মধুতীর্থ সাগরদাঁড়ী ও কবি মধুসূদন


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১৫:০৫,  আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১৫:১১

আজ ২৫ জানুয়ারি বাংলা অমৃত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৭তম জন্মজয়ন্তী। প্রতিবছর ঘটাকরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিনটি উদ্যাপিত হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর করোনার কারণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছাড়া আর কোনো অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে না বলে জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। প্রতি বছর সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত হতো মধু জন্মজয়ন্তী।

পৃথিবীতে এমন খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিকের সংখ্যা কম নয়, যাদের খ্যাতি ও ব্যক্তিত্বের স্মারকে তাদের জন্মভূমিও বিশ্বখ্যাতি পেয়ে থাকে। তাই যশোরের কেশবপুর সম্পর্কে লিখতে গেলে প্রথমেই যে নামটি নমস্য, তিনি হলেন বাংলার মহাকবি ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা রেনেসাঁসের অন্যতম প্রাণপুরুষ, বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার অগ্রদূত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। যার জন্মভূমি কপোতাক্ষ নদের তীরের সাগরদাঁড়ী আজ বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত গ্রাম। মধুভক্ত মানুষের কাছে এ এক তীর্থভ‚মি। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এই গ্রামের বিখ্যাত দত্ত পরিবারে মধুসূদন জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জমিদার ও আইনজীবী রাজনারায়ণ দত্ত, মাতা জাহ্নবী দেবী।

জমিদার পুত্র হয়েও অগোছালো জীবনযাপনের কারণে তিনি যেমন চরম দুঃখ দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করেছেন; তেমনি বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কাব্য, নাটক রচনা করে খ্যাতির শিখরে উঠেছেন। তার ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাঙালির প্রথম সার্থক মহাকাব্য। যার গ্রহণযোগ্যতা আজও অম্লান হয়নি। মধুসূদন বাংলা সাহিত্যে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের স্রষ্টা। সর্বপ্রথম সার্থক নাটক, প্রহসন রচয়িতা। প্রথম পত্রকাব্যকার। প্রথম সার্থক ছান্দনিক কবি। তিনি বাংলাসহ বারোটি ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারতেন। তিনিই আমাদের প্রথম বহুভাষাবিদ পণ্ডিত কবি। প্রথমে বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করে ইংরেজি ভাষায় কাব্যচর্চা করতেন। ইংরেজি ভাষায় তার প্রথম কাব্য ‘ঞযব ঈধঢ়ঃরাব খবধফর’। পরে তার মোহভঙ্গ হয়। বাংলা ভাষায় তার সাহিত্যচর্চা মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর। এই সামান্য সময়ে তিনি রচনা করেন ‘শর্ম্মিষ্ঠা নাটক’, ‘পদ্মাবতী নাটক’, ‘কৃষ্ণকুমারী নাটক’ নাটক ‘মায়াকানন’; প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’; ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। কাব্য ‘তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য’, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’, ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’, ‘চতুর্দ্দদশপদী কবিতাবলি’। আরও কিছু কাব্য ও নাটক অসমাপ্ত অবস্থায় আছে।

মধুসূদনের লেখাপড়া শুরু হয়েছে গ্রামের পাঠশালায় এবং পরিবারে। তার পারিবারিক শিক্ষকের নাম হরলাল রায়। অতঃপর সাগরদাঁড়ীর পার্শ্ববর্তী শেখপুরা গ্রামে একজন ফারসি ভাষায় পণ্ডিত একজন মৌলভী শিক্ষকের কাছে ফারসি শিখেছেন। এই শিক্ষকের নাম খন্দকার মখমল আহমেদ। তিনি কলকাতা মাদ্রাসার অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। এই শিক্ষকের কাছে ফারসি শিখতে আসতেন কপোতাক্ষ পাড়ের আর একজন কৃতী সন্তান প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের পিতা হরিশচন্দ্র রায়। কেউ কেউ বলে থাকেন এই শিক্ষকের নাম মুফতী লুৎফুল হক। মধুসূদনের এই শিক্ষক শেখপুরা মসজিদের ইমাম ছিলেন। কথিত আছে বালক মধুসূদনকে তিনি এই মসজিদের আঙ্গিনায় বসে ফারসি শেখাতেন। মধুসূদনের পৈতৃক বাড়ির পাশাপাশি এই মসজিদটিও বতর্মানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আওতাধীন। মধুসূদন আরো বিদ্যার্জন করেছেন কলকাতার লালবাজার গ্রামার স্কুল, হিন্দু কলেজ ও বিশপস কলেজে। লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয় গ্রেজ ইন থেকে ব্যারেস্টারি শিক্ষা সমাপ্ত করেন।

মধুসূদন হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে বিলেত যাবার বাসনায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ১৮৪৩ সালে ধর্মান্তরের পর শ্রী মধুসূদন দত্তের আগে মাইকেল পদবি যোগ হয়ে তিনি হন মাইকেল মধুসূদন।

জীবনে দুজন নারীর সঙ্গে বসবাস করেছেন। প্রথম জন ইংরেজ কন্যা রেবেকা ম্যাকটাভিস, দ্বিতীয় জনও ইংরেজ কন্যা হেনরিয়েটা হোয়াইট। উল্লেখ্য, স্ত্রী রেবেকা ম্যাকটাভিসের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স হয়নি। তেমনি হেনরিয়েটার সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক বিয়েও হয়নি। মধুসূদনের বংশধরেরা কেউ লন্ডন, কেউ অস্ট্রেলিয়ায়, ভারতে। তার প্রপৌত্রী টেনিস খেলোয়াড় জেনিফার পেজ কলকাতা পিজি হাসপাতালে ডাক্তার ছিলেন। তৎপুত্র লিয়েন্ডার পেজ ভারতের বিখ্যাত টেনিস তারকা। সাগরদাঁড়ীতে বসবাস করেন মধুসূদনের পিতৃকুলের একটি পরিবার।

মাত্র নয় বছর বয়সে মধুসূদন সাগরদাঁড়ী ছেড়েছেন। তার পরে দুএকবার এসেছেন। কিন্তু তার জন্মভূমিকে কখনও ভোলেননি। তার রচনায় বারবার ফিরে এসেছে সাগরদাঁড়ীর প্রকৃতি ও অনুষঙ্গ। প্রবাস জীবনে সুদূর ভার্সাই নগরীতে বসেও বাড়ির পাশ দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন।

যশোর শহর থেকে ষাট কিলোমিটার দক্ষিণে কেশবপুর সদর থেকে মাত্র তেরো কিলোমিটার পিচঢালা পথ চলে গেছে সাগরদাঁড়ী দত্ত বাড়ি পর্যন্ত। যেখানে কবি মধুসূদন দত্তের অনেক স্মৃতিই বহন করে চলেছে দত্ত পরিবারের ঐতিহ্যবাহী ভবন, কাছারি ঘর, দেবমন্দির আর পুরনো ইট-সুরকি। এখনও তাদের পারিবারিক পূজা মণ্ডপ, পুকুর এবং বাড়ির কিছু অংশ উš§ুখ হয়ে তাকিয়ে আছে। কবির জন্মগৃহটি কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেলেও তুলসী গাছ লাগিয়ে জায়গাটি চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। অন্যান্য ভবন, স্থাপনা সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ হলেও জন্মগৃহটি এখনও অযত্নে পড়ে আছে। প্রশ্ন জাগে, মধুসূদন কি খোলা আকাশের নিচে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৬৯ সালে কবির স্মৃতিরক্ষার্থে দত্ত বাড়ি পুনঃসংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের হাতে ন্যস্ত হয়। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মধুসূদনের বাড়ি, তৎসংলগ্ন স্থাপনাকে মধুপল্লী হিসেবে ঘোষণা দেন। ফলে মূল বাড়িটি এখন সংরক্ষিত এবং বাড়িটি জাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে মধুপল্লী উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। মধুসূদনের পরিত্যক্ত পৈতৃক বাড়িতে ব্রিটিশ আমলেই পরিচালিত হতো প্রাথমিক বিদ্যালয়। পরে সেই ত্রিতল ভবন ভেঙে নতুন স্কুল নির্মাণ করা হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে পোস্ট অফিস। দত্তবাড়ির ভেতরে বিদ্যালয় ও পোস্ট অফিস মধুপল্লীর অঙ্গহানির দৃষ্টান্ত বলে মনে হয়। অবিলম্বে পোস্ট অফিস ও বিদ্যালয়ের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে মধুপল্লী থেকে সরিয়ে অবলুপ্ত ভবন নির্মাণ করা হোক, এটা দর্শনার্থী ও মধুভক্ত এলাকাবাসীর দাবি। দত্তবাড়ির সীমানা প্রায় ৫ একর। এখানে ৩১ কক্ষ বিশিষ্ট পাঁচটি দালান ছিল। মূল বাড়ির আদল রক্ষা করে দত্তবাড়ির ঐতিহ্যকে রক্ষা করা প্রয়োজন।

দত্তবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মধুসূদনের জ্যাঠতুতো ভ্রাতা আনন্দমোহন দত্তের কন্যা রবীন্দ্রযুগের প্রখ্যাত কবি মানকুমারী বসু। তার বাড়ি ও জন্মগৃহ মধুসূদনের বাড়ির সঙ্গে একীভ‚ত হয়ে আছে, যা শনাক্ত করে মানকুমারী বসুর স্মৃতি রক্ষা করাও প্রয়োজন বলে মনে করি। ১৯৩৯ সালে মানকুমারী বসুর উদ্যোগে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘মাইকেল মধুসূদন মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’। একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রে তা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দত্তবাড়ির অনেক জমিজমা এখনও বেদখল অবস্থায় আছে, এমনটা অনেকে মনে করেন। যদি থাকে, সেগুলো উদ্ধার করে মধুপল্লীর সঙ্গে একীভূত করা হোক।

মধুসূদন কবিতা লিখেছেন কপোতাক্ষ নদ, নদী তীরে বটবৃক্ষ নিয়ে, দ্বাদশ শিবমন্দির, উদ্যানে পুষ্করিণীসহ অনেক বিষয় নিয়ে। যেগুলো এখনও বিদ্যমান, যা সংরক্ষণ করা অতীব জরুরি। কবির স্মৃতিবাহী কপোতাক্ষ নদ আজ মৃতপ্রায়, স্রোতহীন। পুনঃখননের জন্য বারবার অর্থ বরাদ্দ হলেও আশানুরূপ ফল আসেনি। এর জন্য প্রয়োজন মেগা পরিকল্পনার। মধুসূদনের স্মৃতিরক্ষা ও চর্চার জন্য সাগরদাঁড়ীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেসরকারি সংস্থা ‘মধুসূদন একাডেমি’। যার আওতায় মিউজিয়াম, সংগীত প্রশিক্ষণ, নাট্যচর্চা, প্রকাশনা অব্যাহত আছে। এটিকে পূর্ণাঙ্গ মধুসূদন গবেষণাগার হিসেবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক সাগরদাঁড়ীতে বেড়াতে আসেন। তাদের থাকার কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। পর্যটন কর্পোরেশনের একটি ছোট মোটেল আছে। যা পর্যটকদের তুলনায় অপ্রতুল। এখানে গড়ে উঠতে পারে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন অসংখ্য পিকনিক পার্টি এলেও কোনো পিকনিক কর্নার এখানে গড়ে ওঠেনি। জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পিকনিক স্পট থাকলেও তা খুবই সীমিত। জেলা পরিষদ নির্মিত অর্ধশত বছরের একটি ডাকবাংলো ছিল। যেটিকে ভেঙে আধুনিক ডাকবাংলা নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও তা অজানা কারণে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে স্থগিত হয়ে আছে।

১৮৭৩ সালে মধুসূদনের মৃত্যুর পর থেকেই সাগরদাঁড়ীতে কবির জন্মদিন উদযাপন হয়ে আসছে। প্রথমে একদিনে অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কালে কালে সেই ‘মাইকেল উৎসব’ বা ‘মধুজয়ন্তী’ পরিণত হয়েছে মধুমেলায়, যা কবির জন্মদিন ২৫ জানুয়ারি থেকে সপ্তাহব্যাপী আলোচনা, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচ, লোকজ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চলে। অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য যশোর জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত হয়েছে ‘মধুমঞ্চ’। তৎসংলগ্ন ভবনকে কালচারাল একাডেমি হিসেবে সাইনবোর্ডে উল্লেখ করলেও কোনো কালচালার কার্যক্রম পরিচালিত হতে দেখা যায় না। এটি শুধুমাত্র মধুমেলায় আমন্ত্রিত অতিথি, অভ্যাগতদের অবস্থান ও আপ্যায়নের জন্যই ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

বিলেত যাবার আগে ১৮৬২ সালে মধুসূদন পুত্র কন্যাসহ স্ত্রী হেনরিয়েটাকে নিয়ে সাগরদাঁড়ী আসেন। তখন মধুসূদনের পিতা, মাতা দুজনেই পরলোকগত। সাগরদাঁড়ীর দত্তবাড়িতে থাকতেন তার বিমাতা প্রসন্নময়ী দেবী। যে বিমাতার ভরণ-পোষণের খরচ পাঠাতেন মধুসূদন। জানা যায়, সাগরদাঁড়ী এলে বিমাতা এবং তার জ্ঞাতি, আত্মীয়রা দত্তবাড়িতে ধর্মত্যাগী মধুকে প্রবেশ করতে দেননি। কথিত আছে, তখন কপোতাক্ষ তীরে তাঁবু খাটিয়ে মধুসূদন পরিবারসহ সাতদিন রাত্রিযাপন করেন। তারপর বজরায় ফিরে যান। যে ঘাট থেকে তিনি বিদায় নিয়েছিলেন, সেটি ‘বিদায়ঘাট’ নামে পরিচিত। এই স্থানে শিলালিপিতে খোদিত আছে বিখ্যাত ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতাটি। সেই বিদায়ঘাটটি পড়ে আছে অযত্ন অবহেলায়। রাতে সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা জমে। প্রতœতত্ত¡ অধিদফতর বা জেলা পরিষদ কারো কোনো দেখভাল নেই বিদায় ঘাটের। দত্তবাড়ির আঙ্গিনায় ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মধুসূদনের আবক্ষ ভাস্কর্য। যেটি তৈরি করেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন বিখ্যাত ভাস্কর্য শিল্পী শশীভ‚ষণ পাল। এটিই শশীভূষণের শেষ কাজ। অসুস্থাবস্থায় তিনি এ কাজটি করেন। পরের বছর ১৯৪৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই ভাস্কর্য ও কপোতাক্ষ তীরে বিদায়ঘাটের শিলালিপি তৎকালীন কলকাতা সেন্ট্রাল কোঅপারেটিভ ব্যাংকের অর্থসাহায্য ও তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর একটি ভাস্কর্য এখানে আছে; মধুসূদনের জন্মমৃত্যু স্মারকলিপি স্তম্ভের ওপর নব্বই দশকে শিল্পী বিমানেশ মণ্ডল (যিনি ভাস্কর্য শিল্পী নন) স্থাপন করে দিয়ে যান। যেটিকে ভাস্কর্য না বলে মধুসূদনের একটা খারাপ মূর্তির দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা যায়। ব্রিটিশকালে প্রতিষ্ঠিত এই স্মারক স্তম্ভের ওপর, স্তম্ভের চূড়া ভেঙে কিভাবে, কার আদেশে এই অপমূর্তি স্থাপিত হয়েছে, সেটা কেউই বলতে পারেননি।

এরপর আজ থেকে দশ বছর আগে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অগ্রণী ব্যাংকের অর্থসাহায্যে এখানে একটি মধুমূর্তি তৈরি করা হয়। যেটা কোনো মূর্তি বা ভাস্কর্য কোনো সংজ্ঞাতেই নির্দিষ্ট করা যায় না। স্থল আকৃতির এই মূর্তি নিয়ে শিল্পবোদ্ধা ও রুচিশীল পর্যটকরা বারবারই তাদের আপত্তির কথা জানিয়ে যান। সাগরদাঁড়ীতে কবির একটি রুচিশীল পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য স্থাপন করে কবির প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করা প্রয়োজন বলে মধুভক্তরা মনে করেন। কপোতাক্ষ পাড়ে রয়েছে মধুর স্মৃতিছোঁয়া একটি কাঠবাদাম গাছ। এলাকার লোকেরা বলেন, এই গাছের নিচে বসেই কবির কবিতা লেখার হাতেখড়ি হয়েছে। অনেকের মতে এ ধারণা ভুল। এটা নিছক কিংবদন্তি অথবা গালগল্প। তবে গাছটি কত বছরের পুরানো তা সঠিক বলা মুশকিল। বাঙালির আত্মপরিচয় পৃথিবীর কাছে তুলে ধরেছিলেন মধুসূদন। তার স্মৃতি নিয়ে সাগরদাঁড়ীতে একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। সারাদেশে খ্যাতিমান মনীষীদের চারণভূমিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের সর্বপ্রথম দেশপ্রেমিক, অসাম্প্রদায়িক, বাঙালি জাতীয়তাবাদের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মধুসূদন দত্তের নামে তার জন্মভূমি সাগরদাঁড়ীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি শুধু সাগরদাঁড়ীবাসীর নয়, সমগ্র দেশবাসীর। ২০১০ সালে যশোরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘মাইকেল মধুসূদনের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।’ আমরা জানি না, প্রধানমন্ত্রীর সেই সদিচ্ছা আলোর মুখ কেন দেখল না! প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণাই বাস্তবায়িত হোক, এটা এখন সময়ের দাবি।






ads
ads