ভিডিও গেমে আসক্তি বাড়ছে


poisha bazar

  • আসাদুল্লাহ আল গালিব
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:৫৮,  আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:৫৬

এখন আর মাঠে গিয়ে ধুলা-কাদা মাখা হয় না। খেলা শেষে বাড়ি ফেরার পথে সেই ব্রিজের ওপর থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করার যে আনন্দ, তা যেন আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে। শহরের ইট, পাথর আর কংক্রিটের আড়ালে আটকা পড়ছে শিশুদের বর্ণিল শৈশব। গ্রামের শিশুরা খেলাধুলার কিছুটা সুযোগ পেলেও শহরের শিশুদের সে সুযোগ কম।

পাড়ায় পাড়ায় খেলার জায়গার অভাব, পড়ার চাপ, যেমন তেমন বাইরে গেলে খারাপ হবার ভয়! কতই না অভিযোগ অভিভাবকদের! তার বদলে অভিভাবকরা বিনোদনের নামে যা তুলে দিচ্ছেন ছেলে-মেয়েদের হাতে, তার ক্ষতির পরিমাণটা তাদের ধারণারও বাহিরে।

বিশেষ করে শহুরে বাচ্চাদের চিত্র ক্রমেই মারাত্মক হয়ে উঠছে। শহুরে বাচ্চারা আস্তে আস্তে যখন বেড়ে উঠতে শুরু করে, তখন থেকেই তারা স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে ভিডিও গেম অথবা ইউটিউবে কার্টুন/এনিমেশন ভিডিও দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। বড়দের মতো শিশুদের মধ্যেও ভর করছে শহুরে যান্ত্রিকতা।

ফলে তারা খেলাধুলার আনন্দ খুঁজে ফিরছে মাউসের বাটন টিপে, কম্পিউটারের পর্দায় গেমস খেলে, কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। অনেক সময় তাদের এ আকর্ষণটা চলে যাচ্ছে আসক্তির পর্যায়ে। ধীরে ধীরে তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কম্পিউটার-মোবাইল-ট্যাব গেমসের ওপর। এজন্য প্রথমেই বলা যায়, ভিডিও গেমস আমাদের শিশু-কিশোরদের প্রকৃত শৈশব-কৈশোর কেড়ে নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইদানিং কমবয়সী অর্থাৎ ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ইন্টারনেটে ডুবে থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

যুক্তরাজ্যে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৩-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু সপ্তাহে ৩০-৩৫ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ব্যয় করে ভিডিও গেমস, কম্পিউটার, ই-রিডার্স, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য স্ক্রিনভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পেছনে। তবে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। কয়েক বছর আগে একটি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ফেসবুক ব্যবহারকারী হিসেবে ঢাকা শহরের নাম উঠে আসে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আট বছরের শিশুরাও ব্যবহার করছে ফেসবুক।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ভিডিও গেমসের আবিষ্কার হয় ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে। তারপর সত্তর-আশির দশকের মধ্যে এটি জনপ্রিয়তায় পৌঁছে। সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে নির্মিত আর্কেড টাইপের ভিডিও গেম-এর নাম ছিল কম্পিউটার স্পেস। এরপর আটারি কোম্পানি বাজারে আনে বিখ্যাত গেম পং। তারপর ধীরে ধীরে আটারি, কোলেকো, নিনটেনডো, সেগা ও সনির মতো ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো নানা উদ্ভাবন ও প্রচারণা চালিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে মানুষের ঘরে পৌঁছে দেয় পুঁজিবাদী সভ্যতার এ বিনোদনপণ্য।

২০০০ সালে সনি কোম্পানি জরিপ করে দেখেছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি বাড়ির একটিতে একটি করে সনি প্লে স্টেশন আছে। ২০০৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শতকরা ৭০ ভাগ আমেরিকানের বাড়ির সব সদস্যই ভিডিও গেম খেলে। তারপর সময় বদলেছে। কম্পিউটার এবং ভিডিও গেমস ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম লাভজনক ও দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প ইন্ডাস্ট্রি।

বিশ্বজুড়ে আজ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে ভিডিও গেম এবং গেমাররা। সা¤প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে ভিডিও গেম খেলে থাকে। যাদের অধিকাংশই হচ্ছে অল্প বয়সী শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী। এদের বদৌলতে গ্লোবাল ভিডিও গেম বাজারের আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০৮.৯০ মিলিয়ন ডলার! এর মধ্যে ‘মোবাইল গেমিং’ই হচ্ছে সবচে বেশি পয়সা আয় করা সেক্টর। স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে গেমিং প্রতি বছর ১৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পাবজি, ফ্রি ফায়ার বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন গেম। গত বছর থেকে এ বছরে কয়েকগুণ বেড়েছে এই গেমের জনপ্রিয়তা। মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার দুটোতেই খেলা যায় এই গেম। তবে এ সকল গেমের কম্পিউটার ভার্সনের থেকে মোবাইল ভার্সনটিই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে এখন প্রতি মাসে প্রায় ২২৭ মিলিয়ন মানুষ এই পাবজি গেমটি খেলে। আর প্রতিদিন খেলে প্রায় ৮৭ মিলিয়ন মানুষ। বাংলাদেশেও প্রতিদিন এ গেম খেলছেন ১ কোটি ৪০ লাখ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক গবেষণায় জানিয়েছে, ভিডিও গেমে আসক্তি এক ধরনের মানসিক রোগ। ভিডিও গেমগুলো একজন খেলোয়াড়ের ডিপ্রেশনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, যেকোনো আসক্তিই খারাপ। এই অনলাইন গেমে যদি আসক্তি তৈরির উপাদান থাকে, এটি যদি আসক্তি তৈরি করে তাহলে তাতে আচরণগত সমস্যা তৈরি হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। প্রাত্যহিক কাজে মনোযোগ কমে যায়। আচরণগত সমস্যা তৈরি হলে এ ধরনের গেম নিয়ে ভাবনার বিষয়।

গেমসের কারণে মারমুখী ক্ষ্যাপাটে আচরণ, বাবা-মার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার, অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে পড়া, ইন্টারনেট না থাকলে অথবা মোবাইল বা কম্পিউটারের চার্জ ফুরিয়ে গেলে অস্থির-আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ার ঘটনা তো অহরহই ঘটছে। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে দিয়েছে যে, নেশা মানেই শুধু মদ বা মাদক নয়।

নেশা বা মাদকাসক্তি কেবল মদ-গাঁজা, আফিম-হেরোইন ও বিড়ি-সিগারেটের সেকেলে পরিসরে আবদ্ধ নেই। কালের পরিক্রমায় প্রযুক্তির কল্যাণে এবং পুঁজিবাদী সভ্যতার বদান্যতায় নেশার পতিত অঙ্গনেও লেগেছে ডিজিটালের ছোঁয়া! ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ধ্বংসাত্মক ভিডিও গেমসে বুঁদ হয়ে থাকার ফলে বিশ্বব্যাপী মানুষ এমন নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে, যা থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন।

ভিডিও গেমসের মধ্যে শিশু, কিশোর এমনকি যুবকরাও এতই সময় ব্যয় করছে যে, তাদের পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া সবই শিকেয় উঠেছে। বর্তমানে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় ধস নেমেছে এসব ভিডিও গেমের প্রতি আসক্তির কারণে। শিক্ষক অভিভাবকরা এ নিয়ে এখন চিন্তিত।

বাস্তবতা হলো, খুব কম মানুষই বর্তমানে গেমিং রোগের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। ভিডিও গেমসের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে রং-বেরঙের দৃশ্যপট পরিবর্তন, সারাক্ষণ অবিশ্বাস্য গতিতে ছোটাছুটি, জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে থাকা- এসব গেমারের মানসিকতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দেখা যাচ্ছে, কোন কিছুতেই তাদের স্থিরতা থাকছে না। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা তাড়াহুড়ো করছে। অযথা সন্দেহ-অবিশ্বাস তাদের মধ্যে জেঁকে বসছে।

ইন্টারনেট বা গেম খেলা কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়। কিন্তু এর ক্ষতিকর, অযৌক্তিক, অপরিমিত ব্যবহার চিন্তা এবং আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। এই ইন্টারনেটের ব্যবহার বা গেম খেলার বিষয়টি যখন তার চিন্তা আর আচরণের ওপর খারাপ ধরনের প্রভাব ফেলবে, সামাজিক দক্ষতা কমিয়ে দেবে বা দৈনন্দিন জীবনযাপনের মান খারাপ করে দেবে তখন তা আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। অল্পতেই তারা ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছে। বাস্তব জীবনেও নিজের পরাজয়কে তারা মেনে নিতে পারছে না। আর এসব প্রবণতা শিশুদের ক্রমেই নেতিবাচক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এসকে





ads







Loading...