‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ হোক করোনা মুক্তির স্লোগান

হাবীব ইমন
হাবীব ইমন - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • হাবীব ইমন
  • ০৭ এপ্রিল ২০২১, ১০:১৫

কোথাও গেলে একটা লেখা বেশ চোখে লাগে- ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’। অবাক বিস্ময়ে চারিদিক দেখি, লেখার অন্তরালে কত উন্নাসিক অবস্থা আমাদের! কোনো কিছু মানার বালাই নেই। যত মাথাব্যথা যেন রাষ্ট্রের।

তবে ব্যাপারটা আসলেই বেদনাদায়ক। এত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, এত মানুষ মারা যাচ্ছে তবু কারো যেন কোনো ভীতি নেই, শঙ্কা নেই। এমন কেন? শুধু পেটের জন্য মানুষ নিয়ম মানে না।

নাকি অবহেলা, কোন কিছুকে পাত্তা না দেয়ার মানসিকতা বা উন্নাসিকতা। এটাকে কি বলা যায়? আমাদের দেশের থানায় গেলে বড় বড় করে লেখা দেখতে পাওয়া যায়- ‘আমি ও আমার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত’। থানাগুলো কী সত্যি দুর্নীতিমুক্ত? এ বিষয়ে সবারই কমবেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারপরও কত সব ভালো কথা লেখা। শুধু লেখা থাকলে হবে? কাজে তো আসতে হবে। এমন কত লেখার কথা বলব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, আমরা যা বিশ্বাস করি তা পালন করি না। এটা কি আমাদের প্রচলিত রীতি! সে যাই হোক, প্রাসঙ্গিকতায় আসি।

সম্প্রতি এক সকালে খিলগাঁওয়ে একটি ব্যাংকে গিয়েছিলাম, জরুরি প্রয়োজনে। যারা সার্ভিস দিচ্ছেন, তাদের মুখে মাস্ক নেই, মাস্ক আছে নামে মাত্র। তা থুতনিতে ঝুলছে। ব্যাংকে কিছুক্ষণ ছিলাম। ততক্ষণে একবারের জন্যে হলেও তাকে মাস্ক পরতে দেখিনি। অথচ মাস্ক পরানোর জন্য সরকার কত কি করছে! অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানেই এসব মানছে না কেউ।

ব্যাংক থেকে বেরিয়ে কয়েকটা দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটছিলাম। দোকানে ঢোকার পথে দেখলাম একইরকম, নো মাস্ক, নো সার্ভিস। দোকানের সেলস গার্লকে দেখলাম মাস্কছাড়া মোবাইল দেখছেন! দোকানের ভেতরেও দেখলাম একই অবস্থা, মাস্ক ছাড়া সবাই। ইনফিনিটির কাউন্টার ম্যানেজারকে দেখলাম, মুখে মাস্ক নেই, থুতনিতে পরে আছে। কোথায় যাবেন, কোথায় চলবেন, যেখানে যাবেন ঠিক একই অবস্থা।

অধিকাংশ ফার্মেসিতেও একই অবস্থা। তাদের অধিকাংশই মাস্ক পরে না। কিছুদিন আগে আইসিসিডিআরে গেলাম, সেখানেও একই অবস্থা, তাদের কারো কারো মুখে মাস্ক নেই। এই অবস্থা আসলে সবখানে চলছে। এই দুঃসময়কে এরা জয় করার সাহস কোথায় পেল। চোখের সামনে সংক্রমণ বাড়ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে। সরকার লকডাউন দিয়েছে অথচ কারো যেন কোনো বিধি মানার বালাই নেই। তাহলে কি মহামারী সুনামিতে পৌঁছাবে?

দুই. করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। নাছোড়বান্দা গতিতে দাপাচ্ছে। শনাক্তের হার প্রায় ১৯ শতাংশ। স্বাস্থ্য বিভাগের অবহেলা আর স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের উদাসীনতায় সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। হাসপাতালগুলোতে বেড, কেবিন পাওয়া যাচ্ছে না। আইসিইউ সংকট ব্যাপক। মানুষ অক্সিজেনের জন্য হা-হুতাশ করছে।

মানুষ অসহায়বোধ করছে। খুব ঘনিষ্ঠ একজন লেখক ফেসবুকে আকুতি জানিয়ে লিখেছেন, তার আত্মীয়ের জন্য আইসিইউ দরকার। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই রকম অসংখ্য মানুষকে আমরা এখন দেখছি, মানুষ আসলে অসহায় হয়ে পড়েছে। কোথায় যাবে, কি করবে- দিশেহারা।

গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, এ স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নিয়ে এত কথা হলেও পরিস্থিতি কোনো বদলায়নি। ঠিক একই জায়গায় রয়ে গেছে। ২০২০ সালের শুরুতে দেখেছি করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এখনো একই অবস্থা রয়েছে। করোনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা আমরা নিলাম, সেই প্রশ্নের সঙ্গে এ প্রশ্নও আছে যে, করোনাপরবর্তী পৃথিবীটা কি করোনা-পূর্ববর্তী পৃথিবীর মতোই থাকবে?

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ দেখা গেছে। আমাদের দেশেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের ব্যাপারে প্রায় ছয় মাস আগে আলোচনা হয়ে আসছে। যখন ঢেউ এলো তখন দেখা যাচ্ছে মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ কার্যত কোনো পরিকল্পনা নেয়নি। প্রস্তুত নয়। সবার মধ্যে গা ঝাড়ার ভাব চলে এসেছে। অনেক জেলাতে আইসিইউ চালু করার ঘোষণা বহুদিন আগে করা হলেও এখনো তার বাস্তবায়ন হয়নি।

অথচ সর্বত্র মানুষ প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে। এ রকম অনেক জায়গায় ঘটছে। একটি গণমাধ্যমের সংবাদে জানা যায়, এক বছরে স্বাস্থ্য বিভাগের অর্ধেক কাজও হয়নি। অক্সিজেন সরবরাহের কাজ ৭৯টি হাসপাতালের মধ্যে চালু রয়েছে ৩৮টিতে। এদিকে সংক্রমণ বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে, হাসপাতালে শয্যা স্বল্পতার আশঙ্কার কথাও শোনা যাচ্ছে।

সংক্রমণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে ১৮ দফার নির্দেশনা এলো। এসব নির্দেশনা অনেকটা উইশ লিস্ট বা ইচ্ছা তালিকার মতো। ব্যাপারটা তাই ঘটেছে, তার উদাহরণ তো লকডাউন। ইতিমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে লকডাউনে। এটা ছাড়া কোনো পথ ছিল না। ১৮ দফার নির্দেশনা বাস্তবায়ন যে হয়নি তার ফলাফল প্রতিদিন সংক্রমণের হার ও মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে। এখন কথা হচ্ছে, এই লকডাউনও যে কার্যকর হবে তার নিশ্চয়তা কিসে।

এ ব্যাপারে লকডাউনে যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যদি এগুলো মানার ব্যাপারে সরকার সক্রিয় ভ‚মিকা নিতে না পারে তাহলে কোনো কিছুই কাজে আসবে না। প্রতিদিন চোখে পড়ছে রাস্তা-ঘাটে লোকজন মাস্ক ছাড়া ঘুরছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্যানিটাইজারের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাহলে লকডাউনের যে বেশি কার্যকর হবে করোনা প্রকোপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে সেটা বোঝার উপায় কি?

লকডাউন আমার-আপনার সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন কমাবে, তেমনি দেশের শ্রমজীবী মানুষ, যারা দিন আনে দিন খায় তাদের জীবিকা অনিশ্চিত করে তুলবে। লকডাউনে শ্রমজীবী মানুষগুলোর কি হবে? এটা খুব একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে রয়েছে। এই শ্রমজীবী মানুষগুলো লকডাউনের সময় খাবে কী, এ পরিস্থিতিতে সবাই যখন রোজগার হারিয়েছে। খাবার কেনার অর্থটুকুও নেই।

গত লকডাউনে আমরা দেখেছি নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষদের খাদ্যের হাহাকার। লকডাউনে মানবিক বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য সেইসব মানুষের কথা কিন্তু চিন্তা করা হয়নি। তাদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেখা যায়নি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের জন্য ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় শ্রমজীবী ক্যান্টিন চালু করবে।

‘রাষ্ট্র যখন তার দায়িত্ব পালন করতে পারে না, তখন সাধারণ মানুষ এইভাবে এগিয়ে আসে’। নিকটবর্তী শ্রমজীবী মানুষটা একবেলা হলেও খেতে পারে, তার ঘরের শিশুটাকে যেন খাদ্যের অভাবে কাঁদতে না হয়, গর্ভবতী মায়ের ন্যূনতম খাদ্যের জোগানটা যেন নিশ্চিত হয়, আক্রান্ত মানুষজন যেন প্রয়োজনীয় ওষুধটা পায় সেই জোগানটা দেবার জন্য আরো একবার লড়াইয়ে নামতে হবে। সরকারকেও এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভ‚মিকা নেয়া উচিত।

তিন. করোনা কাহিনী এ শতকের নতুন এপিক। এর বিস্তার দীর্ঘ সময়কালে এবং ঘটনার সন্নিবেশে। অল্প কথায় এর বর্ণনা শুধু অসমাপ্ত থাকে না, অসম্ভবও মনে হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই কাহিনী বলবে। করোনা কাহিনী শুধু শারীরিক অভিজ্ঞতা নয়, উল্লেখযোগ্যভাবে মনোজাগতিক, সে জন্য কোনো চৌহদ্দি বা দৃষ্টিগ্রাহ্য সীমানা নেই। করোনা কাহিনী এই দুঃসময়ের প্রান্তদেশ স্পর্শ করেছে।

অন্তিম বিচারে করোনা ভাইরাসের দর্পিত বিচরণ ও প্রলয়কাণ্ড ক্ষমতাকেন্দ্রিক সভ্যতার মুখোশ উন্মোচন, তার অন্তঃসারশূন্যতা উদ্ঘাটন এবং আত্মপ্রবঞ্চনার এক সরল ও অকপট চিত্র। সকলকে নিজের সর্বোচ্চ সতর্কতার ভেতর দিয়ে এ করোনা পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে হবে। এই মহামারী থেকে মুক্তি পেতে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ চালু করতে হবে। নতুবা মুক্তির পথ আছে বলে মনে হয় না।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যকর্মী।






ads
ads