বিপন্ন বিপর্যস্তের অনাকাক্সিক্ষত চিত্র


poisha bazar

  • ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৪:২৬

পরিবেশ সম্বন্ধে জানতে গেলে প্রথম সিঁড়িটা ভাঙতে হয় বড় ছবিটা দেখতে শিখে। এটা নিতান্তই প্রথম ধাপ। কারণ, বড় ছবিটা পাল্টে যায়। আর এই পাল্টে যাওয়ার কোনো ধরন নেই। নিশ্চয়তাও নেই। তবু প্রথম ধাপ তো পেরোনো দরকার। বড় ছবিটা দেখার গুরুত্ব চল্লিশ বছর পার করা পরিবেশচর্চাতে কমেনি, উপরন্তু বেড়েছে। বস্তুত, বড় ছবিটা দেখার আদতটাই তৈরি হয়নি সব দেশে।

সংবাদপত্রে দেখলাম নিউক্যালস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ডেভিড গ্রাহাম বুড়িগঙ্গা পরিষ্কার করে রক্ষণাবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, বাসা-বাড়ির আবর্জনা, নোংরা পানি ময়লা আর জৈব-আবর্জনায় বুড়িগঙ্গা কলুষিত। গ্রাহাম সাহেব সমাধান দিয়েছেন জৈব আবর্জনা ও কলকারখানার রাসায়নিক পদার্থ, যানবাহনের জৈব-আবর্জনা থেকে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাবার। তিনি এও বলেছেন, বাড়তি লোকের চাপে আর তাদের অপব্যবহারে বুড়িগঙ্গার পানি বিনষ্ট হচ্ছে- পরিবেশ হচ্ছে দূষিত। ভালো কথা। মেনে নেব যে এখন লোক বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎ বাড়েনি। ক্রমশ বেড়েছে। যেটা বড় ছবি থেকে একেবারে বাদ পড়ে গেল, যে জৈব আবর্জনা পরিশোধন করে নেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল বুড়িগঙ্গা নদীর। কিছু কিছু বিশিষ্ট অণুপ্রাণী এই ক্ষমতার অধিকারী এবং বুড়িগঙ্গার আবাসিকে তারা থাকত। এদের অপ্রতুল জনসংখ্যাই জৈব-আবর্জনা বিয়োজিত করে বুড়িগঙ্গার পানি নির্মল রাখত। এটা গল্প নয়, এটা বিজ্ঞান। অন্তত একজন দায়িত্বশীল মানুষের কথা এখানে বলা যায়।

প্রায় ১০ বছর আগে কোনো এক বেসরকারি সংস্থাকে বুড়িগঙ্গার পানি দূষণমুক্ত রাখতে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। সে প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা ২০০৩ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, এই প্রকল্পে কীটনাশক এবং রাসায়ানিক সারের ব্যবহারজনিত দূষণের কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। একথা শুধু বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রে নয়, দেশের সমস্ত নদীর ক্ষেত্রেই এটা সত্যি। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, পৃথিবীর অধিকাংশ নদী প্রাণহীন হয়ে গেছে। তার কারণ মানুষ কীটনাশক এবং রাসায়নিক সারজনিত দূষণকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, বুড়িগঙ্গা তার নিজস্ব জৈবসম্পদের ক্ষমতায় পরিশোধিত হতে পারত। রাসায়নিক দূষণ এই ক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। একবার যদি এই ঘটনা ঘটে, তবে নদী পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।

কিছুতেই জোর গলায় বলা যাচ্ছে না যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কীটনাশক বিষ আর রাসায়নিক সার কী ভয়াবহ ক্ষতি করছে। ক্ষতি করছে বুড়িগঙ্গার, অববাহিকতার, অববাহিকায় কর্মরত চাষিদের, তাদের উৎপন্ন ফসলের এবং সেই ফসল খাওয়া মানুষ আর গবাদি পশুর। এসব ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব করতে দেখি না কোন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রাঙ্গণে। অবাক লাগে ভাবতে কেন এই নীরবতা এত বড় নিধন যজ্ঞের মোকাবিলায় কেউ যেন তেমন রা কাড়েন না।

সাহেবদের বইতে লেখা আছে ডধংঃব ধিঃবৎ রং ধ ঢ়ড়ষষঁঃধহঃ। আমরাও দুলে দুলে তাই মুখস্থ করে জীবনটা কাটিয়ে দিলাম। অথচ, প্রায় ১০০ বছর আগে ময়লা পানিতে যে খাদ্যপ্রাণ আছে, নাইট্রোজেন, ফসফরাস আর পটাশিয়াম আছে, তার ব্যবহার মাছ চাষ করার কৃষিতে করা যায় এবং কর্কটক্রান্তীয় দেশে অগভীর জলাশয়ে ময়লা পানি কিছুদিন রেখে যে সর্বোৎকৃষ্ট মানের পরিশোধিত পানি পাওয়া যায়, এটা আমরা কোনো মতেই শিখতে চাই না। কারণ, সাহেবদের বইতে এটা লেখা নেই। তাছাড়া এই প্রকল্প করে বেশি খরচ হবে না। বেশি খরচ না হলে আরও যে-সব মজা হয় তাও হবে না।

নতুন করে বুড়িগঙ্গা নিয়ে আলোচনার মহড়া শুরু হয়েছে। বিশিষ্ট উদ্যোগীরা বেশ কিছু বক্তব্য রেখেছেন। ভালো কথা বলেছেন পরিবেশবিদরা। দক্ষিণ এশিয়ার বাঁধ, নদী আর মানুষের যোগসূত্র বজায় রাখার সংগঠনের সঙ্গে তারা যুক্ত। প্রথম গুরুত্ব দিয়েছেন স্বচ্ছতায়। পানি নয়, কর্মপদ্ধতিতে বা টাকা-পয়সার হিসাবে। প্রশ্ন তুলেছেন যে, ঢাকার ময়লা পানি পরিশোধনাগারের ক’টা চলে তা কেউ খবর রাখেন কিনা। বস্তুত, এ দেশের খুব কম ময়লা পানি পরিশোধনাগারই চলে। এই প্রশ্নটি অদ্ভুতভাবে পাপোশের তলায় রেখে দেওয়া হয়েছে তিন দশক ধরে। অসামান্য অধ্যাবসায়ে এই নীরবতা পালন করা হয়।

অনেকেই বলছেন, টাকা নষ্ট হয়েছে। কথাটা তো ঠিক। এক-দু’টাকা নয়, শত শত কোটি টাকার ব্যাপার। এত টাকার কাজ নষ্ট না করে খরচ করার ঐতিহ্য আমাদের দেশে এখনও তৈরি হয়নি। কিন্তু এখনও বড় ছবির অনেকটাই বাকি। অন্তত যে কোনো প্রকল্পে টাকা খরচ করার এই পাগল পাগল প্রবণতা সমগ্রের অংশ হিসেবে দেখা দরকার। সরকারি টাকা, তো সে ত্রাণেই হোক আর প্রকল্পেই হোক, এ রকম লুটের মালের মতো নিঃশেষ হয়ে যাবে কেন? যাতে না হয়, তার কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা আজও কেন বসানো গেল না? কেন যে এই লুটতরাজের সংস্কৃতি তৈরি হলো, কেন আমরা প্রশাসনিক পরিকাঠামোকে কাঠগড়ায় তুলব না, এই প্রশ্ন নেই। বোধ হয় আমাদেরও কোথাও আটকায়। হয়তো আমরাও ঠারেঠুরে কিছু পেয়ে থাকি। যতদিন এই নখদন্তহীন অভিযোগের পালা চলবে, সরকারি প্রকল্পে টাকা এলে তা উধাও হয়ে যেতে বেশি সময় নেবে না। তার চেয়ে বরং এই লুটতরাজের সংস্কৃতির কথা, ঐতিহ্যের কথা শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দিই। তারা অন্তত মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক। সমাধান হোক, সমাজের ক্ষতস্থানগুলোর সম্বন্ধে।

আমাদের একটা প্রবণতা আছে, আমরা সব দোষ মন্ত্রীদের ঘাড়ে চাপাতে গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালিত হয়েছে বলে স্বস্তিতে শুতে যাই। অনেক ক্ষেত্রে হলেও সবক্ষেত্রে তা ঠিক নয়। মন্ত্রীর দোষ-গুণ পরিমাপ করা আমার অধিকার বা ইচ্ছের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু যেটা জানি, তা হলো মন্ত্রীর চারপাশে একটা বলয় থাকে। তাতে প্রভাবশালী শিল্পপতিরা আছেন, আছেন সচিব-গোষ্ঠী, বিশেষজ্ঞরা, বিশ্বস্ত এনজিও নেতারা, বিল্ডার লবি। এই বলয়গুলো পর্দার আড়ালেই থাকে। ফেসবুকে নেই। ধরা না দিলে মিডিয়ার ক্যামেরায় ধরা পড়েন না। কিন্তু এরাই অনেকাংশে সিদ্ধান্ত তৈরি করেন এবং অবশ্যই মন্ত্রীদের প্রভাবিত করেন। ফলে অনেক সময় দেশবাসী উপকৃত হন, আবার কখনও কখনও বিপজ্জনক পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে। এদের ইচ্ছে হলে আসলকে আড়াল করে নানা ধরনের নজর ফেরানো বিষয়বস্তুকে সামনে এনে খাড়া করা। তাই লাখ লাখ লোকের জীবন বিপন্ন করেও চাষির কাছে বিষ বেচে নিরুপদ্রবে ব্যবসা করেন প্রস্তুতকারকরা। টু শব্দ নেই কোথাও। আশায় থাকব কবে সকলে আমরা বড় ছবিটা দেখতে পাব।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads