বাইডেনে কি পাবে বাংলাদেশ?

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার - সংগৃহীত

poisha bazar

  • রিন্টু আনোয়ার
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১০:৩৪

নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, নাটকীয়তা, বিনোদন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদায়। জো বাইডেন যুগের শুরু। ২০ জানুয়ারি শপথ নেন বাইডেন। তার আগে শপথ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ওয়াশিংটনে মার্কিন কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের ওয়েস্ট ফ্রন্টে নিজ পরিবারের ১২৭ বছরের পুরোনো বাইবেলের একটি কপি হাতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে শপথ পড়ান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্ট। আর কমলা হ্যারিস শপথ পড়েন দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সোনিয়া সোটোমায়র কাছে।

ট্রাম্প শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ১৬০ বছরের মার্কিন ঐতিহ্য ভেঙ্গে বাইডেনের অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ না নেয়ার নজিরও তৈরি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক ৭৮ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে নিয়ে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেরই অনেক জিজ্ঞাসা। প্রাপ্তির প্রত্যাশা।

সম্ভাব্য ঝুঁকির শঙ্কাও কারো কারো। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েই ট্রাম্পের নীতিতে সমানে কাঁচি চালাচ্ছেন বাইডেন। কারো কারো ধারণা, অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র দুই নীতিতে বাইডেন ফিরে যাবেন ওবামা নীতিতে। বাইডেন জানিয়েছেন, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে তিনি সব নাগরিকের প্রেসিডেন্ট হবেন তিনি। এত কথার মাঝে বাংলাদেশে আলোচিত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে যা-ই হোক, বাইডেনের সুবাদে বাংলাদেশ কী পাবে? কী নীতি অবলম্বন করবে বাইডেন প্রশাসন?

তবে বাইডেন বা মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্টের শুধু বাংলাদেশ নিয়ে আলাদা কোনো পদক্ষেপ নেবেন-তা ভাবা যায় না। এ কারণে বাংলাদেশের মতো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান উভয় সরকার আমলে সম্পর্কে বড় কোনো পরিবর্তন হয় না। এর বিপরীতেও কথা আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেদিকে হাঁটে পশ্চিমাসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশকে বন্ধু বিবেচনা করে; তার মিত্ররাও তা-ই করে। আবার যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশকে মানবাধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন, মানব পাচার প্রভৃতি বিষয়ে সমালোচনা করলে, তার মিত্ররা একবাক্যে সেই প্রতিধ্বনিই করে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো নতুন সরকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রস্তুতি নেয় আমাদের মতো দেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাইডেনকে তিনি বাংলাদেশ সফরে আসার জন্যও আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী আশা করেন, নতুন সরকারের আমলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত কমলা হ্যারিসকেও তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন।

দ্রুততার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকারকে তার অভিনন্দন জানানোর মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার আগ্রহের বার্তা মেলে। বাইডেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে ৪৭তম ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

শেখ হাসিনা সরকার ও বারাক ওবামার প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ ঘটে। ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে ওবামা প্রশাসনের ইতিবাচক ধারণা ছিল সবসময়। বারাক ওবামা এদেশের মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে ২০১৫ সালে প্রশংসা করেন। শেখ হাসিনা সরকারের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট হয়ে এদেশকে তিনি এশিয়ার টাইগার হিসেবে আখ্যা দেন।

ওবামা সরকারের সময় ২০১৪ সালে সপ্তাহব্যাপী সফরকালে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহ-সভাপতিত্বে ২৬ সেপ্টেম্বর শান্তিরক্ষা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এবং রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগমে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা তুলে ধরেছিলেন।

এদিক থেকে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শেখ হাসিনাকে ভালো করেই চেনেন ও জানেন। এর বিপরীতে বাংলাদেশের নোবেলজয়ী ড. ইউনূসও বাইডেনপন্থি বলে প্রচার আছে। অবশ্য ঐতিহাসিকভাবেই ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ড. ইউনূসের গভীর সম্পর্ক। তিনি বিল ক্লিনটন এবং হিলারি ক্লিনটনের পারিবারিক বন্ধু হিসেবে পরিচিত।

জো বাইডেনের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। জো বাইডেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাব গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়াও জো বাইডেনের আমন্ত্রণে তিনি কয়েকবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফর করেছিলেন। নির্বাচনে ফলাফলের আগে থেকেই বাইডেনকে নিয়ে উল্লসিত হতে দেখা গেছে তাকে।

এদিকে শেখ হাসিনা বরাবরই ড. ইউনূসে বিরক্ত ভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তাকে নিয়ে প্রকাশ্যে নানা কথাও বলে আসছেন। আর সেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস মার্কিন নির্বাচনে জো বাইডেনের পক্ষে ছিলেন। বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারণায়ও অনলাইনে অংশ নিয়েছেন। এছাড়া বাইডেনের তহবিলে ইউনূস অর্থ দিয়েছেন বলেও প্রচার রয়েছে।

তবে প্রচার-অপপ্রচার, আশা-হতাশা যা-ই থাক, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশি রফতানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের পরিমাণ ৩.৮ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা সবসময় দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসনের বিষয়ে নমনীয়। ফলে নতুন অভিবাসনের বিষয়ে ট্রাম্পের মতো কঠোর না হলে বাইডেন আমলে বাংলাদেশিরা নতুন করে অভিবাসী হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আশাবাদ জাগা স্বাভাবিক।

বাইডেনের নেয়া বেশ কিছু বৈশ্বিক নীতিমালার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর আপনাআপনিই পড়বে। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স-জিএসপির কথা। জিএসপি হলো বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম মার্কিন বাণিজ্য অগ্রাধিকার কর্মসূচি, যা রফতানিকারক দেশগুলোর বিভিন্ন পণ্যের ওপর থেকে শুল্কবাধা সরিয়ে দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে সহযোগিতা করে।

এর লক্ষ্য বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর অনেককে বাণিজ্যসুবিধা প্রদান করার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এবং দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দেওয়া। সেই বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া জিএসপি সুবিধার হকদার বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের ভাগ অনুসারে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং জাতিসংঘের শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে একটি স্বল্পোন্নত দেশ।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে ২০২৪ সালে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। তারপর আরও তিন বছর স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবে। তবে ২০২৭-এর পর স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে প্রদত্ত সুবিধাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মসৃণভাবে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যসুবিধা বাংলাদেশের জন্য উপকারী।

কিন্তু, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভাগ্যাহত। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৩-এর ২৭ জুন বাংলাদেশের জন্য জিএসপি স্থগিত করেছে এবং সেটি ২০১৩ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর কার্যকর করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ভবন ধসের পরে শ্রম অধিকার এবং সুরক্ষাসম্পর্কিত সমস্যার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত কয়েকটি সমস্যা পূরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। তবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বাণিজ্য অগ্রাধিকার স¤প্রসারণ আইন ২০১৫-তে স্বাক্ষর করলে জিএসপি সুবিধাভোগী দেশগুলোর তালিকায় জায়গা হয়নি বাংলাদেশের। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা কাঠামো-টিকফা চুক্তি করেছে।

এই টিকফা চুক্তি জিএসপি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি মাধ্যম হতে পারে বলে আশা ছিল বাংলাদেশের। তবে, সেই আশা মেটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মেগা বাণিজ্য চুক্তি বা ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ-টিপিপি চুক্তিও এখানে প্রাসঙ্গিক। এই বাণিজ্য চুক্তিটি হয়েছিল ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারিতে। ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে চুক্তিটি বাতিল করে।

এই চুক্তির ১২টি সদস্যরাষ্ট্র বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশ দখল করে আছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উরুগুয়ে রাউন্ডের পর টিপিপি ছিল বৃহত্তম বাণিজ্য চুক্তি। নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর মাধ্যমে টিপিপি স্বাক্ষরকারী দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে প্রত্যাশা করেছিল। তা-ও পূরণ হয়নি।

টিকে থাকতে এর বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স আরও জোরদার করেছে। কমপ্লায়েন্স উন্নত করতে ক্রেতারাও তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ কারখানাগুলোতে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দেওয়া হয়েছে। এ বিবেচনায় বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে বিশেষ প্রাপ্তি আশা করতেই পারে বাংলাদেশ।

করোনার ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং এই অতিমারী কাটিয়ে ওঠার জন্য ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরে আসার জেরেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব এবং প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশা করতে পারে বাংলাদেশ। বিশেষ কিছু না হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাইডেন সরকারের কাছে এ ধরনের কিছু গড়পড়তা আশা রাখতেই পারে।

এগুলো ভ‚রাজনৈতিক ভারসাম্য মাথায় রেখে নেওয়া বাইডেনের পদক্ষেপও বাংলাদেশের কল্যাণ আনতে পারে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও ভ‚রাজনৈতিক অবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশের বিশেষ তাৎপর্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও আলাদা গুরুত্বের।

সবমিলিয়ে আশা করতে কোনো সমস্যা নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার এ পালাবদল নানা দিক থেকে কিছু সুবিধা দিতে পারে বাংলাদেশকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর অনেকটা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ক‚টদক্ষতার ওপর।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।






ads
ads