• বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
  • ই-পেপার

তেলবাজি-চালবাজি, সব বাজারেই কারসাজি

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • রিন্টু আনোয়ার
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪:০২

সামনে রোজা। স্বস্তির খবর নেই কোনো বাজারেই। চাল-তেল থেকে মাছ-সবজি সব বাজারেই কারসাজি। নোংরা চাতুরি। রমজানে ভোজ্যতেল, ছোলা, চিনি, মসলাসহ অনেক পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। একদিকে মুক্তবাজার অর্থনীতি। আরেকদিকে সরকার মাঝেমধ্যে চাল, তেল, আলু ইত্যাদির দাম ঠিক করে দেয়। এতে বাজারে উল্টো বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে। দাম আরো বাড়ে। রীতিমতো মশকরা।

আলু-চালের পর ক’দিন আগে সরকার ভোজ্যতেলের দাম বেঁধে দেওয়ার পর ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি তো করেনইনি। উপরন্তু, বেশ ক’টি কোম্পানির তেল বাজার থেকে উধাওই হয়ে গেছে। খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ধরা হয়েছিল ১১৫ টাকা লিটার। আর বোতলজাত সয়াবিনের প্রতি লিটার বিক্রি হবে ১৩৫ টাকায়। এ ছাড়া পাম সুপার বিক্রি হবে ১০৪ টাকা লিটার দরে। বোতলজাত সয়াবিনের পাঁচ লিটারের দাম ধরা হয় ৬৩০ টাকা।

বাণিজ্যমন্ত্রী খুব আশাবাদী ছিলেন ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিতে আসবে বলে। হয়েছে আরো বিপরীত। এক হিসাবে জানা গেছে, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টন। বাকিটা আমদানি করতে হয়। সাত-আটটি প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধন করে বাজারজাত করে।

তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ আছে। কোনো পণ্যের দাম বেঁধে দিলে তা কার্যকরের দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। আবার মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া যায় না। বরং বাজার তদারকি বাড়ানো যেতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবিকেও এ কাজে লাগানো যায়।

সরকার বাজার অর্থনীতির কথা বলছে। আবার অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে নিত্যপণ্যের দামে কারসাজি বা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে উল্লেখ করে কারসাজিকে ন্যায্যতা দিয়ে দেয়া হচ্ছে।

ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে একদিকে দাম বেঁধে দেয়া হয়েছে। আরেকদিকে, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারেও প্রভাব পড়েছে। কী দাঁড়ালো অর্থটা? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা বার বার মিটিং করছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কি পরিমাণ বাড়ছে, আর দেশের বাজারে কি পরিমাণ বাড়ছে? যেটা আমদানি করে আমাদের চলতে হয় সেটাতো আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর ভরসা করতেই হবে। কিন্তু এ সুযোগটা নিয়ে যারা বাড়তি মুনাফাবাজি করছে তাদের কী হবে? বাণিজ্যমন্ত্রী বা সরকারের কারো পক্ষে এসব প্রশ্নের যথাযথ বা পরিষ্কার জবাব কখনো আসে না। বরং জবাবের নামে দেয়া হয় গোঁজামিল। এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি একবার বলেছেন, তিনি আগুনের মধ্যে বাস করছেন। কথাটি বলেছিলেন পেঁয়াজের চড়া দামের সময়।

বাংলাদেশে একবার কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তা আর কমে না। কমতে চায় না। গত বছর অক্টোবরে ভারত আকস্মিকভাবে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্থিরতা দেখা যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় যে পেঁয়াজের কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হতো, সেই পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এরপর সরকার তড়িঘড়ি করে পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমার, তুরস্ক ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানি করলে দাম কমে আসে। এবার দীর্ঘ সময় ধরে চলছে চালের দাম নিয়ে জুলুমবাজি। মাস কয়েক ধরেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সব ধরনের চাল। দেশে মজুদের পরিমাণ পর্যাপ্ত থাকা ও নতুন করে আমদানির ঘোষণার পরও বেশি দামে চাল বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে সিন্ডিকেটের এ কারসাজি কোনোদিন থামবে কি-না, কে জানে? ভরা মৌসুমেও চাল থেকে শুরু করে ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ-মাংসসহ একাধিক পণ্য ভোক্তার বাড়তি দরে কিনতে হচ্ছে। এতে রীতিমতো ‘নাভিশ্বাস’ উঠেছে সীমিত আয়ের মানুষের। যেকোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে গেলে ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়।

তাই ভোক্তার সুরক্ষা দিতে হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দরকার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। কিন্তু দেশে সেটি হচ্ছে না। কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর হাতেই নিত্যপণ্য নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। এরা কারসাজি করলে তখন সরকারের আর করার কিছু থাকে না। তিনি মনে করেন, মুক্তবাজার অর্থনীতি থাকবে। কিন্তু তার মানে এই নয়, এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের যা খুশি তাই করার সুযোগ পাবে। বিশ্বের অনেক দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি থাকলেও সরকারের হাতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও থাকে।

অসাধু ব্যবসায়ী বা কোনো মহল যেন এ সুযোগে কোনো ধরনের কারসাজি করতে না পারে- টিসিবি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। কেবল পেঁয়াজের দামই নয়, প্রায় সব ধরনের সবজি, কাঁচামরিচ ইত্যাদির দামও বেড়েছে। চালের দামেও এক ধরনের কারসাজি লক্ষ করা যাচ্ছে।

কেজিপ্রতি ৫২ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে সাধারণ মানের চাল। করোনাকালীন খাদ্য সহায়তাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে সরকারের চালের দরকার হবে বেশি- এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহে চালকল মালিকরা চাল দিতে এগিয়ে আসেননি। এখনো সংগ্রহ মৌসুম শেষ না হলেও এবার সরকার লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এ ছাড়া চাল আমদানি ও রফতানি সংক্রান্ত খাদ্য অধিদফতরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তও চালের দামের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে ভ‚মিকা রাখছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, সরকার যখন যেমন সিদ্ধান্তই নিক না কেন- সাধারণ কৃষক তার সুবিধা ভোগ করতে পারে না। চালের মতো একই কথা প্রযোজ্য সবজির ক্ষেত্রেও।

রাজধানীতে যেখানে গড়ে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকার নিচে সবজি পাওয়া যায় না, সেখানে কৃষক তার উৎপাদন খরচও তুলতে পারে না বেশিরভাগ সময়। এ অবস্থায় সুষ্ঠু সরবরাহ ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, সর্বোপরি বাজার মনিটরিংয়ে জোর দেয়ার বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে চাল ও সবজিসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপ বেশি পড়ে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের ওপর, করোনা এমনিতেই যাদের নাকাল করে রেখেছে।

নিত্যপণ্যের বাজারের এই চণ্ডালতার মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারও ফের বেপরোয়া। আবারও তেজিভাব। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে কিছু কোম্পানির। বাজারের লেনদেন ও সূচক যে পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল, তাতে করে সূচক ও লেনদেন বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তিন-চার মাস ধরে বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বেড়েছে।

তাতে সূচক ও লেনদেন বাড়তে শুরু করে। দীর্ঘদিন প্রতীক্ষার পর বাজারের জন্য সেটা বেশ ভালো দিক ছিল। কিন্তু শেষ দুই সপ্তাহ বা তার কিছুটা বেশি সময় ধরে বাজারে যে উত্থান দেখা যাচ্ছে তা শঙ্কার। সামগ্রিকভাবে আমাদের বাজারের চরিত্র হচ্ছে, যখন বাড়তে থাকে তখন বেড়েই চলে। একইভাবে কমতে থাকলে একটানা কমে।

কিন্তু বাজারের সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তাতে বাজার অনেক বেশি টেকসই হয়। হঠাৎ একটানা বেড়ে যাওয়া অসুস্থতা। অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, বিশ্বের কোনো বাজারই পরিপূর্ণ কারসাজিমুক্ত নয়। দুর্বল কোম্পানির আধিপত্য কমাতে বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো দরকার। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভালো কোম্পানিকে খুব বেশি কি বাজারে আনা সম্ভব হয়েছে? পুরনোরাই ঘুরছে। সর্বত্রই চলিতেছে সার্কাস..।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।






ads
ads