ভাষা আন্দোলনে নারী

সুতপা বেদজ্ঞ
সুতপা বেদজ্ঞ - সংগৃহীত

poisha bazar

  • সুতপা বেদজ্ঞ
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:৫০

সময়ের বাঁকে বাঁকে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মানুষের নানা অর্জনের যে ইতিহাস লেখা হয়েছে তা পুরুষের গল্পে ঠাসা। নারী সেখানে অনুপস্থিত। থাকলেও পার্শ্ব চরিত্র। পৃথিবীতে এখনো পর্যন্ত নারীদের যে ইতিহাস লেখা হয়েছে তা গৌণ, অক্রিয়; ইতিবাচক অর্থে ধরলে নারীকে দেখানো হয়েছে সর্বংসহা আশ্রয়দাত্রী হিসেবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাংলার এই ভূখণ্ডে প্রত্যেকটি আন্দোলন-সংগ্রামে নারীর অংশগ্রহণ ছিল সক্রিয়। তেভাগা থেকে ব্রিটিশবিরোধী, ভাষা থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীন দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণজাগরণ মঞ্চসহ আজ পর্যন্ত যতগুলো গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে তার অনেকগুলোতেই শুধু অংশগ্রহণ নয়, সামনের কাতারে ছিল নারীরা। তা সত্তে¡ও এখনো পর্যন্ত নারীর ভ‚মিকা খুব কমই আলোচিত হয়। ভাষা আন্দোলনেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

ভাষার জন্য এ ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করতে হয়েছে। যার গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। ভারত ভাগের পরে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে সংঘটিত আন্দোলন ছিল বাংলা ভাষাভাষীদের নতুন জাতি রাষ্ট্র গঠনের বাঁক পরিবর্তনের আন্দোলন। সে সময়ে নারীদের স্বাধীনতা ছিল না বললেই চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা ছিল হাতে গোনা।

তাদের ছেলেদের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ ছিল। ক্লাস শেষে কাটাতে হতো কমনরুমে। শিক্ষক কমনরুম থেকে ডেকে মেয়েদের ক্লাসে নিয়ে যেতেন এবং ক্লাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকের সঙ্গেই তাদের বেরিয়ে আসতে হতো। এরকম একটি রক্ষণশীল সমাজ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ কোন সামান্য ব্যাপার ছিল না। ভাষা আন্দোলন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৮০-৮৫ জন।

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবির আন্দোলনে সহযোদ্ধা হয়ে ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ছাত্রীরা। পাকিস্তান আর্মি ও পুলিশের তাক করা বন্দুকের নলকে উপেক্ষা করে ভাসার দাবির মিছিলগুলোতে নারীরা ছিলেন সামনের কাতারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে ভাষার দাবির বিভিন্ন সেøাগান সম্বলিত পোস্টার এঁকেছেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নারীরাই পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙ্গে। আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েরা চাঁদা সংগ্রহ করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখেন মেয়েরা।

আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য গৃহিণীরা অলংকার খুলে দেন। শুধু তাই নয়, ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার জন্য অনেক নারীকে জেল খাটতে হয়েছে। কেউ হারিয়েছেন সংসার, কেউবা বহিষ্কৃত হয়েছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। শুধু ঢাকা নয়, রাজশাহী, খুলনা, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রায় সবক’টি বড় শহরের সচেতন প্রগতিশীল নারী ও ছাত্রীরা যুক্ত হয়েছিল এই আন্দোলনে। নারীদের কী অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ়তা থাকলে এভাবে একটি আন্দোলনে যোগ দেয়া সম্ভব তা সহজেই অনুমান করা যায়।

৩১ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভায় ছাত্রীদের পক্ষ থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন বলেন- ‘বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা তাদের রক্ত বিসর্জন দেবে।’ আন্দোলন শুরুর দিকে একজন ছাত্রীর মুখে এমন সাহসী উচ্চারণ কর্মীদের মনে উদ্দীপনা জোগাতে বিশেষ ভ‚মিকা রাখে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয়। সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল জাতির কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখা। তমদ্দুন মজলিস গঠিত হবার পরে সংগঠনের পক্ষ একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। যা তখনকার বাংলাভাষী সচেতন জনগোষ্ঠীর মনে ভাষার প্রশ্নে ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।

ভাষাসৈনিক প্রফেসর চেমন আরা ভাষা আন্দোলন বিষয়ক একটি প্রবন্ধে লিখেছেন-‘আমি ও আমার ছোট বোন মমতাজ তমদ্দুন মজলিসের কর্মী হয়ে পড়ি। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে আমরা মজলিস অফিসে যেতাম। পোস্টার, ব্যানার বানানোসহ আরও অনেক কাজে আমরা বড়দের সাহায্য করতাম। এ সময়ে জেবুন্নিসা বেগম, দৌলতুন্নেছা বেগম ও আনোয়ারা বেগমকে মজলিসে আসতে দেখতাম। তারা তিনজনই উচ্চশিক্ষিত এবং মজলিসের আদর্শে বিশ্বাসী ও ভাষার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।’ বিভিন্ন শহরে তখন মজলিসের শাখা গঠিত হয়েছিল।

ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ওমেন হলের ছাত্রীরা দুঃসাহসী ভ‚মিকা পালন করেছিল। সে সময় ড. শাফিয়া খাতুন ছিলেন ওমেন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সহসভাপতি। ১৯৫০-৫১ তে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওমেন হল ইউনিয়নের জি এস এবং পরবর্তী বছর ভিপি নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলন সংঘটিত করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে যাদের নাম অবশ্যই স্মরণীয় তারা হলেন- সুফিয়া খাতুন, সামসুন নাহার, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, কাজী আমিনা, মাহফিল আরা, খোরশেদী খানম, হালিমা খাতুন, রানু মুখার্জী, আফসারী খানম প্রমুখ নারী একুশের আন্দোলনকে বেগবান করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙার ক্ষেত্রে বিতর্ক উঠলে সেদিন ছাত্রীরা পক্ষে মত দিয়েছিল। সেদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে মেয়েরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আমতলার সভায় যোগ দিতে এসেছিল। পুলিশি হামলার আশঙ্কায় ছাত্রীদের মিছিল না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিছিলে নারীরা হেঁটেছিল, ছিল অগ্রবাহিনী হিসেবে। ২১ ফেব্রæয়ারিতে নৃশংসতার প্রতিবাদে অভয়দাশ লেনে নেতৃত্ব দেন বেগম সুফিয়া কামাল ও নুরজাহান মুরশিদ। ধর্মঘট উপলক্ষে প্রচুর পোস্টার ও ব্যানার লেখার দায়িত্ব পালন করেন ড. সাফিয়া খাতুন ও নাদিরা চৌধুরী।

ঢাকার বাইরে নারীরা ভাষা আন্দোলনে একাত্ম হতে গিয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে মমতাজ বেগম কারাভোগ করেন। শুধু তাই নয় সরকারের চাপে স্বামী তাকে তালাক দিতে বাধ্য হন। মমতাজ বেগমের ছাত্রী ইলা বকশী, রেণু ধর ও শাবানীর মতো কিশোরীকেও গ্রেফতার করা হয়। ময়মনসিংহ মুসলিম স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী সাহেলা বেগম ভাষা শহীদদের স্মরণে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন করায় সরকারের চাপে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করে। সালেহা বেগমের শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে।

২২ ফেব্রুয়ারির গায়েবানা জানাজা, শোক মিছিল ও ২৩ ফেব্রুয়ারি হরতালসহ প্রতিটি কর্মসূচিতে নারীরা অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯৫৩ সালে ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনার গড়ে তোলে। আর বর্তমানে যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সেই নকশার সঙ্গে মিশে আছে শিল্পী নভেরা আহমেদের নাম। ভাষার দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার পরিণতি লাভ করতে লেগেছিল প্রায় এক দশক। ১৯৫২ সালের শহীদী আত্মদান পাকিস্তানিদের থমকে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ষড়যন্ত্র থেকে তারা পিছু হটেনি।

১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ বেদিতে এদেশের ছাত্র সমাজ যাতে শ্রদ্ধা জানাতে না পারে সে জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। সেদিন ঘটে এক অভ‚তপূর্ব ঘটনা। ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রীরাও ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে রাজপথে নেমে আসলে প্রায় ২০-২১ জন ছাত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রীদের গ্রেফতারের ঘটনায় জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং সরকারের টনক নড়ে। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

এই সময় আর সেই সময়ের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন নারীদের পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন হতো। গ্রামের নারীরা ছিল পর্দা প্রথার আড়ালে বন্দি। এমন সময়ে সামাজিক, ধর্মীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা উপেক্ষা করে ভাষার দাবিতে নারীদের বেরিয়ে আসা কোন সাধারণ ব্যাপার ছিল না। ছাত্রদের ক্ষেত্রে যেখানে পুলিশি বাধা ছাড়া অন্য কোন বাধা ছিল না।

ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি নারীরা এই ভূখণ্ডে আজকের অবস্থানে এসেছে। এতকিছু সত্তে¡ও আজ পর্যন্ত নারী ভাষা সংগ্রামীেেদর নাম ও তাদের অবদান নিয়ে ইতিহাসে খুব কম আলোচিত হয়েছে। এদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থার ধারক-বাহক বা দেশের ইতিহাসবিদগণ অথবা বুদ্ধিজীবী কেউই এর দায় এড়াতে পারেন না। ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস সঠিকভাবে জানা ও তা নতুন প্রজন্মকে জানানো আজ আমাদের নৈতিক কর্তব্য। তা যদি আমরা করতে পারি তবেই আমাদের আগামী প্রজন্ম তাদের বোনেদের কীর্তিগাথা শুনে গৌরব বোধ করবে। আগামীদিনে যে কোন অন্যায়-অনিয়ম ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিজেদের প্রস্তুত করতে উদ্দীপ্ত হবে।

লেখক: নারী মুক্তি আন্দোলনের নেত্রী।






ads
ads