অমিত শাহ দেখে যান আমরা কেমন আছি


  • ০৫ মে ২০২১, ১৩:৫৮

একসময় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি বেশ সরগরম ছিল। এখনো যে নাই তা বলা যায় না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- ভারতে এখন বাংলাদেশ নিয়ে রাজনীতি বেশ সরগরম। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ । তিনি বাংলাদেশ নিয়ে বেশ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে প্রায়শই বক্তব্য দিয়ে থাকেন, যা ১৮ কোটি বাংলাদেশির মনে চরম ক্ষত সৃষ্টি করছে। ক্ষেত্র বিশেষে হজম করা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ নিয়ে যথেষ্ট ইতিবাচক কথা বলেন। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। স্বাধীনাতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশে তিনি সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে গেছেন। আমরাও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের সহযোগিতার কথা কখনোই ভুলে যাই না। আমরা মনে করি ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। অথচ আমাদের বন্ধুদের গুলিতে সীমান্তে প্রায়ই বাংলাদেশিদের লাশ হয়ে আসতে হয়।

বিশ্বের আর কোনো দেশের সীমান্তে নাকি এমন নিষ্ঠুর ঘটনার নজির সচরাচর দেখা যায় না। বিশ্বের ছয়টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত অন্যতম। বাকি পাঁচটি হলো- পাকিস্তান-ভারত, পাকিস্তান-আফগানিস্তান, উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো এবং ভ‚মধ্যসাগর এলাকা। আমাদের ভাষায় ও সংস্কৃতিতে এপার বাংলা ওপার বাংলার কত মিল। আমরা বাংলাদেশিরা কখনই উগ্র সা¤প্রদায়িক ছিলাম না, এখনও এমন কথা আমাদের কেউ বলতে পারবে না, দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া। বিচ্ছিন্ন কখনই স্বাভাবিক বলে বিবেচনা করা যায় না। বাংলাদেশিরা এখন আর কার পরামুখাপেক্ষী নয়। বাংলাদেশ অনেক কিছুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ বটে। এ বিষয়ে ভারতীয় পণ্ডিতদের অনেক মতামত আছে। কারা সুযোগ পেলে কোন দিকে যাবে সেটা একবার বর্ডার খুলে দিলেই বোঝা যাবে। বাংলাদেশ ছেড়ে কেউ ৩য় শ্রেণির নাগরিক হওয়ার জন্য নিজের দেশ ত্যাগ করবে বলে মনে হয় না। বরং কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নিজের সম্পদকে সুরক্ষিত করার জন্য অন্যদেশে দ্বিতীয় বাড়ি করার জন্য যেতে পারে। তাতে বরং যে যাচ্ছে সে আখেরে ওই দেশেই উপকার করছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো আমরা যা না তা নিয়ে প্রচার করে আমাদেরকে ছোট করা হচ্ছে। এখানে হয়তো কোনো হীন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার কূটকৌশল থাকতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বা বাংলাদেশের আশপাশের রাজ্যগুলো থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অন্যতম কারণ হতে পারে। অথচ ভারত ছিল বিশ্বের কাছে একটি অন্যতম অসা¤প্রদায়িক দেশ। কিন্তু আজ ভারত সেই অবস্থান থেকেই অনেকটাই সরে এসেছে। এই সরে আশপাশের দেশ তো বটেই বিশ্বের জন্যও সুখকর নয়।

আজ আমরা যে অতিমারীর পার করছি তাতে কিন্তু কে কোন ধর্মের করোনা ভাইরাস কিন্তু সেটা বিবেচনায় নিচ্ছে না। আজ ভারত যেভাবে করোনা ভাইরাসের কাছে পর্যুদস্ত হচ্ছে তাতে করে কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশই এগিয়ে এসেছে এবং আসছে। আমাদের সরকারও সাধ্যমতো পাশে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে আমরা নিজেদেরকে কেন এত বিভাজনের মধ্যে ফেলে রাখছি। সাময়িক সুবিধার জন্য। কোথায় গেল বিশ্বের তাবৎ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গ। কেউ কি চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে পেরেছেন। তাহলে সাময়িক লোভ লালসায় না জড়িয়ে মানবজাতির কল্যাণে কাজ করার শপথ নিন। দেখবেন পৃথিবীটা আবারও আনন্দে ভরে উঠবে। আমরা করোনা মহামারীকেও পরাজিত করতে সক্ষম হব। দেখেন পশ্চিমবঙ্গের যে নির্বাচন বা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচন নিয়ে যে কদর্য বাক্যগুলো উচ্চারিত হলো তা কিন্তু যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের পাতার লেখা থাকবে। আর যারা এই কথাগুলো বলে যাচ্ছেন বা গেছেন তারা কিছু মানুষের কাছে চিরকাল ঘৃণিত হিসাবেই থেকে যাবেন। মীরজাফর, হিটলার, মুসোলিনি, ফেরাউন তেমনি মানুষদের কাতারেই কিন্তু আজও মানুষের অন্তরে রয়ে গেছেন। মানুষ তাদের ঘৃণাভরেই স্মরণ করছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলে কিন্তু তারা সুবিধা করতে পারেননি। যত গর্জে তত যে বর্ষে না তা আমরা দেখেছি। এই লেখা পর্যন্ত জানা গেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার নিজ আসনে জয় লাভ করতে না পারলেও বিজেপি ভালো করেনি। কিন্তু অমিত বাবু নিজের বা দলের স্বার্থ হাসিল করার জন্য প্রকাশ্যে বাংলাদেশের মানুষদের ‘উইপোকা’ বলতেও দ্বিধা কমরননি, যা ভারতেও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়।

অমিত শাহের বাংলাদেশ নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ, অবমাননাকর মন্তব্য করার ইতিহাস দীর্ঘ। অন্যদিকে ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিষাণ রেড্ডি একধাপ এগিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা আশ্রয় চাইলে তারা ভারতে নাগরিকত্ব পাবে, কিন্তু মুসলমানদের জন্য এ সুযোগ রাখা হয়নি। কারণ, তাতে নাকি অর্ধেক বাংলাদেশি ভারতে চলে যেতে চাইবে! কিন্তু বাংলাদেশের যারা খবর রাখেন তারা জানেন বাস্তব ঘটনা কি? খোদ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা তার সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তুলেছে-‘কে কোন দিকে অনুপ্রবেশ করিবে, তাহাই এখন প্রশ্ন।’ অমিত শাহদের এমন মন্তব্য ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের কথা খুব মনে পড়ে গেল।

অমিত শাহ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ খেতে না পেরে ভারতের দিকে ধাবমান হয়। এটা মোটেও সঠিক নয়। বাংলাদেশের কোন মানুষ না খেয়ে আজ পর্যন্ত ভারতে গেছে বলে বাংলাদেশের কাছে কোনো তথ্য নেই। অথচ আমাদের তথ্য মোতাবেক বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্সের উৎস। কলকাতার ব্যবসা অনেকাংশে বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি পর্যটকের অনুপস্থিতিতে কলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্যের কী হাল হয়েছে, সেটা অমিত শাহ না জানলেও কলকাতার ব্যবসায়ীরা ভালোভাবে টের পাচ্ছেন।

ভারতের হাসপাতালগুলোর অন্যতম রোগী হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশ থেকে যাতে রোগীরা ভারতে যেতে পারে সেজন্য তড়িঘড়ি করে করোনা মহামারীর সময় বিশেষ ভিসা এবং বিমান সার্ভিসের ব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন অবশ্য বেশ ভদ্রভাবে অমিত শাহের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে অমিত শাহের জ্ঞান সীমিত বলেই হয়তো তিনি এমন মন্তব্য করে থাকতে পারেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর তথ্য মোতাবেক, মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আইএমএফ বলেছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি তিন দশমিক আট শতাংশ বেড়ে হতে পারে এক হাজার ৮৮৮ ডলার। অন্যদিকে ভারতের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি ১০ দশমিক তিন শতাংশ কমে হতে পারে এক হাজার ৮৭৭ ডলার। অর্থাৎ, এই প্রথম মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতের থেকে ১১ ডলার এগিয়ে যেতে পারে।

১৯৯৯ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘ভারত রতœ’ পাওয়া খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেন, বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন ভারতের চেয়ে অনেক বেশি সফল। গড় আয়ু, নারী সাক্ষরতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, আজকের ভারতে যে সংকীর্ণ হিন্দু চিন্তাধারা দৃশ্যমান হয়েছে বাংলাদেশে সেই ধরনের সংকীর্ণ মুসলমান চিন্তাধারা প্রতিফলিত হয়নি। বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে একটি উদার দেশ বলেই পরিচিত, যা ভারত একসময় ছিল কিন্তু এখন তা হারাতে বসেছে। মানুষকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার না করে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করলে মানবজাতি উপকৃত হবে। ভারত সেদিকে ফিরে আসুক- সেটাই বিশ্বের মানুষের প্রত্যাশা।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

মানবকণ্ঠ/এসকে


poisha bazar

ads
ads