কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার

রায়হান আহমেদ তপাদার
রায়হান আহমেদ তপাদার - সংগৃহীত

poisha bazar

  • রায়হান আহমেদ তপাদার
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:২৫

মহামারী করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্বকেই বদলে দিচ্ছে। সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে এই ভাইরাস বদলে দিচ্ছে বিশ্ব রাজনীতিকে। পৃথিবীর নেতৃত্বের ব্যাটন কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে দোলাচল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুরু হয়েছিল দ্বিমেরু বিশিষ্ট বিশ্ব রাজনীতি।

একদিকে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে এককেন্দ্রিক করে তোলে। সেই বৃত্তের কেন্দ্রে ছিল শুধুই যুক্তরাষ্ট্র। গত কয়েক বছরে সেই বৃত্তে আলাদা প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেছে চীন ও রাশিয়া।

ওদিকে জাতিসংঘ ক্রমেই খেলনা পুতুলে পরিণত হচ্ছে। দিন দিন শক্তি ও প্রভাব হারাচ্ছে সংস্থাটি। আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও সুবিধের নয়। সব মিলিয়ে নতুন করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে সমগ্র বিশ্বে একটি ওলট-পালট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে জার শব্দটির ব্যবহার নতুন নয়। জার হচ্ছে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী রাজাদের উপাধি। রাশিয়ায় জার শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন তৃতীয় ইভান যিনি ১৫৪৭ সালে নিজেকে জার হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে জার শাসকের পতন ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক শাসনের গোড়াপত্তন হয়েছিল।

অনেকে পুতিনের শাসনব্যবস্থাকে জার শাসনের পুনরাবৃত্তি হিসেবেই দেখতে চাইছেন। রুশ জাতীয়তাবাদী নীতির পুনর্জন্ম ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত সুকৌশলে যেটি করেছেন তা হলো তার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশলী রাজনীতির আশ্রয়।

ভ্লাদিমির পুতিনের সাংবিধানিক সংশোধনকে কেন্দ্র করে অনেকেই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন; পুতিন কী রাশিয়ার নয়া জার? এ প্রশ্নটির উত্তর জানতে হলে, রাশিয়ার জার রাজাদের শাসনব্যবস্থা ও পুতিনের শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা দাঁড় করানো জরুরি।

রুশ সাম্রাজ্যের জার শাসকরা সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতি অনেক মনোযোগী ছিলেন। একেক জারের শাসনামলে রুশ সাম্রাজ্যের পরিস্থিতি ছিল একেক রকম। কখনোবা সামরিক সুব্যবস্থাপনা, সাম্রাজ্য বিস্তার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে জার শাসকরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল, কখনো আবার যুদ্ধ, হানাহানি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও অনৈতিকতার কারণে জার শাসকের পতন ঘটেছে।

অন্যদিকে পুতিন ২০০০ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সাংবিধানিকভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন পুতিন। অতঃপর ২০০০ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে পুরোপুরি প্রেসিডেন্ট বনে যান তিনি।

কেজিবির এজেন্ট থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট; শুরু হলো আধিপত্য বিস্তারের খেলা। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত রাশিয়ার সর্বময় ক্ষমতাধর নেতা তিনিই। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে কখনো প্রেসিডেন্ট, কখনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাশিয়ার রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন।

২০০০ সালে প্রথমবার যখন পুতিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ছিল চার বছর এবং সংবিধানের নিয়মানুসারে কোনো ব্যক্তি পরপর দুবারের বেশি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়াতে পারতেন না।

যার ফলে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট থেকে সাংবিধানিক কোনো বাধার মুখোমুখি পুতিন হননি। প্রথম মেয়াদ শেষে অনায়াসে ২০০৪ সালের নির্বাচনে আবার প্রেসিডেন্ট হন পুতিন। দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হয় ২০০৮ সালে। বিপত্তিটা ঠিক তখনই বাধে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে পুনরায় লড়তে পারছেন না তিনি।

ঠিক তখনই তিনি কৌশলী রাজনীতির প্রথম খেলাটা খেলেন। পুতিন তার রাজনৈতিক অনুগত দিমিত্রি মেদভেদেভকে রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড় করালেন। আর তিনি হলেন মেদভেদেভের মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী। মেদভেদেভ রাষ্ট্রপতি থাকা কালেও ক্ষমতার বলয়ের শীর্ষবিন্দুতে ছিলেন পুতিন। এমনকি রাজতন্ত্রে পরিচালিত রুশ সাম্রাজ্যের মানচিত্র ছিল বিশ্বব্যাপী।

যেমন-ইউরেশিয়া, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল রুশ সাম্রাজ্য। আধিপত্য বিস্তার আর রাজ্য দখলই ছিল রুশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস। রুশরা মনে করেন, রাশিয়ার পুরনো সাম্রাজ্য ও প্রতিপত্তি পুনরুদ্ধারের নায়ক হলেন পুতিন। তিনি রুশদের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন, রুশ জাতীয়তাবাদ চেতনাকে নতুনভাবে জাগ্রত করেছেন।

২০১৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার সংযোগ রাশিয়ার জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরো উসকে দেয় এবং পুতিন হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। কেজিবি এজেন্ট পুতিন বিষয়টি খুব ভালোভাবে ঠাহর করতে পেরেছিল। এ কারণে তিনি ২০০০ সালে ক্ষমতায় আরোহণের পর অভ্যন্তরীণভাবে রাশিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রক্রিয়া হাতে নেন।

এটি করতে গিয়ে তিনি খুব দ্রুত গণমাধ্যমকে নিজের আওতায় নিয়ে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউসের তথ্য অনুসারে, রাশিয়ার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একেবারে তলানিতে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম পুতিনকে রাশিয়ার রাজনীতিতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে যথেষ্ট সহায়তা করেছে।

পুতিন কেবল দেশকে অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ করেই ক্ষান্ত হননি বরং রাশিয়াকে বিশ্ব রাজনীতিতে সম্মানজনক চেয়ার এনে দিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। এ ক্ষেত্রে সিরিয়ায় রাশিয়ার হস্তক্ষেপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে রাশিয়ার অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা খাতকে পুনর্গঠন করেছেন পুতিন। সেই সঙ্গে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়টি পুতিনকে বিশ্ব নেতৃত্বেও সামনের কাতারে নিয়ে আসে।

এভাবে শেষ হলো প্রধানমন্ত্রী পদে থেকে রাজনীতির কলকাঠি নাড়ানোর চার বছর। সময় এলো ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের। এবার আর পুতিনের প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে কোনো সাংবিধানিক বাধা রইল না। অন্যদিকে এত দিনে পুতিনের রাজনৈতিক পিরামিড তৈরি হয়ে গেছে। সুতরাং তিনি আবার প্রেসিডেন্ট।

অবশ্য তার আগে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে কৌশলী রাজনীতির দ্বিতীয় খেলা খেলেন পুতিন। সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে করলেন ছয় বছর। অর্থাৎ আবার দুই মেয়াদে টানা ১২ বছরের জন্য রাশিয়ার সর্বোচ্চ কর্ণধার।

তবে উল্লেখ্য যে, দুই হাজার বারো সাল থেকে দুই হাজার আঠারো সাল পর্যন্ত তৃতীয় মেয়াদ শেষ হলে দুই হাজার আঠারো সালের নির্বাচনে জয় লাভের মাধ্যমে পুতিন চতুর্থবার (দুুুই হাজার বারো সাল থেকে টানা দ্বিতীয়বার) প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। তার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে।

তবে তার তীণ্ন ও সুদূরপ্রসারী বুদ্ধিসম্পন্ন এই রাজনীতিবিদ ২০২৪ সালে তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কৌশলী রাজনীতির তৃতীয় খেলাটা খেললেন। যেহেতু দেশটির বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী এরপর তিনি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে পারতেন না, ফলে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে তিনি সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন।

এরই ধারাবাহিকতায় সংবিধান সংশোধনের ওপর সাত দিনব্যাপী রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভোট, যা শেষ হয়েছে গত ১ জুলাই। দেশটির নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, ৭৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংশোধনের পক্ষে এবং ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।

মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। গত ৩ জুলাই সংশোধিত সংবিধানে স্বাক্ষর করেন পুতিন এবং ৪ জুলাই থেকে সংশোধিত নতুন সংবিধান কার্যকর হয় (রয়টার্স)। ভোটে সংবিধান সংশোধনের ওপর রায় আসায়, পুতিন আরো দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বেতা করার বৈধতা পাচ্ছেন।

অর্থাৎ ২০২৪ সালের পর আবার নির্বাচনে জয়লাভ করলে আরো ১২ বছর অর্থাৎ দুই হাজার ছত্রিশ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন তিনি। মোটকথা, আজীবন প্রেসিডেন্ট পদে থাকার পথ সুগম হলো পুতিনের। আসলে পুতিন রাশিয়ার শাসন ব্যবস্থায় এক ধরনের পিরামিড তৈরি করেছেন, যেখানে রাষ্ট্রের আইন,শাসন ও বিচার বিভাগ পুতিনের নির্দেশনার বাইরে নয়।

রাজনীতিতে ক্ষমতা বৈধকরণে পুতিন বরাবরই রাষ্ট্রের কাঠামো, আইন ও সংবিধানকে নিজের ইচ্ছার আদলে সাজিয়েছেন। এমনকি ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ীকরণে তার নেয়া পদক্ষেপ সমূহ ছিল গণতন্ত্রের মোড়কে ঢাকা। রাশিয়ার জনগণ আপাতদৃষ্টিতে এটিকে প্রশ্নের আওতায় আনতে পারেনি কিংবা প্রশ্নের আওতায় আনার আগেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

তবে যুগোপযোগী ভিন্ন রাজনৈতিক সুকৌশলই পুতিনকে আধুনিক রাশিয়ার অপ্রতিরোধ্য শাসক হয়ে উঠতে সহায়তা করেছে। তাই পুতিনকে নয়া জার না বলা হলেও, রাশিয়ার কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার বলা যেতেই পারে। বর্তমানে করোনা মহামারীতে বিশ্ব যখন প্রায় টালমাটাল, দিন দিন যখন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, তখনো থেমে নেই পুতিনের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার অভিলাষ।

করোনাকালে সংকটের মধ্যেই পুতিন তার দেশে আয়োজন করেছেন সংবিধান সংশোধনের ওপর গণভোট। গণভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উপায়ে পুতিন আবার দেশ শাসনের সুযোগকে বৈধ করে নিয়েছেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রুশ সাম্রাজ্যের জার শাসক ও আধুনিক রাশিয়ার শাসক পুতিনের রাজনৈতিক কলাকৌশলে যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুতিনকে নয়া জার বলা যায় কি না সে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট





ads







Loading...