মানুষের স্বার্থেই জীববৈচিত্র্য রক্ষা অপরিহার্য

মোতাহার হোসেন
মোতাহার হোসেন - সংগৃহীত

poisha bazar

  • মোতাহার হোসেন
  • ৩০ অক্টোবর ২০২০, ২১:৫০

আলো, বাতাস, পানি, মাটি আমাদের জীবনের জন্য, জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য এসব উপাদানের পাশাপাশি সুন্দর সুষ্ঠুু পরিবেশ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য মানুষের জীবনকে সচল ও গতিময় করতে সহায়তা করে।

কিন্তু এসব আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য হলেও এর যথাযথ সংরক্ষণে, পরিকল্পিত ব্যবহারে অসর্তকতা, উদাসীনতায় মানুষের জীবন দুর্যোগ, প্রাকৃতিক, পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে অনিবার্যভাবে ধাবিত হচ্ছে পৃথিবী নামক উপগ্রহ এবং মানব জাতি। এ জন্য প্রধানত দায়ী মানব জাতি। তবে বেশি দায়ী ধনী তথা শিল্প উন্নত দেশসমূহ।

তাই আমাদের জীবন ধারণ সুস্থ ও নির্ঝঞ্ঝাটভাবে জীবন যাপনের জন্য পরিবেশ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখন থেকে স্থানীয়ভাবে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। এই চিরন্তন এবং অবধারিত সত্যতা আমরা যেমন অনুধানব করতে ব্যর্থ হচ্ছি, তেমনি ব্যর্থ হচ্ছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দও। এসবের গুরুত্ব, অপরিহার্যতা আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলে মানব জাতির টিকে থাকা, মানব জাতির অস্তিত্ব, মানব সভ্যতা হুমকির মুখে পতিত হওয়ার আশংকাও অনিবার্য।

বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে বাড়ছে মানুষের চাহিদা। বিশ্বের ক্রমবর্ধমান মানুষের চাহিদা পূরণে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানির চাহিদা মেটাতে পানি, বাতাস, মাটি, উদ্ভিদ, জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করছে। এতে প্রকৃতি প্রদত্ত এসব সম্পদ কমছে। শুধু পানি, মাটি, আলো, বাতাস, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ঝুঁকিও বাড়ছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘‘রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন, কেডয়ের’’ গবেষণায় উপরোক্ত তথ্য উঠে আসে। বিশ্বে ২০১৬ সাল নাগাদ শুধু মাত্র উদ্ভিদের ক্ষতি হয়েছে বা ঝুঁকি বেড়েছে ২১%। আর ২০২০ সালের এ সময় পর্যন্ত এই ঝুঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০%। প্রতিবেদনে বলা হয়, পৃথিবীতে বিদ্যমান ১ লাখ ৪০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ ঝুঁকিতে রয়েছে।

এর মধ্যে ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করায় ৭২৩ রকম উদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে। পৃথিবীতে ভোজ্য উদ্ভিদ আছে ৭ হাজারের বেশি। আর জ্বালানি চাহিদা পূরণে এবং মানুষ, শিল্প কারখানা, বাড়িঘর, আসবাবপত্র নির্মাণে ব্যবহার হয় ২ লাখ ৫০০ উদ্ভিদ। যেখানে ৬ প্রজাতির উদ্ভিদ তথা ভুট্টা, আখ, রাইসরিষা, সয়াবিন, গম থেকে ৎৈবজ্বালানি তৈরি হয়। অবশ্য জাতিসংঘ বলছে, ‘‘বিশ্বের সরকারগুলো পরিবেশ সুরক্ষায় নেয়া একটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও সমর্থ হয়নি।’’

প্রকৃতি প্রদত্ত, স্রষ্টা প্রদত্ত এসব কিছুর গুরুত্ব, তাৎপর্য এবং সংরক্ষণের তাগিদ অনুধাবন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই পরিবেশ প্রকৃতি এবং মানব জাতির জন্য অপরিহার্য ‘জীববৈচিত্র্য’ রক্ষায় চারটি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত বায়োডাইভার্সিটি সামিটে দেয়া ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান।

জীববৈচিত্র্য রক্ষা না পেলে পুরো মানবজাতিই বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে। এই কারণে পৃথিবী ও মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় এসব পদক্ষেপ নিতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহŸান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যে বিশ্বে বাস করি, সেখানে প্রতিটি প্রাণী পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল, এই বাস্তুতন্ত্রে প্রতিটি প্রজাতির আলাদা আলাদা গুরুত্ব ও ভ‚মিকা আছে। কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ডে সেই বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা বোঝাতে ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড’ এবং ‘লন্ডন জিওলজিক্যাল সোসাইটি’র তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

১৯৭০ থেকে ২০১৬ সালে এসে বিশ্বে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ৬৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। “বাংলাদেশ স্বাদু পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু বিশ্বে স্বাদু পানির জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবী তার ৮৫ শতাংশ জলাভ‚মি হারিয়েছে।”

১৯৭০ সালের পর থেকে স্বাদু পানির স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, উভচর প্রাণী, সরীসৃপ এবং মাছের উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে ৪ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে। আমরা জলবায়ুু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়কে বাড়িয়ে তুলছি। ফলস্বরূপ, কোভিড-১৯ এর মতো জুনটিক (অন্য প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে আসা সংক্রামক ব্যাধি) রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

আমরা কেবল অন্যান্য প্রজাতির বিলুপ্তির কারণ হচ্ছি না; আমাদের কর্মকাণ্ড যদি এই ধারাতেই চলতে থাকে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজদের ক্ষতি নিজেরাই ডেকে আনছি। একই সঙ্গে আমরা ক্রমাগত এগিয়ে যাবো নিশ্চিত হুমকির দিকে। আর এ কারণে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে মানব জাতিকে রক্ষা করতে জাতিসংঘের কাছে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তাঁর বক্তৃতায় সুপারিশ তুলে ধরেন।

সুপারিশসমূহ হচ্ছে, বিনিয়োগের সময় খেয়াল রাখতে হবে, তা ভবিষ্যতের জন্য কতটা টেকসই হবে। দ্বিতীয়ত: জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণার মাধ্যমে বৃহত্তর জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং আইন ও নজরদারির ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত: জেনেটিক গবেষণার তথ্য এবং এ সংক্রান্ত প্রথাগত জ্ঞান থেকে প্রাপ্ত সুফল যাতে প্রকৃত স্বত্বাধিকারীরা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বোপরি প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে আমরা বিলুপ্ত হয়ে যাব, না পৃথিবীতে টিকে থাকব। সুতরাং আমাদের অবশ্যই সেসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বজলবায়ু সম্মেলনে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কার্বন নির্গমন কমিয়ে ১.৫ ডিগ্রিতে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই চুক্তি বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ নেয়নি বিশ্ব নেতৃবৃন্দ।

প্রসঙ্গত, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যদিও এ জন্য বাংলাদেশের দায় একেবারেই নগণ্য। এ জন্য দায়ী বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ তথা শিল্পোন্নত দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন, ভারতসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ এ জন্য দায়ী।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার কথা থাকলেও তাও প্রত্যাশিতভাবে দেয়া হচ্ছে না। এমনি অবস্থায় ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের কার্যক্রম শুরুর সময় জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় প্রণয়ন করেন ‘ক্লাইমেট চেঞ্চ স্ট্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান।’

একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট (বিসিসিটি)। উপরোক্ত অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এই গুরুত্ব বিবেচনায় দেশে নানামুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি নতুন নতুন জলাধার সৃষ্টি ও বিদ্যমান জলধারগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নতুন জলাধার সৃষ্টি এবং বিদ্যমান জলাধারগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে।’ গত ১ অক্টোবর গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধনকালে তিনি এই তাগিদ দেন। এসব কাজ করা গেলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে, মৎস্য উৎপাদন বাড়বে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা হবে।

তাতে মানুষের চহিদাও পূরণ সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দসহ আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি। তাহলে মানব জাতি এবং বিশ্বসমূহ ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাবে।

লেখক: সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম






ads