই দলটির নির্বাচনে এমন সাফল্যের কারণগুলো কি? সেই কারণগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে রাজনীতির সাধারণ ও সমকালীন পাঠ নেয়ার জন্য তা তো অতি জরুরি।

যে কয়েকটি কারণ এক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো— বিজেপির সম্পূর্ণ সাম্প্র্রদায়িক বিভেদনীতির যে উগ্রচেহারা তার বিপরীতে তৃণমূলের পক্ষে চালানো অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালিত্বের বিনয়ী সুর। বাংলার মানুষের যে ব্যাসিক সেখানে সাম্প্র্রদায়িকতাটা ঠিক ইন-বিল্ড নয়। মানুষের মন ও মননে সম্প্রীতির যে ভিত্তিভূমি জাগরূক তা নানা কারণে পূর্বের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়লেও এখনো তার অনেকটাই বেঁচে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন-মমতা বাংলার মানুষের ঠিক সেই সংবেদনশীল জায়গায় আঘাত করে তা জাগিয়ে দিতে পেরেছেন। মানুষকে বোঝাতে পেরেছেন যে, আমরা বাঙালি, আমাদের বাঙালিত্ব আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। উগ্র হিন্দুত্ববাদের ধ্বজা এ রাজ্যে ওড়াতে দেয়া যাবে না। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে— মমতার ব্যক্তিগত ইমেজ এবং রাজ্যশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

রাজনীতি দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পাড়ি দেয়া মমতা কিন্তু পোড়খাওয়া এক রাজনীতিক। যিনি কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। তিনি রাজনীতির শুরুতে ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর একনিষ্ঠ সমর্থক এবং পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম একজন সাবেক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর ছায়ায় বেড়ে ওঠা রাজনীতিক।

তিনি কংগ্রেস এবং বিজেপি জোটের মন্ত্রিসভায় থেকে সর্বভারতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়ে অভিজ্ঞতা নেয়া একজন। এছাড়া, তাঁর নিরাভরণ সাদাসিধে জীবনযাপন, কর্মঠ আর সহজাত নেতৃত্বগুণও সর্বস্তরের মানুষকে আকৃষ্ট করে থাকে। তৃতীয় কারণটি হলো— প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির পক্ষে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার বিপক্ষে সুনির্দিষ্ট কাউকে দাঁড় করাতে না পারা।

একটি রাজ্যের আগামীদিনের শাসনকাণ্ডারি কে হবেন তা যখন নির্দিষ্ট না হয় তখন তা ভোটারদের অনেকাংশেই বিভ্রান্ত করে। এক্ষেত্রে সেটাকে বড় করে দেখছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। চতুর্থ কারণটি হলো— গত কয়েক বছরে তৃণমূলের পক্ষে নেয়া নানা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও তার সাফল্য। বিশেষ করে নারী, কিশোরী ও শিশুদের স্বার্থরক্ষায় গৃহীত বিশেষ বিশেষ পদক্ষেপসমূহ।

বিগত সময়কালে মমতা সরকারের নেয়া ‘কন্যাশ্রী’, ‘সবুজ সাথী’ ও ‘স্বাস্থ্য সাথী’ ইত্যাদি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেখানে একটি বড় অংশ ছিল গ্রামীণ জনপদে পিছিয়ে নারী-কিশোরী ও শিশুদের উন্নয়ন। আর এ সকল পদক্ষেপ উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে অনেকটা স্বস্তি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ সকল পদক্ষেপ মমতাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে এবং যারা এর সুফল পাচ্ছেন তারা মনে করেছেন মমতা তাদের জন্য সত্যিই কিছু করার চেষ্টা করছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের জন্য ব্যক্তি মমতার অংশকেই বড় করে দেখেন অনেকেই। এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথাকথিত রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে না পড়লেও আটপৌঢ়ে সাজপোশাকে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের তিনি কাছে পাশের বাড়ির দিদি হয়ে উঠতে পেরেছেন ঠিকই।

বিজেপির পরাজয় নাকি তাদের অতি আকাঙ্ক্ষার পরাজয়? আলোচনার টেবিলে বসে অনেকেই বলছেন— তৃণমূল জিতেছে সেটা ঠিক আছে কিন্তু বিজেপি কি হেরেছে? বিজেপি কোথায় হেরেছে? তারা তো গতবারের ৩টি আসন থেকে বেড়ে এবার হয়েছে ৭৭টি। মানে, একমেয়াদের ব্যবধানে তারা ৭৪টি আসন বাড়িয়ে নিয়েছে।

সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে এটাকে তো রীতিমতো উত্থান বলতে হয়! তাহলে তারা হারল কোথায়? হ্যাঁ, তারা হেরেছে। তবে সেটা সংখ্যা, শতকরা হারে নয়, তারা হেরেছে তাদের আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে। পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষিতকে অনেকটা ভুল পাঠ করেছে তারা। বিজেপি মনে কমরছে— গত ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদি ঝড়ে যেমন-এ রাজ্যে ১৮টি আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল তেমনি এবারও সেই জুটির বদৌলতে বিধানসভাতেও আসন গেড়ে বসবে।

আর তেমন একটি সরল অংকের হিসাবকে সামনে রেখে দলটি পুুঁজি হিসেবে বিনিয়োগ করে তাদের মুখ্য অস্ত্র প্রবল হিন্দুত্ববাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প আর ক্ষমতায় গেলে ‘‘ওভারনাইট উন্নয়ন করে দেবে” জাতীয় পপুলিস্ট আশ্বাস-কে। তবে এটা ঠিক যে তারা শুধু তথাকথিত হিন্দুত্ববাদ আর পপুলিস্ট স্লোগাননির্ভর থাকেনি।

এবার নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ যে পরিমাণ এফোর্ট দিয়েছে যা অন্য কোনো নির্বাচনে তারা দিয়েছে কি না সন্দেহ। একজন সর্বভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হয়েও একটি রাজ্যের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি পাঁচ পাঁচবার সফর করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক দলীয় প্রধান অমিত শাহ তো প্রায় ২৫ বারের অধিক সময় এখানে সফর করেছেন।

বলা যেতে পারে নির্বাচনের পুরো সময়টাতে তিনি কার্যত এ রাজ্যেই অবস্থান করেছেন। দলের বর্তমান সভাপতি জেপি নাড্ডাসহ আরও অনেক কেন্দ্রীয় নেতার পদচারণায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রে ক্ষমতার পাশাপাশি টাকার ছড়াছড়ি, তৃণমূল নেতাদের ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়া, শো-বিজ জগতের তাবড় তাবড় তারকাদের দলে ভেড়ানো এবং রথযাত্রা ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে সে এক এলাহীকাণ্ডই তো করেছিল বিজেপি এবার!

কিন্তু এতো কিছুর পরও বিজেপি কাঙ্ক্ষিত ফল পেল না কেন? খুব স্বাভাবিক কারণে এটা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে এসেছে নির্বাচনোত্তর আলোচনার টেবিলে। আর সেই আলোচনায় ঘুরেফিরে যে বিষয়গুলো এসেছে তার মধ্যে রয়েছে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে বাংলার মানুষের দিক যে সর্বাত্মকভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে সে বিষয়টি উঠে এসেছে অনেকের বিশ্লেষণে। ভোটের ফলাফলে তো তাই মনে হয়।

বিশেষ করে দীর্ঘ রাজ্য শাসন করা বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, রাজ্যের মানুষ বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িত্ব প্রচারণা এবং এমন একটি দল ক্ষমতায় এলে যে বিদ্বেষ বিষ ছড়াবে সেই আশঙ্কা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মমতার তৃণমূলকেই উত্তম দল হিসেবে বেছে নিয়েছে।

মানুষ সর্বোচ্চ সংখ্যায় ঘাসফুলে সিল মেরেছে। দলের পক্ষে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা স্পষ্ট করতে না পারাও যে একটি বড় কারণ সেটা তো আগেই উল্লেখ করেছি। তৃতীয় কারণ হিসেবে একটি বড় সংখ্যক বিশ্লেষক যা মনে করছেন তা হলো এবারের নির্বাচনে অন্য দল থেকে বেরিয়ে বিজেপিতে সদ্য তরী ভেড়ানো অধিকাংশকেই প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয়াকে।

তারা বলছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রচেষ্টায় রাজ্যে দলের অবস্থান তৈরি করেছেন তারা এর ফলে হঠাত্ করেই ব্রাত্য হয়ে গেছেন। খুব স্বাভাবিক সেন্টিমেন্টাল ইস্যুতেই এমন বঞ্চনা মানুষ মেনে নিতে পারেন না। দলের ত্যাগী নেতারাও তাই অন্য দল থেকে দুদিন আগে যোগ দিয়েই টিকেট পাওয়াটাকে মেনে নিতে পারেননি।

তৃণমূলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে যারা এতদিন দুর্নীতির সঙ্গে নাম জড়িয়েছিল তারাই কিন্তু পিঠ বাঁচানোর জন্য কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির ঘাটে তরী ভিড়িয়েছিল। এ অঞ্চলের নির্বাচনী রাজনীতির এমন একটি গতানুগতিক ধারা অর্থাত্ দল পাল্টিয়ে দর বাড়ানো কিন্তু দাঁড়িয়ে গেছে। এমন সদ্য দলত্যাগী প্রায় ১৪৮ জনকে বিজেপি প্রার্থী করে। কিন্তু তাদের মাত্র দু’এজন ছাড়া অধিকাংশই পরাজিত হয়েছে।

দলপাল্টি দেয়া এসকল সুযোগসন্ধানী প্রার্থীদের নিকট থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এছাড়া আরো একটি কারণকে অনেকেই বিজেপির পরাজয়ের জন্য দায়ী করছেন। তাহলো— কোভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সংকট এবং এমন একটি দুর্যোগ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতাকে।

বিশেষ শেষের দফার ভোটগ্রহণের সময়গুলোতে ভারতে প্রতিদিন প্রায় চার লাখের মতো মানুষের আক্রান্ত হওয়া এবং দিনে গড়ে তিন হাজারের ওপরে মানুষের মৃত্যুর বিষয়টিকে বিজেপির শাসনের একটি ফেইলিয়র হিসেবে দেখা হয়েছে। তার নেতিবাচক প্রভাব যে বিজেপির নির্বাচনে পড়েছে সেটাকে বাস্তবিক কারণে অস্বীকার করার জো নেই তো।

কিন্তু সর্বাধিক বিস্ময়ের বিষয় হলো— দীর্ঘ দিনের একটি ক্ষমতার পরম্পরা নিয়ে যে বামফ্রন্টের রাজনৈতিক লিগেসি সেই তারাই এবার নাই হয়ে গেল! ভোটের হিসেবে তাদের প্রাপ্ত হিস্যা যেমন কমেছে তেমনি এবারই প্রথম বামফ্রন্ট বিধানসভায় একেবারে ডাক মেরে বসল। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এতে হতবাক হয়েছেন, অনেকেই তাঁদের বিস্ময় গোপন করেননি।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বিশেষ করে জ্যোতি বসুর আমল থেকে দল, সরকার ইত্যাদি পরিচালনায় বাম ঘরানার দক্ষতা, যোগ্যতা এবং সফলতা সবকিছু মিলিয়ে রাজ্যের রাজনীতির সঙ্গে বামফ্রন্ট যেন একটি অনিবার্য নাম। আর সেই নামটিই কিনা এবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল! যাদের সঙ্গে তারা এবার গাঁটছড়া বেঁধেছিল সেই কংগ্রেস যারা কিনা স্বাধীনতার পর থেকে দুই দফায় পাঁচমেয়াদে রাজ্য শাসন করেছিল তারাও কোনো আসন পেল না। এমন দুটি প্রবীণ এবং রাজ্য শাসনের অভিজ্ঞ দলের এমন শূন্য ফলাফল সত্যিই অবিশ্বাস্য। কিন্তু কেন?

এক্ষেত্রেও একাধিক কারনের কথা বলছেন অনেকেই। তারা বলছেন— বামফ্রন্টের শাসনের শেষ দিকে অর্থাত্ বুদ্ধদেব বসুর শাসনের সময়েই তাদের শিল্পনীতি, রাজ্যে শিল্পায়ন করতে না পারার ব্যর্থতা, রাজ্যের বেকার জনসংখার উচ্চহার প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছিল। এছাড়া, একটি পর্যায়ে সেই শিল্পায়ন করতে গিয়ে এবং তত্সংক্রান্ত জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করেই সাধারণ জনগণের সঙ্গে বোঝাপড়াটা ঠিক মতো করতে না পারাটা বামফ্রন্টের একটি অন্যতম রাজনৈতিক ব্যর্থতা।

ভূমি অধিগ্রহণের মতো একটি আইনি, বৈধ কার্যক্রমকে বুদ্ধদেব বসুর সরকার ঠিকমতো সামাল দিতে না পারায় তারা বড় রকম ধাক্কা খায়। আর তারই সুযোগ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন-ওই সব জমির মালিক ও তত্সংলগ্ন জনগণকে সংগঠিত করতে পেরেছিলেন, তেমনি সেই সময় পুলিশের গুলিতে ১৮ জন নিরীহ মানুষ নিহত হওয়ায় রাজ্যে বামবিরোধী একটি সেন্টিমেন্ট প্রবল আকার ধারণ করে।

জনগণের সঙ্গে সেই শুরু হওয়া দূরত্বের বিষয়টি দিনে দিনে কেবল বেড়েছেই। অন্যদিকে বামফ্রন্ট যাদের সঙ্গে জোট করেছে সেই কংগ্রেসও এ রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল অবস্থানে রয়ে গেছে। এবার রাহুল গান্ধী যে সকল আসনে নির্বাচনী প্রচারে এসেছিলেন সেখানেও কিন্তু কংগ্রেস দলীয় প্রার্থীরা পালে হাওয়া লাগাতে পারেনি।

আইএসএফ নামে যে ইসলামি প্ল্যাটফরমটির সঙ্গে তারা নির্বাচনী গাঁটছড়া বাঁধল তাদের সম্পর্কেও অনেকেই বলছেন যে- এর নেতারা নির্বাচনী মাঠে বাগাড়ম্বর করতে পারলেও তাদেরকে দিয়ে কাজের কাজ যে কিছু হয়নি সেটা তো ফলাফলেই স্পষ্ট। যদিও তাদের প্ল্যাটফরম থেকে একটি আসনে তারা জয় পেয়েছে।

আরো একটি কারণকে বামফ্রমেন্টর পরাজয়ের জন্য বলা হচ্ছে, তাহলো— ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর তাদের দমন-পীড়নে বাম ঘরানা এমনভাবে নিষ্পেষিত হয়েছে যে তাদের ঠিকমতো ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও এখন তৈনি হয়নি। ফলে, এমন একটি নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে ফাইট করার মতো শক্তি বামেদের এখন আর অবশিষ্ট নেই।

তবে এবারের নির্বাচনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল অর্থাত্ বিজেপির সম্ভাব্য উত্থান, আগামীর বাংলায় বিজেপির বাড়বাড়ন্ত- সেটার কী হবে? মমতার এই যে বিজয় সেটা কী আগামীদিনে বিজেপির উত্থানকে ঠেকাতে পারবে? এই প্রশ্নটি এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় প্রশ্ন।

কারণ, এবার বিজেপি ক্ষমতায় যাওয়ার মতো আসন নিশ্চিত করতে পারেনি ঠিকই কিন্তু যে যাই বলুক তারা রাজ্যে তাদের অবস্থান যে অনেক সুসংহত করেছে সেটা তো অস্বীকার করার জো নেই। দলটি ৭৭টি আসনে জয়ী হয়েছে যা পূর্বের চেয়ে ৭৪টি বেশি। অপরদিকে তারা যে সকল আসনে হেরেছে সেখানেও কিন্তু তারা দ্বিতীয় অবস্থানে গেছে।

গড় ভোট প্রাপ্তির দিক থেকে তারা ১০০ জন মানুষের মধ্যে ৩৭ জন মানুষের রায় পেয়েছে। তাহলে ভাবুন? যে দলটি ২০১৬’র পূর্বে এ রাজ্যে কোনো আসনই পেত না, সেই দলটিই কিন্তু এখন প্রধান বিরোধী দলের আসনে। অপরদিকে, বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে মমতার ব্যক্তিগত রোষ থেকে হোক আর রাজনৈতির প্রধান প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কারণেই হোক, তৃণমূল ক্ষমতায় গিয়েই বামেদের প্রতি যে দমন-পীড়ন চালিয়েছে যা বামফ্রন্টের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী সবার মনেই তরতাজা হয়ে আছে।

ফলে, আজ যখন বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক শক্তি তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ তখন বাম ঘরানা যে তৃণমূলকে কোনো অর্থে সমর্থন দেবে তা কী জোর দিয়ে বলা কঠিন। কেউ কেউ এমনও বলেন যে, বামেরা বিজেপিকে ঠেকানোর জন্য হলেও তৃণমূলকে সমর্থন দেয়ার বিষয়টিতে শেষ পর্যন্ত দ্বিধাগ্রস্তই থাকবে। দু’দলের মধ্যে যে বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে তা সহজে ঘুচবার নয়।

ফলে, আগামীতে যখন বিজেপি আরও শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে রাজ্যের নির্বাচনী লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার জন্য আসবে তখন তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে মমতার একাকিত্ব চোখে পড়ার মতোই বিষয় হবে। রাজ্য তথা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে যে বুনিয়াদি সেক্যুলার অংশ সেই বাম আর কংগ্রেসীরা তো এ রাজ্যে হতবল। চলমান বাস্তবতায় তারা তো নিজের পায়েই ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না, সেখানে কিভাবে জায়ান্ট বিজেপির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে?

লেখক: অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন সন্ধানী।



poisha bazar

ads
ads