ম্যারাডোনা: তুমি অমর অক্ষয় অবিনশ্বর

- ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৪:৩৪

ম্যারাডোনা আর নেই। চিরায়ত ছুটি নিয়ে পরকালে পাড়ি জমিয়েছেন পৃথিবীর ফুটবলের রাজা ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ২৫ নভেম্বর স্থানীয় সময় বিকেলে আর্জেন্টিনার তিগ্রেতে নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ফুটবলের মহানায়ক ম্যারাডোনার মহাপ্রয়াণে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো ফুটবল দুনিয়া। যার পায়ের তলায় চিৎ হয়ে শুয়ে তার ফুটবলের অনিন্দ্য নিপুণ নান্দনিকতায় মুগ্ধ হয়েছিল পৃথিবীপৃষ্ঠ। যে সবুজ গালিচায় জাদুকরী আল্পনা এঁকে দিয়ে পৃথিবীর এপিঠ-ওপিঠে ফুটবল ফুর্তির অতি মানবীয় মহাকীর্তি গাথা চিহ্ন রেখে যিনি অমরত্ব লাভ করেছেন সেই ফুটবল জাদুকরের চিরপ্রস্থানে যারপনাই ব্যথিত গোটা বিশ্ব।

বিশ্ব ফুটবলের আকাশ থেকে খসে পড়া এই আলোকোজ্জ্বল নক্ষত্রের শূন্যতায় আঁধারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে পৃথিবী। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ থেকে দক্ষিণ গোলার্ধ, এশিয়া থেকে আমেরিকা, আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশ সবখানেই পড়েছে শোকের অন্ধকার ছায়া। ফুটবলে ঈশ্বরের অভিধা অর্জন করা ম্যারাডোনার মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না ফুটবলের এই জগৎ। প্রিয় তারকার পতনে কোটি হৃদয়ে নীরব যন্ত্রণার ছাপ পড়েছে। তার শোকে কাতর হয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ সংবাদ মাধ্যম। যেখানে লেখা হচ্ছে শোকাবিভূত দুঃখকথা।

ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। যার লোকাতীত ফুটবল নৈপুণ্য দেখে পুরো পৃথিবীর দৃষ্টিই লুটিয়ে পড়ত তার পায়ে। ফুটবলে ফুটবলে যিনি রাঙিয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর অন্তর। সেরাটা তুলে ধরার মাধ্যমে যিনি ঈশ্বরের নামটা পর্যন্ত নিলাম করে নিয়েছেন নিজের নামে। যিনি ফুটবল পায়ের জাদুতে আর্জেন্টিনার নাম স্থায়ীভাবে গেঁথে দিয়েছিলেন পৃথিবীর অগণনীয় জাতি গোষ্ঠীর অন্তরে। সেই ফুটবল ঈশ্বরের চলে যাওয়াটা কী মেনে নিতে পারছে পৃথিবী। না- পারেনি, পারছে না, পারবে না কেউ। তার প্রস্থানে ফুটবল অঙ্গন তথা ফুটবলপ্রিয় মানুষের মাঝে গড়াগড়ি করছে নীরব কান্নার ভাষা।

ফুটবলে এক অবিনশ্বর আত্মা হয়ে জন্মেছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি মানুষ থেকে ক্রীড়ামোদি মানুষের প্রতিক্রিয়ায় সেটাই ফুটে উঠছে। মৃত্যু পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় প্রতীয়মান হচ্ছে ম্যারাডোনা কতটা মহীয়ান মহাপ্রাণ। ফুটবলের সেরাটা মেনে সারা পৃথিবীই তাকে স্যালুট জানাচ্ছে। ফুটবল ইতিহাসের এই ঈশ্বরকে নিয়ে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোমারিও লিখেছেন, ‘আমার বন্ধু চলে গেল, ম্যারাডোনা একজন কিংবদন্তি! সে বিশ্বকে পায়ে বল নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছে, অবশ্যই তার জীবন ও ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্বও তাকে আলাদা করেছে। আমি অনেকবারই বলেছি, মাঠে আমার দেখা সেরা খেলোয়াড় সে।’

ম্যারাডোনার স্বদেশী ও এ সময়ে সেরা লিওনেল মেসির ভাষায়-‘আর্জেন্টাইন এবং ফুটবলের জন্য এ এক গভীর দুঃখের দিন। তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন, তবে কোথাও যাননি। কারণ, ডিয়েগো অবিনশ্বর।’ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো টুইটারে লিখেছেন, ‘আজ আমি একজন বন্ধুকে বিদায় জানালাম, আর বিশ্ব একজন জিনিয়াসকে বিদায় জানাল। সময়ের সেরা এবং একজন জাদুকর। তুমি খুব দ্রæত বিদায় নিলে। কিন্তু তোমাকে কখনই ভোলা সম্ভব নয়।’ ভারতের ক্রিকেট কিংবদন্তি সৌরভ গাঙ্গুলি লিখেছেন, ‘আমার হিরো আর নেই, আমার পাগুলে জিনিয়াস ভালো থাক। আমি তোমার জন্যই ফুটবল দেখেছিলাম।’

ম্যারাডোনার শোকে ব্যথিত লাখো কোটি মানুষের কথা বাদ দিয়ে এবার নিজের কথাটাই বলি। মূলত ম্যারাডোনার জন্যই আর্জেন্টিনা নামের সঙ্গে সখ্যতা। এ থেকেই বনে যাই আর্জেন্টিনার ঘোর সমর্থক। ম্যারাডোনাকে জানতে পেরেছি বলেই আর্জেন্টিনাকে জানা হয়েছে। ম্যারাডোনাকে চিনতে পেরেছি বলেই আর্জেন্টিনাকে চেনা হয়েছে। ম্যারাডোনাকে ভালোবেসেছি বলেই ফুটবলকেও ভালোবাসা হয়েছে।

খেলোয়াড় ম্যারাডোনার পরবর্তী প্রজন্মে বেড়ে ওঠা বিধায় ফুটবলে অমরত্ব পাওয়া এই মানুষটির খেলা সরাসরি স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে টিভি স্ক্রিনে কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখে অনুমান করতে পারি ফুটবলে কেন অমর তিনি। সত্যিই ফুটবল ইতিহাসে ম্যারাডোনা অমর অমলিন অবিনশ্বর হয়ে থাকবেন। যদিও নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অবিনশ্বর পথে যাত্রা করেছেন তার পরও তাকে মনে রাখবে, রাখতে বাধ্য পৃথিবী। ফুটবল পায়ে তার অমর কীর্তি ভক্ত হৃদয়ে ঝড় তুলবে সব সময়। তাই হে ফুটবল ঈশ্বর তোমাকে ঈশ্বরের কাছেই সমর্পণ করছি।

যতদিন থেকে ফুটবল বোঝার বয়স হয়েছে ততদিন থেকে ফুটবলের কালো মানিক পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে নিয়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে জোর বিতর্ক বাঁধতে দেখেছি। কে সেরা, পেলে না ম্যারাডোনা। এ বিতর্কে দ্বিধাবিভক্ত প্রায় পুরো পৃথিবীই। দুই দলের বিতর্ক বাদ দিলে দেখা যায়, ২০০০ সালে এক অনলাইন জরিপে শতাব্দীর সেরা ফুটবলার হয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তাই ম্যারাডোনা যে সেরা সেটা বলতে দ্বিধা নেই। এ ছাড়া অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞ, সমালোচক, সাবেক বর্তমান খেলোয়াড় ও সমর্থকদের বিবেচনায় সর্বকালের সেরা ফুটবলার নাকি ডিয়েগো ম্যারাডোনাই। পত্রিকান্তরে এমনটাই জেনেছি।

ম্যারাডোনাই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দু’বার স্থানান্তর ফির ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। প্রথমবার বার্সেলোনায় স্থানান্তরের সময় ৫ মিলিয়ন ইউরো এবং দ্বিতীয়বার নাপোলিতে স্থানান্তরের সময় ৬.৯ মিলিয়ন ইউরো। নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারে ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স, বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া এবং নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেছেন। ক্লাব পর্যায়ে তিনি নাপোলিতে অসংখ্য সম্মাননা জেতেন।

ম্যারাডোনার খেলোয়াড়ি জীবন ঘেটে দেখা যায়, তিনি চারটি ফিফা বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। যার মধ্যে ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপ, যেখানে তিনি আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন এবং দলকে বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেন। এ ছাড়া প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জেতেন তিনি। ওই প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা যে ২-১ গোলে জয় পেয়েছিল তার দুটি করেছিলেন ম্যারাডোনা। তার প্রথম গোলটি ছিল হ্যান্ডবল যা ‘হ্যান্ড অফ গড’ নামে খ্যাত। দ্বিতীয় গোলটি ম্যারাডোনা প্রায় ৬০ মিটার দূর থেকে ড্রিবলিং করে পাঁচজন ইংরেজ ডিফেন্ডারকে পাশ কাটিয়ে করেছিলেন। ২০০২ সালে ফিফাডটকমের ভোটাররা গোলটিকে শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে নির্বাচিত করে। ফুটবলে এতসব অর্জনের বিপরীত দিক চিন্তা করলে ম্যারাডোনা বারবার চরম বিতর্কেরও সঙ্গী হয়েছে। সবকিছু ছাপিয়ে তিনি সেরাদের সেরা হয়ে উঠেছিলেন। ফুটবলে অমরত্ব কথাটা কেবল তার পাশেই শোভা পায়।


১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স প্রদেশের লানুস শহরের পলিক্লিনিকো এভিতা হাসপাতালে একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ম্যারাডোনা। তিন কন্যা সন্তানের পর তিনিই ছিলেন বাবা-মায়ের প্রথম ছেলে সন্তান। ১৯৭৬ সালের ২০ অক্টোবর, নিজের ষোলোতম জন্মদিনের ১০ দিন আগে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে ম্যারাডোনার অভিষেক হয়। সেখানে তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছিলেন এবং ১৬৭ খেলায় ১১৫টি গোল করেন। এরপর ১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বোকা জুনিয়র্সে পাড়ি জমান।

১৯৮১ মৌসুমের মাঝামাঝি সময় বোকায় যোগ দিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে ম্যারাডোনা টানা চারটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ১৯৮৬-তে আর্জেন্টিনা বিজয়ী হয় এবং ১৯৯০-তে হয় রানার্সআপ। ১৯৭৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক পরিসরে ১৬ বছর বয়সে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যারাডোনার অভিষেক হয়। ১৯৭৯ সালে ১৮ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার হয়ে ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। ১৯৭৯ সালের ২ জুন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সিনিয়র দলের হয়ে প্রথম গোল করেন ম্যারাডোনা।

তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ (১৯৭৯) ও ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৮৬) উভয় প্রতিযোগিতায় গোল্ডেন বল জিতেছিলেন। নন্দিত এই ফুটবলারকে ২০০০ সালে ফিফা তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও অফিশিয়াল ম্যাগাজিনে ভোট এবং বিচারকের মাধ্যমে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত করে। সেই অনলাইন ভোটে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন ম্যারাডোনা। তিনি পান ৫৩.৬% ভোট, যেখানে পেলে পেয়েছিলেন ১৮.৫৩% ভোট। তা সত্তে¡ও অনুষ্ঠানের কিছুদিন আগে ফিফা অপ্রত্যাশিতভাবে ‘ফুটবল ফ্যামিলি’ নামে একটি কমিটি গঠন করে, যা শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে পেলেকে নির্বাচিত করে। পরে ফিফা দুজনকেই পুরস্কার প্রদান করে।

অবিস্মরণীয় কীর্তির এই রাজপুত্র আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি ফুটবল পায়ে পৃথিবী রাঙিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আর কখনো পা ফেলবেন না পৃথিবীতে। পায়ের জাদুতে আর মুগ্ধ করবেন না মানুষকে। ফুটবল মন্ত্রে জাগিয়ে তুলবেন না পৃথিবী। সবকিছু সাঙ্গ করে চলে গেলেন অনন্ত, অসীম, অজানায়। হে ফুটবল ঈশ্বর, ঈশ্বরের কাছেই ভালো থাকেন, এই প্রার্থনা রইল।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads