উন্নয়নতন্ত্র-গণতন্ত্র বিতর্ক ও উপেক্ষিত জনতন্ত্র


poisha bazar

  • ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১৪:৫৩,  আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১৭:৪৮

ধরুন, আপনি একটি পর্দার অন্তরালে আছেন, যার অপর পাশে আছে বাস্তব সমাজ এবং আপনি পর্দার অন্তরাল থেকে বেরিয়ে ওই বাস্তব সমাজে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, যেখানে আপনি আপনার জীবনকে যাপন করবেন। কিন্তু ওই বাস্তব সমাজে আপনার অবস্থান কি হবে তা আপনি জানেন না, অর্থাৎ আপনি আপনার পেশা, লিঙ্গ, শারীরিক গঠন, শিক্ষা, সর্বোপরি সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে অজ্ঞ।

এখন ভাবুন তো এ রকম বাস্তবতায় পর্দার অন্তরালে থেকে আপনি কি ধরনের সমাজ ব্যবস্থা আশা করবেন, কিংবা সমাজে যেটুকু সম্পদ ও সম্ভাবনা রয়েছে তার বণ্টন কিভাবে চাইবেন? যেখানে আপনি জানেন না আপনার ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে সেখানে আপনি প্রথমেই কোন কোন বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবে পেতে চাইবেন? অবশ্যই আপনি ওই বিষয়গুলো প্রথমেই নিশ্চিতভাবে পেতে চাইবেন যা আপনার জীবন ধারণ তথা বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। আপনি নিশ্চয়ই বলবেন না যে, প্রথমেই আমার রাজনীতি করার অধিকার চাই, কিংবা চাই সভা, সমিতি বা সংগঠন করার অধিকার।

কিংবা আপনি হয়তো এমন সমাজ ব্যবস্থাও চাইবেন না যেখানে আপনাকে সমাজে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় ছেড়ে দেয়া হবে, যেখানে যোগ্যরা সম্পদ অর্জন করবে আর অযোগ্যরা অভুক্ত থাকবে। আপনি এটা চাইবেন না, কারণ, হতে পারে বাস্তব সমাজে প্রবেশ করে দেখলেন আপনি নিরক্ষর কিংবা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, ফলে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অক্ষম। তাই এরকম বাস্তবতায় আপনি আপনার বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পেতে চাইবেন, আর তা হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা।

এই মৌলিক প্রয়োজনগুলো নিশ্চিত হওয়ার পরই আপনি অন্যান্য প্রয়োজন বা যোগ্যতা - অযোগ্যতার মানদণ্ডগুলো ঠিক করার কথা ভাববেন। এটাই যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত। অর্থাৎ মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রশ্নে একজন মানুষের যোগ্যতা - অযোগ্যতা, প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা-অক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। যোগ্যতা-অযোগ্যতা, কিংবা অধিক পরিশ্রম করার মানসিকতা হয়তো মৌলিক প্রয়োজনের বাইরে ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জন করার প্রশ্নে বিবেচিত হতে পারে।

উপর্যুক্ত কাল্পনিক পরিস্থিতিটাকে এখন আমরা আমাদের মহান স্বাধীনতা ও ১৯৭২ সালে লিখিত সংবিধানের সঙ্গে এক করে একটি তুলনামূলক আলোচনার প্রয়াস নেব। এই প্রয়াস আমাদেরকে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশ ও দেশ চালনায় তৎপরবর্তীতে ১৯৭২ সালে যে সংবিধান আমরা পেয়েছি ও বণ্টন ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছি তা কতটুকু যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত সে বিষয়টি বুঝতে সহযোগিতা করবে।

উপর্যুক্ত কাল্পনিক পরিস্থিতির আলোকে ভেবে দেখুনতো, সদ্য স্বাধীন একটি দেশের জন্য সংবিধান তথা নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য লিপিবদ্ধ করতে বসে আপনি কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিবেন? আপনিসহ অন্যান্য সকল নাগরিকের কোন ধরনের অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা সবার আগে পেতে চাইবেন? আপনি নিশ্চয়ই প্রথমে এমন রাষ্ট্রীয় বণ্টন ব্যবস্থা চাইবেন যা যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্বিশেষে নাগরিকদের জীবন-ধারণের জন্য ন্যূনতম উপকরণগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করবে।

কিন্তু আমাদের সদ্য স্বাধীন দেশ, সংবিধান আমাদেরকে জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যক খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি প্রয়োজনগুলোকে অপরিহার্য বিবেচনা করে এগুলোর কোন আইনগত নিশ্চয়তা প্রদান করেনি। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৭ থেকে ৪৩ নং অনুচ্ছেদ পর্যন্ত বর্ণিত অধিকারগুলো নাগরিকদের মৌলিক অধিকার যা আইনগতভাবে স্বীকৃত।

অর্থাৎ রাষ্ট্রে যদি কোন নাগরিক এই অধিকারগুলো চর্চা করতে না পারেন তাহলে তিনি হাইকোর্টে রিট করে এর প্রতিকার চাইতে পারেন। এই অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সভা, সংগঠন ও সমিতি করার অধিকার, ভোট দেয়ার অধিকার, রাজনীতি করার অধিকার ইত্যাদি।

অন্যদিকে একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে জিনিসগুলো অপরিহার্য তার কোন আইনগত অধিকার সংবিধান তার নাগরিকদের প্রদান করেনি। অর্থাৎ আপনি রাজনীতি করতে না পারলে রাষ্ট্রকে আইনগতভাবে জিজ্ঞেস করতে পারবেন আপনার রাজনীতি করার অধিকার নাই কেন, আমার এই অধিকার চাই। কিন্তু আপনি অভুক্ত থাকলে কিংবা প্রচণ্ড শীতে বস্ত্র না থাকলে, চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থা না থাকলেও আপনি কখনোই বলতে পারবেন না আমার খাবার নাই কেন, বস্ত্র নাই কেন, চিকিৎসা নাই কেন।

অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্র আপনাকে খাবার, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা দিতে বাধ্য নয়। নাগরিকদের এসকল মৌলিক প্রয়োজনের প্রশ্নে রাষ্ট্র পুঁজিবাদী, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের অসম প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়। জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে নাগরিকরা নিজেদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় যা তাদের জীবনকে বিষিয়ে তোলে। বলতেই হয়, যেখানে জীবন ধারণের ন্যূনতম উপকরণের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে রাজনীতি- সভা করার সাংবিধানিক অধিকার নাগরিকদের প্রতি উপহাস মাত্র।

তাহলে ভাবুন তো এত রক্ত, এত প্রাণের বিনিময়ে যে সংবিধান আমরা পেলাম তা কে বানালো, কার জন্য বানালো! এই সংবিধান কি বাংলাদেশের সকল মানুষকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছে, সকলকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে? নিশ্চিতভাবেই পারেনি। এই না পারার পেছনের কারণটা ঐতিহাসিক। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যুগ যুগ ধরে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বিভিন্ন সময়ে দেশি- বিদেশি রাষ্ট্রীয় শক্তি ও অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।

এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই জনগণকে কাছে টেনেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত, নিষ্পেষিত, অবহেলিত জনগণও নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনের আশায় আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। সর্বশেষ ১৯৭১ সালেও তাই হয়েছে। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ, কৃষক, মুটে-মজুর মুক্তিসংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে কিন্তু নেতৃত্ব দিয়েছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই শ্রেণিই যখন সদ্য স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়ন করতে বসেছে তখন তারা শ্রেণি স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছে।

তাই তাদের কাছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার নিশ্চয়তা অতটা গুরুত্ব পায়নি, যতটা পেয়েছে রাজনীতি, সভা, সংগঠন করার অধিকার। মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল তাই হয়তো তৎকালীন বৈশ্বিক বাস্তবতায় ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি ১৯৭২ সালের সংবিধানে না চাইলেও অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে কিন্তু এর কোনো বাস্তব প্রতিফলন কখনো দেখা যায়নি।

সংবিধানে সমাজতন্ত্র কিংবা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার যাই থাকুক না কেন তাতে কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষের জীবন-মানের পরিবর্তন হয়েছে সামান্যই। অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার পালাবদল কিংবা ভাঙা-গড়ায় যতটুকু সুযোগ তৈরি হয়েছে তা ভোগ করেছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, সমাজের মৌলিক কাঠামো কিংবা নিম্নবর্গের মানুষের জীবনমানের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি।

রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড ও নীতিগত প্রবণতা স্পষ্টভাবেই ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে বঞ্চিত রেখে কিছু মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের পক্ষেই। আরো মারাত্মক ব্যাপার হল এই অবস্থা থকে উত্তরণের যে প্রচেষ্টা কিংবা আলোচনা-সমালোচনা তা অলক্ষ্যে কিছু সংখ্যক মানুষেরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট। যেমন সম্প্রতি আমাদের আলোচনা ও বিতর্কের বিষয় হল : আমরা কি উন্নয়ন চাই, নাকি গণতন্ত্র! যে পক্ষ উন্নয়নের দোহাই দেয় তাদের কথা হল, গরিব রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এবং আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি।

সুতরাং আমরা সঠিক পথেই আছি। কিন্তু এই উন্নয়নের ফল রাষ্ট্রের ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে কিনা, নাকি এর সুবিধা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষই পাচ্ছে যা ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করছে সে বিষয়টি বিবেচ্য নয়। অন্যদিকে যারা বলছে উন্নয়নের চেয়ে গণতন্ত্র বেশি গুরুত্বপূর্ণ তারাও কিন্তু ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মুক্তি কিংবা রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনে আগ্রহী নয়।

তাহলে বাস্তবতা কি দাঁড়াল? বাস্তবতা এরকম দাঁড়াল যে, উন্নয়নতন্ত্রী কিংবা গণতন্ত্রী যারাই জয়লাভ করুক না কেন, ব্যাপক সংখ্যক জনগণ কিন্তু হেরেই যাচ্ছে। কারণ এদের কেহই রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন-মানের মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলছেন না। সোভিয়েত ইউনিয়নের জনক লেনিন বলেছিলেন দাস ব্যবস্থার অধীনে থাকলে তিন ধরনের মানুষ তৈরি হতে পারে।

একদল থাকে যারা অসচেতন, তারা জানে না যে তারা পরাধীন। এরাই প্রকৃত দাস এবং এদের সংখ্যাই সর্বাধিক। আরেক দল থাকে যারা সজ্ঞানে নিজেদের অবস্থানকে মেনে নেয়, নিজেদের পরাধীনতাকে উপভোগ করে, এরা চাটুকার ও পরগাছা। এদের অধিকাংশই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং এরা বিভিন্ন আবেদন-নিবেদন, তোষামোদি, রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ইত্যাদির আলোকে শাসক শ্রেণির কাছাকাছি থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায় ও ভোগ করে।

এই দুই দলের বাইরে ভিন্ন একটি দল থাকে যারা সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু তারা পরাধীনতাকে পরাধীনতা বলেই চিনে এবং এই পরাধীন বাস্তবতার জোয়ালটাকে ঘাড় থেকে ফেলে দিতে চায়। এদের মধ্যে আবার দুটি পক্ষ থাকে, একপক্ষ কেবল স্বাধীনতাই চায়, রাষ্ট্রের চরিত্রের কোন মৌলিক পরিবর্তন চায় না। অন্যপক্ষ স্বাধীনতার পাশাপাশি মুক্তি ও সমাজের মৌলিক পরিবর্তনও চায়। বলা বাহুল্য শিক্ষিত মধ্যবিত্ত স্বীয় শ্রেণিস্বার্থ সংরক্ষণের তাগিদেই সংবিধান তৈরি করেছে, তারা স্বাধীনতা চেয়েছিল ঠিকই কিন্তু মুক্তি ও সমাজের মৌলিক পরিবর্তন চায়নি। তাই সংবিধানে এই শ্রেণিস্বার্থই রক্ষিত হয়েছে।

তাই আন্দোলন সংগ্রাম ও লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি তা আমাদেরকে কতটুকু মুক্তি দিতে পেরেছে কিংবা রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের কতটুকু বদল ঘটিয়েছে তা ভেবে দেখতে হবে। স্বাধীনতার সবটুকু অর্জন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির পকেটে গিয়েছে কিনা তাও ভাবতে হবে। যদি তাই হয়ে থাকে তবে বলতে হবে আমরা স্বাধীন হয়েছি, মুক্ত হইনি।

স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের স্লোগান নিয়ে গঠিত সংবিধানে মূলত শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিফলন ঘটেছে। এই সংবিধান রাষ্ট্রকে পরিবার ও সমাজের উপরে স্থান দিয়েছে, যেন পরিবার ও সমাজের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এখানে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় স্বার্থই প্রধান। একটি রাষ্ট্রের কি প্রয়োজন সে বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে, ব্যক্তি ও পরিবারের প্রয়োজনের দিকটি থেকেছে উপেক্ষিত।

আবার সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রস্বার্থ হিসেবে মূলত শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে পরিবার, সমাজ ও ব্যাপক সংখ্যক মানুষের স্বার্থ গুরুত্বহীন থেকেছে। আলোচ্য সংবিধান মূলত সমাজের তুলনায় রাষ্ট্রকে অধিকতর শক্তিশালী করে এদের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে তীব্রতর করেছে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক মানুষের মধ্যে পার্থক্য করে মানুষের সারাংশকে রাষ্ট্রে আরোপ করেছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলোতে যে নাগরিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা কাল্পনিক সত্তার অধিকার, অবাস্তব মানুষের অধিকারে পরিণত হয়েছে, রক্তমাংসের বাস্তব মানুষের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

যে সংবিধান আমরা বানিয়েছি তা আমাদেরকে এমন এক আর্থ-সামাজিক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে যেখানে ‘প্রবৃদ্ধি তথা জিডিপি বৃদ্ধির হার’ দেশের মোট সম্পদ বৃদ্ধি কিংবা অর্থনীতির ভালো-খারাপ পরিমাপের মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। অথচ উচিত ছিল ‘সম্পদের সুষম বণ্টন ও বৈষম্য হ্রাস’কে অর্থনীতির ভালো-মন্দ নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা।

মুক্তির কথা বলে বর্তমান রাষ্ট্র আসলে ব্যক্তি ও শ্রেণিস্বার্থ সংরক্ষণেরই সুযোগ করে দিয়েছে এবং সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষকে বিভ্রান্তি ও সীমাহীন দৈন্যে পতিত করেছে। সমাজে এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে ব্যক্তিগত স্বার্থপরতায় এবং মুনাফা ও অর্থের জন্য অপরিসীম লোভে যা মানুষের পারস্পরিক স্বাভাবিক সম্পর্ককে বিকৃত করে নিছক আর্থিক সম্পর্কে পরিণত করেছে। সমস্ত কিছুর মূল্য বিচার হয় অর্থের মাপকাঠিতে। এই অর্থকে আমরা বাইরের শক্তি বলে মনে করি।

কিন্তু এই অর্থ ও পুঁজির জয়জয়কার যে আমাদের গঠিত রাষ্ট্র ও সংবিধানের পৃষ্ঠপোষকতার ফল এই সত্য আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, রাজনীতির মোড় ফেরাবার সুযোগ ইতিহাসে মাঝেমধ্যে আসে- মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন দেশ আমাদের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে এ রকম একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু সে সুযোগকে কাজে লাগাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।

ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি একটি পুঁজিতান্ত্রিক দেশ, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিষ্পেষিত, বঞ্চিত। অথচ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সম্পদের সুষম বণ্টন ও বৈষম্য হ্রাসকে রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করতে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হওয়ার, কিংবা উৎপাদনের যাবতীয় অধিকার সরকার বা রাষ্ট্রের হাতে কুক্ষিগত করার প্রয়োজন ছিল না। তা সত্তে¡ও সে সুযোগকে আমরা কাজে লাগাতে পরিনি।

তাই বর্তমান বাস্তবতা থেকে মুক্তির উপায় হলো সংবিধানের পুঁজিতান্ত্রিক চরিত্র তথা রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, সমাজে সুবিধা যাদের হাতে থাকে, তারা সেই সুবিধা টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ে যাবে, সেটা স্বাভাবিক। বিদ্যমান বাস্তবতায় যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উপেক্ষিত, নিষ্পেষিত, সেহেতু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামগ্রিক মুক্তির আকাক্সক্ষা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

এই যাত্রাপথে অংশগ্রহণ করতে হলে আমাদের মধ্যে যে ‘সামগ্রিক অচেতন’ (Collective Unconscious) রয়েছে তার ধরন ও বাস্তবতা বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, মানুষ পরিস্থিতির তৈরি, তবে সেই পরিস্থিতিও মানুষের তৈরি। নিজ এবং নিজ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা মানুষকে অন্যান্য জীবন্ত জিনিস থেকে আলাদা করেছে।

আর সচেতনতা অনুযায়ী নিজেদের কাজ ঠিক না করলে মানুষ হওয়া যায় না। তাই এই সচেতনতা বিনির্মাণে প্রয়োজন ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণ এবং নিজেদের মধ্যে এই বিশ্বাস স্থাপন যে, পুঁজিবাদের মতো অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে টাকা ও সম্পত্তির বাসনা প্রধান আকাক্সক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়; অন্য রকম অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একদম উল্টো বাসনা জন্মাতে পারে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)।






ads
ads