জিয়াউদ্দিন তারিক আলীকে মনে রেখে


poisha bazar

  • শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
  • ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:১৬

জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন পার হলেও তিনি নেই ভাবতেই মনটা যেন কেমন করে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন ও প্রগতির লড়াইয়ের জন্য বিরাট ক্ষতির ব্যাপার হয়ে গেল।

প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনার ধারক বাহক জিয়াউদ্দিন তারিক আলী আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য রেখে গেছেন দৃঢ় প্রত্যয়ে ভরা সত্য সুন্দরের চেতনার জ্বলন্ত মশাল। যে মশালের প্রজ্বলিত আলোক শিখার পবিত্রতাকে প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার বাহকদেরকেই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

জিয়াউদ্দিন তারিক আলী ২৩ ভাদ্র সোমবার ১৪২৭ বাংলা ইংরেজি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ সোমবার সকাল এগারোটায় বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে পত্রিকার ভাষ্যমতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল পঁচাত্তর বছর। রেখে গেছেন স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ অসংখ্য প্রগতিশীল ভাবনায় স্নাত গুণগ্রাহী।

আলোর পথের যাত্রীরা মনে করেন, তার চলে যাওয়ায় সুন্দরের পথের যাত্রীবাহী গাড়িটাকে যেন মাঝে পথে কেউ থামিয়ে দিতে না পারে, সে ব্যাপারে তাঁর ভাব-শিষ্যদেরকেই সজাগ থাকতে হবে। কেননা আজকাল দেখা যায় অশুভ শক্তির ধারক বাহকরা আমাদের প্রগতির মশালকে নিভিয়ে দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে তৎপর হয়ে আছে।

অশুভ শক্তির ধারক বাহকরা আজ ঘরে-বাইরে, এমনকি আপনদলের মধ্যেও লুকিয়ে থেকে আমাদের চরম ক্ষতি করে যাচ্ছে। জিয়া উদ্দিন তারিক আলীর গুণগ্রাহীরা মনে করেন উনার আরো অনেক বছর বাঁচার প্রয়োজন ছিল প্রগতির লড়াইয়ের স্বার্থে।

এখন সময় অন্যরকম। দেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী আমাদের সমস্ত অর্জন ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। আমাদের চেতনার বিরোধীরা গলা তুলে কিংবা চোখ রাঙ্গিয়ে আমাদেরকে যখন গালমন্দ করতে চায়, তখনই প্রয়োজন জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মতো সৎ ও প্রগতির চেতনায় নিবেদিত লোকদের।

আমরা যারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, তাদের পরম বন্ধু ছিলেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী লোকজন জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর শূন্যতা প্রতি মুহূর্তেই অনুভব করবেন। প্রয়াত জিয়াউদ্দিন তারিক আলী ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর।

তার না ফেরার দেশে চলে যাওয়া অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিরাট শূন্যতাময় চিন্তার ব্যাপার হয়ে দেখা দেবে। প্রগতিবিরোধী লোকেরা তাঁকে পছন্দ করতেন না। পছন্দ করার কথাও নয়। কেননা তিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন যেমন নিজে দেখতেন এবং অন্যদেরকেও দেখতে বলতেন।

যে ব্যক্তি নিজের শুভ চেতনায় শানিত হয়ে তাঁর চেতনার আলোক রেখা সুন্দরের অভিপ্রায়ে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান, তাকে কি প্রতিক্রিয়াশীলরা ভালোবাসতে পারে। নিশ্চয়ই কোনো প্রগতিবিরোধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মতো মানুষকে ভালোবাসতে পারে না।

যারা রাজনৈতিক সচেতন তারা সকলেই জানে জিয়াউদ্দিন তারিক আলী গণমানুষের লোক ছিলেন। যেখানেই মানুষের ওপর অন্যায় হয়েছে, সেখানেই তিনি স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। নিজে যেমন অন্যায় করেননি, ঠিক তেমনিভাবে অন্যায়কে কখনো আশ্রয় প্রশ্রয় দেননি।

এমন একজন সৎ মনোভাবাপন্ন সাদা মনের মানুষ যখন না ফেরার দেশে চলে যান, তখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মন দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে আগামী দিনের চিন্তায় মনপ্রাণ অন্তর ভয়ার্ত হয়ে ওঠে। এমন প্রকৃতির মানুষ সামাজিক জীবনে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মনের গভীর গোপনে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকেন। সাধারণ মানুষ প্রকৃত অর্থেই জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মতো মানুষকে বন্ধুর মতো দেখে থাকে এবং আপন দলের লোক মনে করে সারা জীবন ভালোবেসে যায়।

সংগীত পাগল মানুষ মাত্রই জানেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী গান পাগল মানুষ ছিলেন। সুরের দোলায় দোলে তিনি মানুষের মনের কথাগুলো সংগীতের সুরেলা সুরে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন। তার গানের মধ্যে সাধারণ শ্রোতারা পেত তাদের মনের ভেতরের কথাগুলো। তিনি গানের লোক ছিলেন।

তাই ১৯৭০-১৯৭১ সালে গণসংগীতের দলে যুক্ত হয়ে দেশ এবং জাতির অধিকার নিয়ে রাজপথে গণমানুষের গান গেয়ে বেরিয়েছেন। জিয়াউদ্দিন তারিক আলী আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধকালে পথে প্রান্তরে বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে গণসংগীত পরিবেশন করে দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন।

তাঁর গান শুনে দেশের আবালবৃদ্ধ-জনতা মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে অংশগ্রহণ করেছে। তিনি গান গেয়ে যেমন পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তেমনি করে দেশমাতৃকার টানে মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে, শরণার্থী ক্যাম্পে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং শরণার্থী ক্যাম্পের মানুষদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

দেশের জন্য এমন একজন মহৎ প্রাণ মানুষ ছিলেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। তিনি শুরু থেকেই সীমান্ত পারি দিয়ে অনেকের মতো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সংবাদপত্রের ভাষ্যমতে, লিয়ার লেভিন ধারণকৃত সেই দলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ফুটেজ কয়েক দশক পর উদ্ধার করেন।

তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ এবং তাদের সঙ্গী ছিলেন। নিউজার্সিতে সেই সময় কর্মরত ছিলেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। তারেক মাসুদ নির্মাণ করেন মুক্তির গান প্রামাণ্যচিত্র। তারেক মাসুদের নির্মাণ করা প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির গান সাধারণ মানুষের কাছে খুবই প্রশংসিত হয়।

তারেক মাসুদ নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ দেশের মাঝে এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি করে যে, যা দেখে সাধারণ মানুষের মাঝে বিশেষ করে, যুব সমাজের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আরো ধারালো হয়ে ওঠে। তারেক মাসুদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্য চিত্র ‘মুক্তির গানে’ মধ্যমণি ছিলেন জিয়া উদ্দিন তারিক আলী।

আজীবন বিপ্লবী সমাজ সেবক জিয়াউদ্দিন তারিক আলী সমাজের সর্বস্তরে চেয়েছেন সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লব ঘটিয়ে মানুষকে সুন্দরের পথে নিয়ে যেতে। একথা বলার প্রয়োজন পড়ে না যে, তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের মতো চেয়েছেন গানে গানে সকল পিছু টানের বন্ধন ছিন্ন করতে। ছায়ানট থেকে শুরু করে বুলবুল ললিতকলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংগীত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি লতার মতো জড়িয়ে থেকেছেন। তিনি সংগীতকে গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছেন।

কাজপাগল মানুষ কখনো কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। জিয়াউদ্দিন তারিক আলীও একজন কাজপাগল মানুষ ছিলেন। তিনিও কাজ ছাড়া থাকতে পারতেন না। সামাজিক আন্দোলন ছিল তার কর্মক্ষেত্রের আরেকটি দিক। তাই জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মৃত্যু আমাদের সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিরাট এক শূন্যতা নিয়ে আসবে।

জিয়াউদ্দিন তারিক আলী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে আপন সন্তানের মতো গড়ে তুলেছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান প্রেম। তিনি দেশের অসহায় অধিকারহীন মানুষকে যেমন ভালোবাসতেন ঠিক ততটাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসতেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের।

আমাদের উচিত হবে জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর অসমাপ্ত কাজ তার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসাবে সমাপ্ত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের মধ্যে আরো দৃঢ়ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া। তবেই তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসাবে আমরা নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারব এবং মানুষের মাঝে একাত্তর এর মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সকল ক্ষেত্রে মেলে ধরতে পারব।

আমরা তখনই জিয়াউদ্দিন তারিক আলীকে তাঁর যোগ্য সম্মান দিতে পারব, যদি আমরা সকল লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর সকল প্রগতিশীল কর্মকে আপন সত্তা দিয়ে বিপ্লবী ভালোবাসায় সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারব।

লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট

 





ads