ধনিক শ্রেণির হাতে জিম্মি যে সমাজ

ফকির ইলিয়াস
ফকির ইলিয়াস - ছবি : সংগৃহীত

  • ফকির ইলিয়াস
  • ০৮ মে ২০২১, ১২:০৫

একটি রিয়েলিটি শো’র ঘটনা দিয়ে লেখাটি শুরু করি। একজন বিশ্বখ্যাত ধনীকে নিয়ে এপিসোড। একজন উপস্থাপক ও তিনজন তরুণী অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন। ধনী ব্যক্তিটি তার জীবনের উত্থানের গল্প শোনাচ্ছেন। বলছেন তার জীবনে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা।

উপস্থাপক, একজন তরুণীকে প্রশ্ন করলেন-আচ্ছা আপনাকে যদি বলা হয় এই ধনীর কাছে আপনি কি চাইবেন; তাহলে আপনার চাওয়া কি? তরুণী ঝটপট বললেন, আমি চাইব তাকে বিয়ে করতে। উপস্থাপক বললেন, আর ইউ শিওর? তরুণী বললেন-ইয়েস। এভাবে তিনবার তরুণীকে প্রশ্ন করলেন উপস্থাপক। তরুণী তিনবারই হ্যাঁ বললেন।

এবার উপস্থাপক ধনীর দিকে তাকিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেন। ধনী ব্যক্তিটি খুব গম্ভীর হয়ে বসেছিলেন। তিনি এবার এদিক ওদিক তাকালেন। বললেন, কেন তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও? তরুণী বললেন, আপনি এই সমাজের জন্য অনেক করেছেন। অনেক দান আপনার। আমি আপনার সেবা করে বাকি জীবন কাটাতে চাই! ধনী খুব উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন।

বললেন, সেবা তো অনেক পরের কথা! তুমি যে আমার বিত্ত-বৈভবের ভাগী হতে চাও-তা বলছ না কেন? এবার তরুণী মাথা নিচু করলেন। ধনী ব্যক্তিটি কথা বলা শুরু করলেন। তিনি বললেন, দেখ মাত্র একটি ছেঁড়া ঝুলি কাঁধে নিয়ে আমি এই শহরে এসেছিলাম।

সংসারে বৃদ্ধা মা-বাবা মারা গেছেন আমাদের ছোট রেখে। ছোট ছোট আট ভাইবোন। সংসারের দায় আমার কাঁধে। আমি এসে কুলির কাজ শুরু করি। একদিন যখন একটি ট্রাক থেকে বস্তা আনলোড করছিলাম, তখন আরেকটি ট্রাক ড্রাইভার আমার পায়ের ওপর দিয়ে চাকা তুলে দেয়। আমি আহত হই। আমার কুলি বন্ধুরা আমাকে হাসপাতালে নেয়।

আউটডোরের বারান্দার খাটে শুয়ে শুধুই ভাবতাম, আহা! আমি যদি একটি ট্রাকের মালিক হতে পারতাম ! কিছু টাকা জোগাড় হলে আমি ফলের ঝুড়ি নিয়ে ফেরি করতাম ফলমূল। এভাবেই শুরু। এখন আমি ট্রাক প্রোডাকশন কোম্পানির মালিক। আমি এই রাষ্ট্রের এক নম্বর ধনী। এতটুকু বলে ধনী একটু থামেন।

তারপর বলেন, দেখ তুমি একজন তরুণী। তোমার জীবন সবে শুরু। তুমি শর্টকাট চাইছো কেন? তুমি যে কোনো পেশায় যোগ দিয়ে মাসে লাখ রুপি রোজগার করতে পার। তোমার সামনে একটি উজ্বল ভবিষ্যৎ। তুমি বড় ক্যানভাসে নিজেকে দেখছ না কেন ? ধনী ব্যক্তিটি বলেন, আমার ড্রইং রুমে প্রতিদিন ভোরে একজন ফুলওয়ালা ফুল দিয়ে যান।

তিনি এটা জানেন, এর পরের দিন একই ফুল আমার ড্রইং রুমে দেয়া যাবে না। প্রতিদিন নতুন ধরনের পুষ্পগুচ্ছ বদল হবে আমার টবে- সপ্তাহ জুড়ে। এর মাঝেই হাততালি পড়ে গেছে পুরো অডিয়েন্স জুড়ে। উপস্থাপক প্রোগ্রামের দায়িত্ব নিজ হাতে নিয়ে বদলে দিয়েছেন কথা ক্রমধারা। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, এই হচ্ছে মানবজীবন চিত্রের একটি সত্য এপিসোড।

আমরা কি আমাদের চারপাশে প্রতিদিনই এমন কিছু ঘটনা দেখছি না? বাংলাদেশে তো বটেই পুরো বাঙালি অঙ্গন জুড়ে এখন মোসারাত মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি আলোচিত হচ্ছে। মুনিয়া কি আত্মহত্যা করেছেন- নাকি হত্যার শিকার তা নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই। নেই এজন্য, বিষয়টি বিচারাধীন। কিন্তু এই দুর্ঘটনার পর আমরা কি দেখলাম? দেখলাম বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের নাম আসার পর, তা চেপে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করল অনেকগুলো মিডিয়া।

তাদের নিজের হাউসের মিডিয়াগুলো তো বটেই, অন্য আরও কিছু মিডিয়া আনভীরের মুখ ঢেকে দিয়ে শুধু মৃত মেয়েটির মুখ দেখাল। কে তাদের হাত বেধে রাখল ? সত্য প্রকাশে মিডিয়াগুলোর এত অনীহা কেন ? এই বিষয়ে একটি চমৎকার কথা বলেছেন মাননীয় তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে যেভাবে আসার কথা ছিল, সেভাবে আসেনি বিধায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচণ্ড সমালোচনা হচ্ছে।

তিনি বলেছেন- ‘এক্ষেত্রে তো সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। বা এক্ষেত্রে প্রায়শই যেটি বলা হয়, সরকারের চাপে অনেক সময় সংবাদ পরিবেশন করতে পারে না, কেউ কেউ যে অভিযোগ করে। এক্ষেত্রে তো তা ছিল না। তারপরও কেন করা হল না? তথ্যমন্ত্রী যোগ করেন, আমি মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে অনুরোধ জানাব, শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও দেশ, রাষ্ট্র ও জাতি যে আজকে এগিয়ে যাচ্ছে, এই করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যেও দেশের অগ্রযাত্রা থমকে যায়নি। এই সাফল্যের গল্পগুলো ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমে আসা প্রয়োজন। তাহলে জাতি আশাবাদী হবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে।

মুনিয়ার আত্মহত্যা ঘটনাটি মিডিয়ায় যথাযথভাবে তো আসেই নি বরং আমরা দেখলাম, কিছু সাংবাদিক গর্ব করে হঠাৎ গলায় ঝুলালেন নতুন পোস্টার। তারা বলছেন, অমুক পত্রিকার সাংবাদিক/সম্পাদক হিসেবে আমি/আমরা গর্বিত। তারা গর্বিত তারা হতেই পারেন।

কিন্তু একটি জলজ্যান্ত নিউজের সমাধি রচনা করতে চেয়ে তাদের এই কসরত কেন? মুনিয়ার ঘটনাটি প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন মোড় নিচ্ছে। একটি স্বনামধন্য পত্রিকা রিপোর্ট করেছে, মুনিয়ার কাজই ছিল পুরুষ শিকার’ একই সাথে বেরিয়ে আসছে বসুন্ধরা গ্রুপের নানা কার্যকলাপের নতুন নতুন তথ্য।

বহুল প্রচারিত ওয়েব পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউন গত ২৮ এপ্রিল ২০২১ এক প্রতিবেদনে লিখেছে- ‘দুদক আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আহমেদ আকবর সোবহানের বিরুদ্ধে সরকারি ১৮টি বাড়ি বরাদ্দে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুটি মামলা চলছে। এখন সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এগুলো হাইকোর্টে এসেছিল। পরে সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে যায়। মামলা দুটির বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এছাড়াও তিনি (আহমেদ আকবর সোবহান) সাব্বির হত্যায় ঘুষের মামলা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু হাইকোর্ট সে আবেদন খারিজ করে দেন। সেটিও হাইকোর্টের নির্দেশনার পর বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।’

মামলাগুলোর অগ্রগতি প্রসঙ্গে দুদক আইনজীবী বলেন, ‘দুদক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এবং খুবই গুরুত্ব দিয়ে ওইসব দুর্নীতির মামলা চলমান রেখেছে, বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। লকডাউনের কারণে একটু সময় লাগছে। দুদক অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মামলাটি এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে।’

প্রসঙ্গত, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় সরকারি ১৮টি পরিত্যক্ত বাড়ি সাজানো দরপত্র ডেকে অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রির অভিযোগে ২০০৭ সালের মার্চে সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাসসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করে দুদক। মামলায় ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এই মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন আহমেদ আকবর সোবহান।

এদিকে একুশে টেলিভিশনের একটি ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলছেন, রাষ্ট্রের সকল জমির মালিক সরকার নয়। তিনি তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাড. আব্দুল মান্নান খানের সাথে একটি মিটিং এ উত্তপ্ত হয়ে কথা বলছিলেন। বসুন্ধরা গ্রুপ বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন কাজ করছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয়- তাদের সকল অনিয়ম সরকার কিংবা জনগণকে মেনে নিতে হবে!

মুনিয়া আত্মহত্যা বিষয়ে চট্টগ্রামের আরেক ব্যবসায়ী শারুন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মুনিয়ার বড় ভাই। এর আগে সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন মুনিয়ার বড়বোন। ধরে নেয়া যাক, মুনিয়া উচ্চাভিলাষী ছিলেন। কিন্তু যে অন্তরঙ্গ ছবিগুলো মিডিয়ায় এসেছে, এই বিষয়ে মামলার বিবাদীর বক্তব্য কি? এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা দরকার।

মুনিয়া হত্যা মামলার ফরেনসিক রিপোর্ট পেতে আরও দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই রিপোর্ট হাতে পেলেই উন্মোচিত হবে মুনিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য। কিন্তু এর আগে কি ঘটছে! কি ঘটতে পারে! মামলার ন্যায় বিচার হবে তো! এমন অনেক প্রশ্নই আসছে। পুরো বিষয়টিকে অন্যখাতে প্রবাহিত করার জন্য অনেকগুলো মিডিয়া নানা চমক লাগানি নিউজ প্রকাশ করছে অনলাইনে, প্রিন্ট মিডিয়ায়।

সত্য না জেনে মন গড়া রিপোর্ট করা অনৈতিক কাজ। কোনো প্রভুকে খুশি করার জন্য তা তো অত্যন্ত গর্হিত কাজ বটেই! পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ধনিক শ্রেণির হাতেই জিম্মি থাকে মধ্যবিত্তের জীবন। বাংলাদেশে এই চর্চা আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়ছে। আর বুর্জোয়া শ্রেণি তাদের টাকার গরমে অনেক কিছুই ‘জায়েজ’ করতে পারছে।

এসব বিষয়ে সমাজ সচেতনতা দরকার। মনে রাখা দরকার, তাঁবেদারি করে আর যাই হোক সৎ সাংবাদিকতা করা যায় না। সবশেষে আরেকটি ছোট্ট ঘটনা দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম নিউইয়র্কে। তার সাংবাদিকতা জীবনের একটি ঘটনা তিনি বলছিলেন হেসে হেসে।

সুনীল বলছিলেন, আমি তখন একটা বড় গ্রুপের একটি কাগজে চাকরি করি। একবার মালিক পক্ষের একজন আমাকে ডেকে বললেন, তাদেরই একজন ‘কীর্তিমান’ কে নিয়ে আমাকে একটি ফিচার লিখতে হবে! আমি তাৎক্ষণিক আমার অপারগতার কথা জানিয়ে ওই রুম থেকে বেরিয়ে এলাম।

আমি ভেবেছিলাম, সেই দিনই আমার চাকরি শেষ! কিন্তু দেখা গেল মালিকপক্ষ আমাকে কোনো ‘শাস্তিই’ দেন নি! এই হলো শিরদাঁড়াওয়ালা সাংবাদিকতা। কিন্তু বাংলাদেশে আজ হচ্ছেটা কি! মালিকপক্ষের মন খুশি করার জন্য, সব কিছু করতে রাজি আমাদের সাংবাদিকদের বড় একটি অংশ। এই সুবিধাভোগীদের লাইন যত দীর্ঘ হবে বিষয়টি ততই লজ্জার ও হতাশার।

কারণ প্রজন্মের মেরুদণ্ড যে দিন দিন বাঁকা হচ্ছে সেটা আমরা টের পাচ্ছি। প্রতিদিন আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় কোথায় গিয়ে ঠেকছে তা কি খেয়াল করছি আমরা ?

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।



poisha bazar

ads
ads