আমাদের ভাষা আন্দোলন ও কিছু কথা

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
  • ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬:৫৫

আমাদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। বিজ্ঞজনরা আমাদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করে আমাদের অনেক তথ্য উপাত্ত প্রতিদিন দিয়ে থাকেন। অনেক সময় এসব তথ্য উপাত্ত নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক হয়ে থাকে। যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করে থাকেন, তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন আমাদের ১৯৭১ এর মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের পথকে সরল ও সঠিক করেছে।

যদিও বিরুদ্ধবাদীরা অনেক বিতর্কিত কথাবার্তা আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন নিয়ে বলে থাকেন। কিন্তু দেশের মানুষ তাদের কথায় কখনো কান দেয় না। দেশের মানুষ মনে করে আমাদের ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন যদি না হতো, তাহলে আজকে আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে বসবাস করতে পারতাম না। ভাষা আন্দোলন হয়েছিল বলেই দেশের মানুষের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি একটা ঘৃণার সৃষ্টি হয়।

পাকিস্তানিরা ভেবেছিল এদেশের মানুষ তাদের কথা মতো চলবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি বাঙালি কখনো অন্যের বশ্যতা স্বীকার করে বাঁচতে চায় না। আমরা যদি আমাদের অতীত ইতিহাস নিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আলোচনা করি তাহলে দেখব, ইংরেজবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালিরা সকল সময় বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করার ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু পাকিস্তানিরা হয় বাঙালির অতীত ইতিহাস জানতো না কিংবা তাদের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান ততটা গভীর ছিলো না। পাকিস্তানিদের বাঙালির ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান কম ছিল বলেই তাদেরকে মুখে চুনকালি মেখে এদেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে।আমাদের ভাষা আন্দোলন শুধু যে ভাষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা কিন্তু নয়। সাধারণ দৃষ্টিতে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনকে দেখলে চলবে না।

১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন ছিল আমাদের বাঁচা মরার একটা লড়াই। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ছিলো আমাদের মুক্তি সংগ্রামের মাইলফলক। এই আন্দোলন আমাদের বাঁচা মরার জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া আর কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা ছিল না। সেদিন যদি বাঙালি ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে না পড়ত এবং রফিক, জব্বার, বরকতসহ নাম না জানা শহীদরা ভাষার জন্য রাজপথে প্রাণ না দিতেন, তাহলে আজকের দিনে বাঙালির ইতিহাস হতো ভিন্ন রকম।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত না হলে আজ এই দেশের বাঙালিদেরকে খুবই দুর্ভোগের মাঝে পড়তে হতো। যা বিরুদ্ধবাদী দক্ষিণপন্থি কিছু দালাল ছাড়া সকলই স্বীকার করবেন। এ ব্যাপারে প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক ব্যক্তিরা কখনো দ্বিমত পোষণ করবেন না। মহান ভাষা আন্দোলন হয়েছিল বলেই আমরা বাঙালিরা ১৯৫৪-এর নির্বাচনে জয় লাভ করেছিলাম।

১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির তারিখে বাংলা ভাষার জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছিল বলেই, আমরা বাঙালিরা ৬২ শিক্ষা আন্দোলন এবং ৬৯ এর গণজাগরণের মাধ্যমে আমরা আমাদের ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পেরেছিলাম। আমাদের বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন ভাষা আন্দোলনকে শুধু মাত্র একটি সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন শুধু মাত্র আমাদের ভাষার বিজয়ই ঘটায়নি। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির পথটুকুও আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে।

কিছু কিছু ব্যাপার আছে তা আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না। একশ্রেণির লোক আছেন আমাদের দেশে, যারা দক্ষিণপন্থিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথাবার্তা বলতে খুব পছন্দ করেন। তাদের ভাবখানা এমন, কোনভাবে যদি ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা যায়, তাহলেই তারা সফল হয়ে যাবেন। কিন্তু এই দক্ষিণপন্থি লোকজনরা একটা কথা বুঝেন না কিংবা বুঝেও বুঝতে চান না যে, ইতিহাসের গতি পথকে কখনো পিছনমুখী করা যায় না।

সাময়িকভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করা গেলেও, একটা সময় মানুষ সকল বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে সঠিক পথে পরিচালিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে আরেক শ্রেণির লোক আছেন, যারা প্রগতির মুখোশ পরে নিজেদেরকে বুঝাতে চান তারা খুবই প্রগতিশীল এবং তারাই ইতিহাসের গতিপথকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে সকল সময় তৎপর থাকেন। অথচ এই সব মুখোশে আবৃত সুবিধাবাদীরা মানুষের সকল আন্দোলনের প্রাপ্তিকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে সকল সময় বাধার সৃষ্টি করে থাকেন।

এসব সুবিধাবাদীরা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝতে চায় না। এই শ্রেণির মধ্যে আরেক দল আছেন আমাদের মধ্যে, যারা সকল সময় যে দল সরকারে থাকে সেই দলের লেজুরভিত্তি করে থাকেন। তারা সরকারের সাথে থেকে থেকে গাছের নিচেরটা এবং উপরেরটা দুটোই ভক্ষণ করে থাকেন। এই শ্রেণির লোকেরা আরো ভয়াবহ। তাদেরকে চেনা খুবই কঠিন। তারা কোনো দল ক্ষমতা থেকে চলে গেলে সেই দলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নতুন যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের লেজুড়ভিত্তি করতে শুরু করে।

তাদের কোনো রং নেই। তাদের কোনো গন্ধ নেই। তাদের চরিত্র আর গিরগিটির চরিত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। গিরগিটি যেমনভাবে তার সুবিধার জন্য ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়, তেমনি করে সুবিধাবাদী প্রগতিশীলরাও তাদের সুবিধার জন্য ক্ষণে ক্ষণে রং বদল করে থাকে। যাদের নৈতিক চরিত্র গিরগিটির রং বদলানোর মতো হয়ে থাকে, তারা নিশ্চিয়ই মানুষের বন্ধু হতে পারেন না। এই চরিত্রের লোকেরা কেবল নিজের স্বার্থই দেখে থাকে। তারা রাজনীতির মাঠে বড় বড় কথা বলেন।

কিন্তু তারা মানুষকে ভালোবাসেন না। এই শ্রেণির রাজনীতিবিদরা মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে নিজেদের লাভ লোকসানের হিসাব বৃদ্ধি করে থাকেন। আসলে অসৎ ব্যক্তিরা কখনো মানুষের বন্ধু হতে পারেন না। তাদের মুখের ভাষা খুব মিষ্টি হয়ে থাকে। যেন কথার মাঝে মধু ঝড়ে। বাস্তবে অসৎ ব্যক্তিদের অন্তরে বিষ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আমরা দেশের সাধারণ মানুষ খুবই সরল এবং সহজ।

আমরা আমাদের নেতাদের মুখের দিকে চেয়ে থাকি আমাদের আয় উন্নতির জন্য। কিন্তু দেখা যায় আমাদের নেতারা আমাদের আয় উন্নতি বৃদ্ধি না করে কিভাবে নিজেদের আয় উন্নতির পথ বৃদ্ধি করা যায়, সেই দিকে বেশি করে মন দিয়ে থাকেন। তবে এখন সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ আগের মতো সব কিছু সহজ করে বিশ্বাস করতে চায় না। এখন একজন রিক্সা শ্রমিক থেকে শুরু করে অতি সাধারণ মানুষরাও পাঁচ টাকা, আট টাকা এবং দশ টাকা খরচ করে পত্র/পত্রিকা পড়ে থাকে।

আজকের এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মানুষকে আগের মতো আর সহজে বোকা বানানো সম্ভব নয়। এখন বলতে গেলে প্রায় মানুষের হাতেই আধুনিক সেলফোন থাকে। মানুষ ইন্টারনেটের সেবা নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারছে। তাই আমাদের অতিলোভী নেতাদের বুঝা উচিত সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বুদ্ধির জায়গাটাও অনেক বিস্তৃত হয়েছে।

দেশের সাধারণ মানুষ আজকের দিনে আগের মতো আর নেতাদের কথায় বিশ্বাস রেখে মার খেতে রাজি নয়। তারপরও অনেকেই মনে করেন আমাদের অসৎ রাজনীতিবিদদের যদি আমরা রাজনীতির মাঠ থেকে উৎখাত করতে না পারি, তাহলে আমাদের সাধারণ মানুষের কপালে দুঃখ থেকেই যাবে। আমরা সাধারণ মানুষও যেন কিছুটা সচেতন হই। আমরা যেন সেই ব্যক্তির পিছনে দাঁড়াই, যে ব্যক্তি প্রকৃত অর্থেই মানুষের জন্য কাজ করে থাকেন।

আমাদের ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বলতে গেলে বলতে হয় আমাদের ভাষা আন্দোলন বাঙালিদের জগৎ সভায় মানুষের মর্যাদা দিয়েছে। এ কথা প্রগতিবাদী মানুষরা এক বাক্যে অবশ্যই স্বীকার করবেন। আমাদের ভাষা আন্দোলন বাঙালিদের বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো মনেপ্রাণে শক্তি জুগিয়েছে।

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির, আমি কি ভুলতে পারি” গানটি যখন শুনি, তখন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সকল বাঙালির মনে প্রাণে প্রগতির চেতনায় প্রগতির সুগন্ধি গোলাপ ফোটে। বিরুদ্ধবাদীদের মনে একুশের চেতনা নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়ে থাকে। তারা একুশের চেতনায় বিশ্বাস রাখে না এবং একুশের চেতনাকে ভয় করে চলে।

কেন না তারা তো আমাদের সকল আন্দোলন সংগ্রামের বিরোধিতা করে এসেছে বিদেশিদের দালালি করার অভিপ্রায়ে। আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনার পথ বাঙালিদের এগিয়ে যাওয়ার আসল পথ। তাই বলছিলাম, আমরা যেন কিছুতেই ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনের সঠিক চেতনার পথ থেকে সরে না দাঁড়াই। কথাটা সকল বাঙালিকেই অবশ্যই মনে রাখতে হবে।

লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট।






ads
ads