• বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১
  • ই-পেপার

ভ্যাকসিন নিয়ে চলছে রাজনীতি-কূটনীতি

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার - সংগৃহীত

poisha bazar

  • রিন্টু আনোয়ার
  • ১২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০৭

দেশে মহামারী করোনা কেবল স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশা নয়, গোটা খাতটিকে আংশিক দিগম্বর করে ছেড়েছে। এ খাতে চুরি-চামারি, দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনার কিছু চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে মাত্র। মালেক, আবজাল, সাহেদ, সাবরিনার বাইরে যে আরো কত কী রয়েছে নানা ঘটনার তোড়ে সেগুলো এখনো অজানা। এর মাঝেই করোনার টিকা বা ভ্যাকসিন নিয়ে চলছে আরেক অ্যাপিসোড।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অসুস্থ হবার পর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ভারত থেকে ডাক্তার দেবী শেঠি এসে ফিরে যাবার সময় বলেছিলেন, শাহবাগে এক টুকরো ইউরোপ দেখলাম। আর সেই হাসপাতালেই এক বছর পর একই ব্যবস্থাপনার অধীনে আরেক ব্যক্তি যখন কোভিড পরীক্ষা করতে গেলেন, তাকে লেপ-তোষক নিয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকতে হলো। এটাই বাস্তবতা। দুই ঘটনায় কত অমিল। কত তথ্য এবং বিশ্লেষণের রসদ।

করোনার চিকিৎসা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য খাতে যন্ত্রপাতি কেনাকাটার ফাঁস হওয়া কিছু ঘটনা রূপকথাকেও হার মানায়। মানুষ তাজ্জব হয়। ক’দিন কিছু ধরপাকড় ও হম্বিতম্বি চলে। কিছুদিনের মধ্যে মানুষ সেটা ভুলে যায়। তদ্দিনে সামনে আসে আরেক ঘটনা। আগেরটা বাসি হয়ে যায়। বেশি দামে নকল মাস্ক কেনা, পরীক্ষা না করেই করোনা রিপোর্ট দেয়া, স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালকের বিপুল সম্পদের খোঁজ পাওয়াসহ নানা কেলেঙ্কারি সামনে আসে। এবার এলো শহীদ তাজউদ্দীন মেডিক্যালের ঘটনাটি। অ্যানেসথেসিয়া ভেন্টিলেটর নামের একটি চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা, কিন্তু কেনা হয়েছে প্রায় ১২ গুণ বেশি খরচে। এমনকি যেসব যন্ত্রপাতি কেনারই কথা ছিল না, সেসবও কেনা হয়েছে।

এক প্রকল্পে এত অনিয়ম দেখে পরিকল্পনা কমিশনও বিস্মিত। একে পুকুরচুরি বললে কম হয়ে যায়। তা তো সাগরচুরিকেও হার মানিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটার অনিয়মের এ ঘটনা গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৯২৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।

উদ্দেশ্য ছিল ৭ তলা হাসপাতাল ভবনকে ১৫ তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা। আরও ছিল কলেজের একাডেমিক ভবন ও শিক্ষার্থীদের জন্য ডরমিটরি নির্মাণ। আগামী জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ৪০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের সময় আরো দুই বছর এবং ব্যয় ১ হাজার ৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত করতে গত ২৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তখনই কেনাকাটায় এসব অনিয়ম ধরা পড়ে। কিছুদিনের মধ্যে এই মহাসমুদ্র চুরিরও আর তথ্যমূল্য থাকবে না। হয়ে যাবে স্রেফ কিচ্ছা। গণমাধ্যম এবং মানুষের চোখও এখন করোনার টিকার খবরের দিকে। সেখানে রাজনীতি, ক‚টনীতি, অর্থনীতির বেশুমার কাণ্ড।

গত ডিসেম্বরের শেষভাগে এসে করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন নিয়ে সারা বিশ্ব যখন উদ্বিগ্ন, তখনই প্রশ্ন উঠেছিল- কেমন হবে ২০২১ সালের বিশ্ব রাজনীতি? কোভিড-১৯-এর নতুন ধরন, ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিয়ে দেশে-দেশে কূটনীতি-রাজনীতি-অর্থনীতিকে তালগোল বাধিয়ে দিয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে ছড়িয়ে পড়লেও পুরো ২০২০ সালে বিশ্বকে দাপিয়ে বেড়িয়েছে।

বলার অপেক্ষা রাখছে না, এর রেশ ২০২১ সালকেও ছাড়ছে না। ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নতুন এক সংকটের জন্ম দিচ্ছে। সবার আগে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিদায়ের আগে উদয় করেছেন জাতীয়তাবাদী ভ্যাকসিন। ‘মাই নেশন্স ফার্স্ট’ থিওরিতে ভ্যাকসিনটি বাজারে আসার আগেই প্রি-অর্ডারের মাধ্যমে এর কোটি কোটি ডোজ প্রাপ্তি নিশ্চিত করে তিনি তার রাজনীতি করেছেন। তার অন্য কোনো দেশ ভ্যাকসিন পাক বা না পাক, নিজ দেশে ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিশ্চিত করার রাজনীতির আগে-পিছে অনেক ঘটনা। অনেক রাজনীতি-কূটনীতি।

বোঝাই যাচ্ছে, ২০২১ সালে এ ভ্যাকসিনকে ঘিরে জন্ম নিচ্ছে এক ধরনের বৈষম্যের। বিংশ শতাব্দীতে ধনী ও গরিব দেশগুলোর মাঝে আর্থিক প্রশ্নে এক ধরনের বৈষম্যের জন্ম হয়েছিল। ধনী দেশ আরও ধনী হয়েছে, আর গরিব দেশ আরও গরিব হয়েছে। কিন্তু একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে ভ্যাকসিন নিয়ে নতুন ধরনের বৈষম্য। অনেক গরিব দেশের পক্ষেই কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ক্রয় করা (প্রতি ব্যক্তির জন্য দুই ডোজ) সম্ভব হয়ে উঠবে না।

ধনী দেশগুলো ভ্যাকসিন নিয়ে এরই মধ্যে বৈষম্যটির গোড়া পত্তন করে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডোজ (বিশ্বের ভ্যাকসিন ক্রয়ের শতকরা ২১.৮ ভাগ), ভারত ১৫০ কোটি ডোজ (২০.৬৯ ভাগ), যুক্তরাষ্ট্র ১০১ কোটি ডোজ (১৩.৯৩ ভাগ), কোভাস্ক (যারা বিশ্বে বিনামূল্যে সরবরাহ করবে) ৭০ কোটি ডোজ (৯.৬৬ ভাগ), কানাডা ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ডোজ (৪.৯৪ ভাগ), যুক্তরাজ্য ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডোজ (৪.৯২ ভাগ)। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইন্দোনেশিয়া ৩৩.৮০ কোটি (৪.৬৬ ভাগ) ও ব্রাজিল ১৯.৫০ কোটি (২.৭০ ভাগ)।

বাংলাদেশের পরিমাণ ৩ কোটি ১ লাখ, যা বিশ্বের ০.৪২ ভাগ। হিসাবটিতে চোখ বুলালেই কারো বুঝতে বাকি থাকে না আমাদের অবস্থা-অবস্থানটা কোথায়? টিকা আমদানিই শেষ কথা নয়। আমদানির পর বিতরণ, সংরক্ষণ ও প্রয়োগ-প্রতি পর্বই বড় কঠিন। বিশাল কর্মযজ্ঞ। আমরা আমদানির আগেই বজ্র আঁটুনিতে পড়ে যাচ্ছি না তো? অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রাপ্তির আগেই যে ক্যাচাল-প্যাচাল চলছে, এর শেষ কোথায় বলা যাচ্ছে না।

ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই ভ্যাকসিন পেতে চুক্তিবদ্ধ। আমদানির আগেই গত রবিবার রাতে আচানক খবর। এতে বলা হয়, সিরাম ইনস্টিটিউট তাদের তৈরি টিকা এখন ভারতের বাইরে রফতানি করতে পারবে না। ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কথাও প্রচার হয়েছে। এ চুক্তি জি টু জি নয়, সেটা বুঝতেও সময় লেগেছে।

আবার বলা হচ্ছে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার মধ্যে এ নিয়ে কথা হয়েছে। তাহলে মাঝখানে ভেকসিমকো কেন?-জবাবে স্বাস্থ্যসচিব বলেছেন, চুক্তিতে যা-ই থাক টিকা পাওয়া দিয়ে কথা। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে টিকা পাবে। তবে, কবে পাবে তার ঠিক নেই। একেক কথার একেক অর্থ।

অথচ চুক্তি অনুযায়ী টিকা পেতে এরই মধ্যে প্রথম ধাপের টিকার অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে সরকারের তরফে। তবে সিরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদার পুনাওয়ালার বরাত দিয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা জানায়, তারা এই মুহূর্তে টিকা রফতানি করতে পারছে না। বলেছেন, এখনো এ বিষয়ে তারা কোনো লিখিত নির্দেশনা পাননি।

গ্রামের পুকুরের ঘাটলা বা মহল্লার টি স্টলের কথারও একটা ওজন থাকে। কিন্তু, করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে আমরা যেসব কথায় হাবুডুবু খাচ্ছি তা সামনের দিনগুলোতে ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং অনিশ্চয়তাসহ শনির দশার আভাস মিলছে। আশঙ্কা এবং সতর্ক বার্তা ছিল, শীতে করোনা সংক্রমণ বাড়বে ভয়াবহভাবে। মৃত্যু বাড়বে ভয়ংকর পর্যায়ে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে এখন পর্যন্ত শীতের নমুনায় তা বলছে না।

বরং পরিস্থিতির উন্নতি চোখে পড়ছে স্বাস্থ্য অধিদফরের প্রতিদিনের আক্রান্ত, শনাক্ত, মৃত্যু ও সুস্থতার প্রাফশিটে। বিভিন্ন দেশেই মৃত্যুর সংখ্যা কম-বেশি করার ঘটনা নিয়ে কথাবার্তা আছে। রাশিয়াসহ কোনো কোনো দেশ তা স্বীকারও করেছে। বাংলাদেশের অনেক কিছুই ভিন্ন। তুলনার বাইরে। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের অনেকে এখন জেনে গেছেন স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল কী। কোন ধাপের পরে কী করতে হয়।

ফলে সময় থাকতে হাসপাতালে গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন। মানুষও সাহসী হয়ে উঠছে। তারা আবারও প্রমাণ করেছে, দুর্যোগে- দুর্বিপাকে টিকে থাকার এক অসম্ভব অমিত শক্তি তাদের আছে। করোনার বিরুদ্ধে তারা কেবল টিকেই থাকছে না, দাপটও দেখাচ্ছে।

দেশ গরিব হলেও সরকার সবাইকে বিনা মূল্যে টিকা দেওয়ার মতো একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কার্যকর কদ্দূর হবে, সেটা পরের বিষয়। পৃথিবীর অনেক ধনী দেশও এখন পর্যন্ত এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। যে কোনো টিকা আবিষ্কার কঠিন কাজ। এর সুষ্ঠু বিতরণ ও সঠিক নিয়মে প্রয়োগও কঠিন।

বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে যে টিকা আমদানি হবে তা সঠিকভাবে বিতরণ, সংরক্ষণ ও প্রয়োগের সঙ্গে অনেক ফ্যাক্টরের যোগসূত্র রয়েছে। মনে রাখা দরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও টিকা প্রয়োগ করতে গিয়ে ভুলত্রুটি হয়েছে। কাজেই আমাদের সামনে আরো অনেক পর্ব বাকি। অনেক কিছু ভাবনার দাবিও রাখে। আমাদের দেশে সরকারের বহু চেষ্টা সত্ত্বেও হাসপাতালগুলো থেকে ওষুধ চুরি ঠেকানো যায় না।

বর্তমান সরকার হাসপাতালগুলোর সেবার মান বাড়ানোর জন্য রোগীদের খাবার ও ওষুধের বাজেট দ্বিগুণ করে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবটা শুধু ভিন্ন নয়, কঠিন। দুঃখজনক। মানবতা, নৈতিকতা, বোধ-বুদ্ধি, বিবেকের তাড়নায় করোনার টিকা প্রশ্নে কথাগুলো না বললেই নয়। উপেক্ষারও সুযোগ নেই। এরপরও কেউ না বুঝলে যার যার ব্যাপার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।






ads