সশস্ত্র বাহিনী দিবস ও প্রসঙ্গ ‘ভেটারান্স’

মেজর আফসারী (অব.)
মেজর আফসারী (অব.) - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • মেজর আফসারী (অব.)
  • ২১ নভেম্বর ২০২০, ২০:০৩

আজ ৪৯তম সশস্ত্র বাহিনী দিবস। ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর, স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। বাংলাদেশ ও সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত এবং একে অপরের সম্পূরক। ’৭১ এই দিনে বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সম্মিলিতভাবে, মহান ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ পরিচালনা করে।

দিনটি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠা দিবস হিসাবে গণ্য। জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু, শেখ মুজিবুর রহমান, ৭ মার্চ ’৭১, রেসকোর্স, বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির উদ্দেশ্যে যে ঐতিহাসিক দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন, “যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে প্রস্তুত থাকো, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

তারপরই, তত্কালীন পাকিস্তান সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর বাংগালী সদস্যরা, এমনকি তদান্তিন ই পি আর ( ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেল) ও পুলিশের বিচক্ষণ ও চৌকোষ সদস্যদের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদেরকে যুদ্ধ করে, দেশকে স্বাধীন করতে হবে। সেই থেকেই; ধীরে ধীরে তারা গোপনে বিদ্রোহ ও যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকে। প্রকৃত পক্ষে; অতপর, প্রতিটি বাঙালি সৈনিকের মনের মণিকোঠায় বাংলাদেশের জন্য, নিজস্ব একটি পৃথক সশস্ত্র বাহিনীর স্বপ্ন ও ভাবনা দানা বাঁধে।

৭ মার্চ থেকে ২১ নভেম্বর, মাত্র ৮মাস ১৪ দিন পর জন্ম নিল; বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। জন্ম নেয়ার সাথে সাথেই শুরু হয় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্ধষ, দুর্নিবার আক্রমণ। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর’৭১, অর্জিত হলো; বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন ও সাফল্যের বিজয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সেনাদের নিয়ে গঠিত মিত্র-বাহিনীর কাছে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর প্রায় এক লক্ষ সেনাসদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে, জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষণার সেই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গন, সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যানে আত্মসমপণ করতে বাধ্য হয়। সেই থেকেই- “স্বাধীনতা” শব্দটি আমাদের।

বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পাশাপাশি স্বাধীনতা যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে।বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের সুচনালগ্ন থেকেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ২৬ মার্চ এরপূর্বে, ১৯ মার্চ, জয়দেবপুর থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সুচনা হয়। সেই যুদ্ধে বীরদর্পে অংশ নেয়, ২য় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমন্টে ও গাজীপুরবাসী। মুখে মুখে বজ কণ্ঠে স্লোগান উঠে- “জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর”।

তখন থেকে ২১ নভেম্বর ’৭১ পর্যন্ত মূলত সেনাবাহিনী যুদ্ধ পরিচালনা করে। নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যগণও প্রাথমিক অবস্থায় স্থলবাহিনীর কাঠামোর অধীনেই যুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে বাহিনীগুলো পৃথক পৃথকভাবে সংগঠিত হয় এবং ’৭১-এর ২১ নভেম্বর থেকে সম্মিলিতভাবে, সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণের মধ্যদিয়ে বাহিনীটি পূর্ণাঙ্গ রূপে আত্মপ্রকাশ করে।’৮০র দশকের মাঝামাঝি থেকে সম্মিলিতভাবে, ২১ নভেম্বর, দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

এর পূর্বে ২৫ মার্চ সেনা, ১০ ডিসেম্বর নৌ ও ২৮ সেপ্টেম্বর বিমানবাহিনী পৃথক পৃথকভাবে দিনটি পালন করতো। সশস্ত্র বাহিনীর বয়স এখন প্রায় পঞ্চাশ। বাহিনীটির সাফল্য এই স্বল্প-পরিসরে তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী আজ আর শুধুমাত্র একটি দেশের বাহিনী নয়; এটা আন্তর্জাতিক মানের, এক আন্তর্জাতিক বাহিনী হিসাবে, বিশ্বশান্তি মিশনে একনম্বর বাহিনী হিসাবে দীর্ঘদিন যাবত্, নিষ্ঠার সাথে দায়িত্বপালন করে আসছে।

দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো এদ্ধাইসিসে অভাবনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের সর্বোচ্চমানের চিকিত্সা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধাদি ভোগ করার সুযোগ বেসামরিক সাধারণ মানুষও পাচ্ছে। এককালের নন-প্রডাক্টিভ আর্মি আজ শুধু প্রডাক্টিভই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তালিকায়ও অন্যতম অবস্থান অর্জন করেছে।

অতীত ও বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টাও পরিকল্পনায় কাঠামোগত, প্রশিক্ষণ, সমর-সরঞ্জাম, সেনানিবাসের পরিধি, সার্বিক মান-উন্নয়ন, কেপাসিটিবিল্ডিং ও কৌশলগত মানের উন্নয়ন, ইত্যাদি ভবিষ্যতে পৃথকভাবে আলোচনা করা যাবে। এখানে একটি কথা বলে শেষ করতে চাই- এক সময় যখন ব্রিটিশ সারা-পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাজত্ব করতো, তখন তারা বলতো,“ব্রিটিশ-সামরাজ্যে সান-সেট নেই”।

আর এখন সারা-বিশ্বে শুধুমাত্র বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীই বলতে পারে-“বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সূর্য্যাস্ত নেই, যেখানেই সূর্য্য সেখানেই বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী”। শাবাশ বাংলাদেশ, সাবাস বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী।

যাহোক; বলছিলাম সশস্ত্র বাহিনীর কথা। সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠান সূচিতে থাকে-ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত শিক্ষা-অনির্বাণে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয়,প্রধানমন্ত্রী এবং তিন-বাহিনীর প্রধান কর্তৃক পুষ্পস্তবক অর্পণ। বিকেলে সেনাকুঞ্জে, মাননীয়, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ, বিরোধীদলীয় নেতা ও অন্যান্য উচ্চ পর্যায়ের সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সংবর্ধনায় অংশ নেন।

অন্যান্য সেনানিবাস, নৌ ও বিমান ঘাঁটিতে অনুরূপ সংর্বধনা অনুষ্ঠানের অয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ বেতার ও বিভিন্ন টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার এবং দৈনিক সংবাদপত্রসমূহে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানগণ কর্তৃক পুরস্কৃত করা হয়। সকল সেনা-স্থাপনায় উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। সেনা-প্রকাশনা থেকে যুদ্ধ ও সামরিক বাহিনীর বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

এবার হয়তো কোভিট-১৯, করোনা মহামারীর জন্যে অনুষ্ঠানাদি সীমিত করা হয়েছে। সংর্বধনা ও বিভিন্ন সেনানিবাস এবং নৌ ও বিমান ঘাঁটিগগুলোতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য তথা ‘ভেটারান্স’দেরকে সসম্মানে আমন্ত্রন জানানো হয়।

‘ভেটারান্স’ শব্দটি বাংলাদেশে খুব একটা প্রচলিত নয়। এর বিভিন্ন কারণও আছে। প্রথমতঃ বাংলাদেশের ‘ভেটারান্স’ যথাযথভাবে অর্গানাইজড নয়, যদিও এরা রির্জাভ ফোর্স হিসেবে পরিগনিত। আমাদের দেশের‘ভেটারান্স’দের একাউন্টেবিলিটি, যথাযথ প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, অন্যান্য সুবিধাদি, উন্নত দেশগুলোর মতো নয়। আমেরিকাতে ‘ভেটারান্স’ সংখ্যা ১৭.৪ মিলিয়ন।

চীনে ৫৭ মিলিয়ন এবং ভারতে ৩.২ মিলিয়ন (৬০ হাজার ওয়ার উইডোসহ) এবং বাংলাদেশে সম্ভবত সব মিলিয়ে, ১ মিলিয়নের কম। বিভিন্ন দেশ তাঁদের বীরত্বগাঁথা কোনো ঐতিহাসিক দিনে দিবসটি পালন করা হয়। যেমন, আমেরিকা ১১ নভেম্বর ‘ভেটারান্স’ ডে এবং দিনটিতে সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়। ভারত ১৫ জানুয়ারী, চীন ৩ সেপ্টেম্বর (ভিক্টোরি ওভার জাপান-১৯৪৫) এবং কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ১১ নভেম্বর, রিমেম্বারেন্স ডে পালিত হয়।

যুক্তরাজ্য ১১ নভেম্বরের কাছের রবিবার দিনটি যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করে। বাংলাদেশে এমন কোনো দিন নির্ধারিত নেই। উল্লেখিত দেশগুলোসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ‘ভেটারান্স’ ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে ভেটারান্স এফেয়ার্স মিনিস্ট্রি।সম্প্রতি এই নভেম্বর মাসে চীনের লী জাংশু, চেয়ারম্যান, এন পি সি (ন্যাশনার পিপল্স কংগ্রেস), চীনের ‘ভেটারান্স’সুবিধাগুলো উন্নয়নের জন্য নতুন নিয়ম-কানুন ঘোষণা করেছেন।

তাতে রয়েছে- লিভিং এলাউন্স, কর্মসংস্থান, ভোকেশনাল ট্রেনিং, এডুকেশন অপর্চুনিটি এবং হেল্থ কেয়ার সার্ভিস, যা আগামী জানুয়ারী’২১, থেকে কার্যকর করা হবে। জানা যায় বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও‘ভেটারান্স’-দের জন্য কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। মাননীয় প্রতিরক্ষা ও প্রধানমন্ত্রী, অল্পদিনের মধ্যেই, রেশন বা রেশন মানি পুনর্বিবেচনা এবং অন্যান্য দেশের মতো “ওয়ান র্যাংক ওয়ান পে” প্রথা প্রবর্তন করতে র্নিদেশ প্রদান করবেন বলে, আশা করা যাচ্ছে।

প্রায় সব দেশই ‘ভেটারান্স’-দেরকে প্রস্তুত রাখেন রিজার্ভ ফোর্স ও ক্রাইসিসি ম্যানেজমেন্ট টিম হিসেবে। তাঁদের প্রতি বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করেন, রাষ্ট্রের সম্পদ ও সম্মানিত অভিজ্ঞ জনগোষ্ঠী হিসাবে। কারণ, এরাই তাঁরা, যাঁরা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অকাতরে জীবন দিতে, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ উপস্থাপন করে, প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে, শপথ নিয়েছেন। যা অন্যকোনো প্রফেশনের ক্ষেত্রে করা হয় না।

বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরে রাষ্ট্রীয়ভাবে বা প্রাইভেট উদ্যোগে ‘ভেটারান্স’সম্পর্কিত তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এমন কি; বাংলাদেশে ‘ভেটারান্স’ শব্দটিও খুব একটা পরিচিত নয়। ‘ভেটারান্স’ বাংলা প্রতিশব্দ অনেকগুলো পাওয়া যায়, কিন্তু কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ অর্থ প্রকাশ করে না। বাংলা একাডেমির ডিকশনারী অনুযায়ী “যুদ্ধপ্রবীণ” প্রতিশব্দটি অনেকটা কাছাকাছি।

‘ভেটারান্স’ শব্দটি চেয়ার-টেবিলের মতো বাংলায় গ্রহণ করে নেয়াই বোধকরি সর্বাপেক্ষা উপযোগী। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১২ সালে, মেজর জেনারেল জামিল ডি আহসান, বীর প্রতীক,(অব.) তদানিন্তন চেয়ারম্যান, রাওয়া (রিটায়ার্ড আর্মড-ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েল-ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন) নভেম্বর মাসে,বাংলাদেশে প্রথম ‘ভেটারান্স- ডে’ উদযাপন ও র‌্যালী র আয়োজন করেন।

আমি, তখন রাওয়ার, এক্সিকিউটিভ কমিটির, মেম্বার কালচারাল এন্ড এন্টারটেইনম্যান্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিলাম। তখন থেকেই আমরা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সকল পদবীর সদস্যদের ‘ভেটারান্স’ হিসাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করে আসছি। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই সকল পদবীর সৈনিকদেরকে ‘ভেটারান্স’ হিসাবে গণ্য করা হয়।

আমাদের দেশেও আমরা চাকরিরত অবস্থায়, মাননীয় সেনাপ্রধান থেকে শুরু করে, সাধারণ সৈনিক পর্যন্ত সবাই একত্রে টিম হিসেবে প্রশিক্ষণ ও আমাদের উপর ন্যাস্ত সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে থাকি। এমন কি, বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমিতে আমাদের প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি হয়, সাধারণ সৈনিকদের হাতেই।

বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের মতো ‘ভেটারান্স এ্যাফেয়ার্স মিনিস্ট্র্রি’ বা ‘ডাইরেক্টরেট অব ভেটারান্স এ্যাফেয়ার্স’ এরূপ প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নাই। তবে,সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের জন্যে, কয়েক জন বিচক্ষণ অফিসারের উদ্যোগে, ৩৮ বছর পূর্বে, ১৯৮২ সালে,‘রাওয়া’প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ‘রাওয়া’ তার আপন গতিতে, অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় পর্যায়ে একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। যা সকল অফিসার ও তাঁদের পরিবারের “সেকেন্ড হোম” এ পরিনত হয়েছে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী তথা সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের জন্য একমাত্র প্রতিষ্ঠান ‘রাওয়া’।

অন্যান্য পদবির সৈনিকগণ নিজ উদ্যোগে- ১৯৯৫ সালে ‘প্রাক্তন সৈনিক সংস্থা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১০ আগস্ট, ২০০৯ সালে ‘ডেসওয়া’ (ডিফেন্স এক্স-সোলজার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন) আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে বেসওয়া (বাংলাদেশ এক্স-সোলজার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন) এবং জানুয়ারি, ২০২০ সালে, ‘অসকস’ (অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক কল্যাণ সংস্থা) ও একই বছর, ‘রাওস’ (রিটায়ার্ড আর্মড-ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আত্মপ্রকাশ করে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কিছু ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান ও সমিতি গড়ে তুলেছেন সাধারণ সৈনিকগণ।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, উল্লেখিত সকল প্রতিষ্ঠানই অরাজনৈতিক। “সৈনিক লীগ” নামে যে প্রতিষ্ঠানটিকে অনেকেই সৈনিকদের প্রতিষ্ঠান মনে করে থাকেন। কিন্তু তা সঠিক নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক প্রতিষ্ঠান এবং এরা নিজেদেরকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে গণ্য করেন।

ডিজিটাল বাংলাদেশে, অনলাইনে অর্থ্যাত্ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বেশ কিছু ফেস বুক/ মেসেঞ্জার/হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা কাজ করছেন। তারমধ্যে অন্যতম, ভেটারান্স অব বাংলাদেশ (ভি ও বি) এবং রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস মেম্বার্স সোসাইটি (আর্মস)। ভিওবি’তে মূলতঃ অবসরপ্রাপ্ত অফিসারগণ যুক্ত আছেন। আশা করা যায় অল্পদিনের মধ্যেই ‘ভেটারান্স অব বাংলাদেশ’ সমগ্র বাংলাদেশের ভেটারান্সদেরকে একত্রিত করে, উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবেন।

‘আর্মস’ এ সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, জেসিও,এনসিও এবং অন্যান্য পদবির সৈনিকবৃন্দ সম্পৃক্ত। সম্ভবত বাংলাদেশে এটিই একমাত্র টিম ওভার্চুয়্যাল প্লাটফম যেখানে, সশস্ত্র বাহিনীর সকল পদবীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যগণ সম্পৃক্ত হতে পারেন । শুধু তাই নয়, এখানে তিনটি বিভাগে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক, আধা-সামরিক ও নির্বাচিত কিছু সংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সম্পৃক্ত আছেন। এর ভিশন হলো- সিভিল মিলিটারী রিলেশনশীপ (সি এম আর) এর উন্নয়নের মাধ্যমে মানবকল্যাণ ও সমাজসেবা মূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। আর্মস এর মোটো- “সমর শান্তি অবসরে, সদা-সর্বদা দেশেরই তরে”।

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারসহ সকল পদবীর সদস্যগণ চাকরিরত অবস্থায় একত্রে প্রশিক্ষণ ও দায়িত্ব পালন করলেও জাস্ট অবসরপ্রাপ্তির পর পদবী অনুযায়ী পৃথক হয়ে পরেন। এক্ষেত্রে ‘আর্মস’সম্মিলিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। কারণ, তারা মনে করেন, “বিনা বায়ু, মানুষের নেই আয়ু। পানিবিনা মাছের নাই গতি। সৈন্যবিনা অসম্পূর্ণ সেনাপতি”। অতএব; আমাদেরকে প্রদত্ত প্রশিক্ষণ অনুযায়ী, সবাই একসাথে,অর্জিত প্রথামত কাজ করতে হবে। অর্জিত সকল প্রশিক্ষণ, মেধা, সকল অভিজ্ঞতা দেশের কাজে সঠিক সময়, সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

পরিশেষে, একটি কথা বলতে চাই- আসুন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক, আধা-সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সবাই মিলে, (সি এম আর) সিভিল-মিলিটারী রিলেশন উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ গঠনে সম্মিলিত ভূমিকা রাখি। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও আহ্বানে, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা জীবন বাজি রেখে, সেনানিবাসগুলো থেকে বিদ্রোহ করে, বেড়িয়ে এসে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে, এক মহতি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

তাঁদের সেই বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা চির স্মরণীয় ও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ। বিজয় অর্জনে তত্কালীন শক্ত ও অকৃত্রিম সিভিল মিলিটারী রিলেশনশিপের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় সেনা-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ শত্রুমুক্ত করেন। শুধু তাই নয়; যুদ্ধ চলাকালীন সময় অধিকাংশ বেসামরিক জনমানুষ, নারী-পুরুষ, ছোট বড় নির্বিশেষে সেনা-সদস্যদের রান্না করে খাবার সরবরাহের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব এডমিন সাপোর্ট প্রদান করেছিলেন।

যোদ্ধা-জনতার মাঝে তৈরী হয়েছিল এক অকৃত্তিম সম্পর্ক, এবং সৃষ্টি হয়েছিল, শক্ত সিভিল-মিলিটারী রিলেশনশীপের এক অনন্য উদাহরণ। যা স্বাধীনতা-যুদ্ধের ময়দানে, যুদ্ধ পরিচালনা সহজতর ও বিজয় ত্বরান্বিত ও সুনিশ্চিত করেছিল। সেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে, কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভিশন-২০৪১ অনুযায়ী, প্রিয় মাতৃভূমিকে ‘উন্নত দেশ’ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হতে পারি, সম্মিলিতভাবে আমরা সকলে।

লেখক: কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক






ads