শেয়ারবাজারে আস্থাই ধরে রাখবে স্থিতিশীলতা

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম - সংগৃহীত

poisha bazar

  • মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:৩০

করোনা ভাইরাসে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঝড় বয়ে গেলেও তুলনামূলক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বয়ে যাচ্ছে সুবাতাস। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি তো তা-ই বলছে। বিবিএসের পূর্বের প্রাক্কলন অনুযায়ী গত অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৪ শতাংশ।

তবে অনেকের মতে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে রাজনৈতিক সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো- বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে হতাশার বাণী শোনালেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে তারা বরাবরই তুলনামূলক আশাবাদী ছিল।

বিদায়ী বছরে আইএমএফ-এর জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৩.৮ শতাংশ। এডিবি আরেকটু বাড়িয়ে বলেছিল ৪.৫ শতাংশ। এই অর্থবছর (২০২০-২০২১) নিয়ে তাদের আশার পারদ আরো তুঙ্গে। এডিবির পূর্বাভাস, এই অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৭.৫ শতাংশ। আর সরকারের প্রক্ষেপণ ৮.২ শতাংশ এবং এটা যথার্থই মনে হয়।

কারণ, সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ধীরে ধীরে স্থবিরতা কেটে গতি সঞ্চারিত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে। কারণ, শেয়ারবাজারে একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্রই ফুটে ওঠে। প্রতিদিনই এখন বাজারে নতুন অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে।

পুরনো বিনিয়োগকারীরা যেমন নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করছেন, তেমনি নতুন কিছু বিনিয়োগকারীও টাকা নিয়ে বাজারে ঢুকছেন। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে প্রতিদিন কম-বেশি অর্থ বিনিয়োগ করছেন। শেয়ারবাজারের সূচকেও দেখা দিয়েছে ইতিবাচক প্রবণতা।

তাই গত ১০ সেপ্টেম্বর ডিএসই ব্রড ইনডেক্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে বছরের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ১১ পয়েন্টে। ঠিক ১ বছর আগে সর্বশেষ ৮ সেপ্টেম্বর ডিএসই এক্স সূচকটি ৫ হাজার ৩৪ পয়েন্টের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছিল। সূচকের গতির মতো লেনদেনেও দেখা যাচ্ছে বেশ গতি, যা ১ হাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার মধ্যে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলে থাকেন, এই পরিমাণ লেনদেন নাকি বাজার স্থিতিশীলতার লক্ষণ। তাহলে কি বোঝা যাচ্ছে আমাদের শেয়ারবাজার মোটামুটি স্থিতিশীলতার পথে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে করোনার আগেও চীন-আমেরিকা বাণিজ্য দ্বন্দ নিয়ে বিশ্লেষকদের মতে বিশ্বমন্দার আশঙ্কা দেখা দিলেও তার প্রভাব সার্বিকভাবে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে পড়েনি। বরং বছরের শুরুতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল।

তবে গত ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) কর্তৃক করোনা ভাইরাসকে বিশ্বব্যাপী ছড়ানো মহামারী ঘোষণার আগেই বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে শুরু হয় ব্যাপক (রেকর্ড পরিমাণ) দরপতন। করোনা ভাইরাসের ব্যাপকতায় আমেরিকার এসএন্ডপি ৫০০ সূচক ৩ হাজার ৩০০ পয়েন্ট থেকে ২৩ মার্চ ২ হাজার ২৩৭ পয়েন্টে নেমে আসে।

এ সূচকটি এখন ১০ সেপ্টেম্বর ৩ হাজার ৪১৭ পয়েন্ট। এত অল্প সময়ে মার্কিন শেয়ারবাজার যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এত বড় প্রত্যাবর্তনের নজির ইতিহাসে আর দেখা যায় না। আমেরিকার শেয়ারবাজারের এই চাঙ্গাভাবকে কেউ কেউ ব্যতিক্রম ঘটনা বলতে পারেন, কিন্তু এপ্রিলের শেষের ভাগ থেকে ইউরোপীয় ও জাপানি শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মাত্র কয়েক বছর আগেও প্রবৃদ্ধির গতি সন্দেহাতীতভাবে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু এখন দেশের মন্দামুখী অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৪৫ বছরের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। ধুঁকছে অটোমোবাইল, পোশাক ও নির্মাণ শিল্প।

নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। ১৯৯১-এর পর আর্থিক প্রবৃদ্ধির গতি গত কয়েক বছর ধরেই সবচেয়ে ধীর বা তলানিতে। অর্থনীতি এক প্রকার বিপর্যস্ত কিন্তু এর মধ্যেও শেয়ারবাজারের গতি ঊর্ধ্বমুখী হয়ে এ বছরের ২০ জানুয়ারি বিএসই সেনসেক্স ৩০ ইন্ডেক্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ চূড়া ৪২ হাজার ২৭৩ পয়েন্টে পৌঁছায়।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সূচকটি রেকর্ড পরিমাণ পতন হয়ে ২৪ মার্চ ২৫ হাজার ৬৩৮ পয়েন্টে নেমে আসে। এই পতনের হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। দেশটি বিশ্বে করোনায় আক্রান্তে শীর্ষ দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করলেও বিশ্বের অন্যসব শেয়ারবাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফের ঘুরে দাঁড়াল, যা এখন ১০ সেপ্টেম্বর ৩৮ হাজার ৮৬৫ পয়েন্ট।

বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার হিসাবে ২০১৯ সালে বিশ্বে পণ্য বাণিজ্য হয়েছে ১৯ লাখ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ শতাংশ কম। এপ্রিল মাসে ডবিøউটিও প্রাক্কলন করেছিল-চলতি বছর করোনা ভাইরাসজনিত কারণে বিশ্ববাণিজ্য ১৩ থেকে ৩২ শতাংশ কমতে পারে। তবে আশার কথা হলো, স্থবিরতা ধীরে ধীরে কাটছে।

শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায় তা নির্ভর করছে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ওপর। এক কথায় বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যয়ের মধ্যে থাকলেও এরই মধ্যে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। অন্যদিকে আমাদের দেশের শেয়ারবাজার কখনই অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে ওঠেনি।

বিগত ১০ বছরের তথ্য-উপাত্ত তাই প্রমাণ করে। প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬ শতাংশের ওপরে। এর মধ্যে ২০১৬ সাল থেকে ৭ শতাংশের ওপরে এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৩৪৭ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার।

জিডিপির আকার অনুযায়ী বিশ্বে আমাদের অবস্থান ৩৯তম। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী এখন মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ২ হাজার ৬৪ ডলার। গত ১১ বছরে দেশের জিডিপির আকার বেড়েছে তিনগুণ। অথচ এই ১০ বছর ধরেই আমাদের শেয়ারবাজার স্থবির। ২০১৩ সালে ২৮ জানুয়ারি সূচকটি চালু হয়।

দিন শেষে সূচক ছিল ৪ হাজার ৯০ পয়েন্ট। বিগত সাত বছর ধরে গড়ে সূচকটি ২৫ দশমিক ৯০ শতাংশ ওঠা-নামা করে, অষ্টম বছর ২০২০ সালে সূচকটি এটার সূচনালগ্নের নিচে নেমে এসেছে। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে দেশের করোনা পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। তাই শেয়ারবাজারে শুরু হয় অস্বাভাবিক পতন।

১৮ মার্চ সূচক নেমে আসে ৩ হাজার ৬০৩ পয়েন্টে। কারণ, আমরা এমন এক শ্রেণির বাঙালি যারা, যে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করায় দক্ষ। আর এই পতন ঠেকাতে গত ১৯ মার্চ থেকে সর্বনিম্ন মূল্যস্তর (ফ্লোর প্রাইস) বেঁধে দেয়া হয় এবং লেনদেনের সময়ও ১ ঘণ্টা করে কমিয়ে আনা হয়।

করোনার কারণে সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শেয়ারবাজারের লেনদেন বন্ধ রাখা হয়। শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এই প্রথম ৬৬ দিন টানা বন্ধের পর ৩১ মে আবার চালু হয়েছে লেনদেন। শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্যস্তর বেঁধে দিয়ে সূচকের পতন আটকে রাখা হয়েছে ঠিকই। তবে লেনদেন ফিরে গেছে এক যুগ আগে। কখনও সূচক, আবার কখনও লেনদেন ফিরে যাচ্ছে বিদায়ী বছরগুলোতে।

উত্থানের নতুন রেকর্ড বাদ দিয়ে তাই খুঁজতে হয় সর্বনিম্নের রেকর্ড পেছনের বছরের পাতায়। মহামারী প্রকোপ চললেও আতঙ্ক দূরে ঠেলে ইতিমধ্যে স্বাভাবিক হয়েছে দেশের জনজীবন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। দেখা মিলছে বড় উত্থানের।

দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে শেয়ারবাজারে ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। ফলে গত ২৩ জুলাই থেকে সূচকে বেশ চাঙা ভাব, প্রায় একটানা ঊর্ধ্বমুখী। বেড়েছে লেনদেন ও বাজার মূলধন। সম্প্রতি বিএসইসি চেয়ারম্যান বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ঘোষণা দিয়েছেন।

ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে খারাপ আইপিও তালিকাভুক্ত হবে না বলেও বিনিয়োগকারীদের অভয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলো যেন কয়েক ধরনের আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করতে না পারে সে পদক্ষেপ নিয়েছেন। ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এর মাধ্যমে একটি কমন প্লাটফর্ম তৈরির কথা বলেছেন।

এছাড়া শৃঙ্খলা ফেরাতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ২২টি কোম্পানির ৬১টি পরিচালককে ন্যূনতম শেয়ার ধারণ নিয়ে আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বের মতো নির্ধারিত সময়ে কোম্পানিগুলোর মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের (পিএসই) সকল কার্যক্রম এবং এজিএম ও ইজিএম করার নির্দেশ দিয়েছেন।

নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেয়ার পর শেয়ারবাজারে নতুন নতুন প্রোডাক্ট আনার জন্য কাজ করছে। এসব পদক্ষেপে কিছুটা হলেও বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি আস্থা বাড়ছে। তবুও যেন শঙ্কা কিছুটা থেকেই যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা বারবার হোঁচট খাওয়ার কারণে আস্থা ফিরতে কিছুটা সময় লাগছে।

বিনিয়োগকারীরা এই পদক্ষেপগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন দেখতে চান, যা বিগত বছরগুলোতে শেয়ারবাজারে ছিল না। ছিল সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও অদক্ষতা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতায় বারবার এই বাজারে এসে প্রতারিত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার আশ্বাসে আস্থা রেখে নিঃস্ব হয়েছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ হচ্ছে শেয়ারবাজারে গুডগভর্ন্যান্স বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করা। শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, এ বাজারের মূল সংকট হলো আস্থার। শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এমনিতেই বেড়ে যাবে।

শেয়ারবাজার কখনই একক, কিছু ব্যক্তিশ্রেণি বা প্রতিষ্ঠানের মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায় না। এটা সামগ্রিকভাবে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন ঘটায়। বিনিয়োগকারীদের সামগ্রিক শেয়ারবাজারে আস্থার পাশাপাশি নিজেদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ওপর আস্থা রাখতে হবে, যা একজন বিনিয়োগকারী অর্জন করেন দীর্ঘ জানাশোনা ও বিনিয়োগ শিক্ষার মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিষয়ে সঠিক জ্ঞানই বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, যা পরবর্তীকালে সামগ্রিক শেয়ারবাজারের ওপর আস্থায় পরিণত হয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা কখনই বিনিয়োগকারীর লাভ-ক্ষতির নিশ্চয়তা প্রদান করে না বা বিনিয়োগে বাধ্য করে না। তাই বিনিয়োগকারীদের নিজেদের ভেবেচিন্তে, গুজবে কান না দিয়ে, কোম্পানির মৌলভিত্তি বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আস্থা রাখতে হবে বিনিয়োগকৃত কোম্পানির ওপর অর্থাৎ পরিচালনা পর্ষদের ওপর, যাদের পরিচালন দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে কোম্পানির ভবিষ্যৎ ও বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ।

লেখক: পুঁজিবাজার বিশ্লেষক





ads