অন্তহীন ভোগান্তিতে প্রবাসীরা

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার - সংগৃহীত

poisha bazar

  • রিন্টু আনোয়ার
  • ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:৫৪,  আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:৩৮

করোনা নামের মহামারীতে দেশ-দুনিয়া তছনছ হয়ে গেলেও দমেনি মানব পাচারকারীরা। অপকর্মে সামান্যতম বিরতি বা কমতি নেই তাদের। ক্ষেত্রবিশেষে আরো ড্যামকেয়ার- বেপরোয়া। পাচারকর্মের ধরন তথা কলাকৌশলে আরো আপডেট এনেছে। কেবল বেকার বা কাজপাগল যুবক নয়, নারী, এমনকি শিশুদেরও টার্গেট করছে, যা অনেকের ধারণায়ও ছিল না।

সম্প্রতি এই চক্রের কিছু চুনোপুঁটি বা দালাল ঘটনাচক্রে ধরা পড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও হতবাক। এমন কঠিন মহামারীতেও এরা এত তৎপর যা কল্পনারও বাইরে। এই চক্রের কেউ কেউ রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে সমাজপতি এমন কি রাজনীতিক বনে যাচ্ছে।

নিজেদের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী-দানবীর পরিচয় দিয়ে এলাকা মাত করে দিচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিসহ স্থানীয় রাজনীতিকদের কাছেও তাদের বেশ কদর। মানব পাচার, ভিসা বিক্রি, অর্থ পাচার ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার বাংলাদেশি সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল এই শ্রেণির একটা উদাহরণ মাত্র। এমন বহু পাপুল আনাচে-কানাচে আরো লুকিয়ে রয়েছে।

এরা কেবল মানব পাচার-অর্থপাচার নয়, সরকারি কেনা-কাটা, টেন্ডারসহ কত ধরনের দুর্নীতিতে লিপ্ত, বিশেষ রাষ্ট্রীয় অ্যাকশন শুরু হলে পিলে চমকে যাবে গোটা জাতির। লিবিয়ায় মানব পাচার এবং পাপুলের ঘটনা তদন্তে নেমে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে, সেই দৃষ্টে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হলেও দেশে তোলপাড় দেখা দিতে পারে। একটি রিক্রুটিং এজেন্সি অফিসের পিয়নের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৩০ কোটি টাকার হদিস পেয়ে থ হয়ে গেছেন সিআইডির তদন্তকারীরা। এটি কর্মজীবনের নতুন অভিজ্ঞতা তাদের।

কেবল সৌদি, দুবাই, ব্রুনাইসহ মধ্যপ্রাচ্যে নয়, ভিয়েতনাম- তিউনিশিয়া, ইতালি, এমনকি ইউরোপীয় ছোট ছোট দেশেও জাল ফেলেছে পাচারকারীরা। সেখানেও তৎপর তাদের চক্রের সদস্যরা। আর দেশে তো রয়েছেই। চরম বিপর্যয়কর সময়েও এদের ব্যস্ততার অন্ত নেই। হাই সেলারির সঙ্গে উপড়ি ইনকামের টোপে ফেলে ভুয়া কোম্পানি, ট্যুরিস্ট ভিসা, ভুয়া ওয়ার্ক পারমিটসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র জোগাড় করে ফেলে ম্যাজিকের মতো। বিদেশে ফেলে দিয়ে আসার পরবর্তী অবস্থা জানে কেবল ভুক্তভোগীরা। একদিকে কাজ নেই, তারওপর আটকে রাখা হয় বদ্ধ ঘরে। তাদের কারো কারো ওপর সেখানে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে দেশে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করে ছাড়ছে মোটা অঙ্কের টাকাও।

সম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে এই নারকীয় কাণ্ডের কিছুটা প্রকাশ পেয়েছে মাত্র। কিন্তু এতে তাদের পাচারকর্ম মোটেই থামেনি। মোটা অংকের কামাই রোজগারের প্রলোভনে বিভিন্ন দেশে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করানো তরুণী-যুবতীদের খবরের ফলো আপ খবর আর জানা যায় না। সৌদিসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের কত বাঙালি নারীর বিলাপ হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে তার সঠিক হিসাব নেই কারো কাছে।

কারণ এ হিসাব উদ্ধার করা কঠিন। পাসপোর্ট, ভিসা, বিদেশ যাওয়াসহ তাদের সব কাজই হয় গোপনে। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখ মানুষ অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমান, যাদের একটি বড় অংশ যায় পাচার হয়ে। বিদেশে ডান্স ক্লাবের আড়ালে গত দেড় বছরে সহস্রাধিক নারী পাচার হয়েছে, এমন তথ্য দিয়েছে র‌্যাব। এই তথ্য বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের ভয়াবহ চিত্রের প্রকাশ মাত্র।

শুধু ডান্স ক্লাবের নামে সহস্রাধিক নারী পাচার হয়ে থাকলে বিদেশে লোভনীয় চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার নামে কত নারী-পুরুষ ও শিশু পাচার হতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। দু’একটি উদাহরণ ছাড়া সৌদি আরবসহ অন্য কোথাও এখন পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার কোন নারী আমাদের দেশের দূতাবাসের সহযোগিতা পেয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে গোপনীয় কাজের হিসাব বের করা কঠিন বৈকি।

তবে মানব পাচার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বলছে, প্রতিবছর ৫০ হাজার নারীকে বিদেশে কাজ এবং বিয়ে দেওয়ার নামে পাচার করা হয়ে থাকে। তাদের এই হিসাবও ধারণানির্ভর। কিছু তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে সরকার মাঝেমধ্যে কিছু এজেন্সিকে শনাক্ত করে। লাইসেন্স বাতিল করে সত্যি কিন্তু এতে পাচারকারীদের তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কারণ অন্য লাইসেন্সে কাজ শুরু করে দেয় সঙ্গে সঙ্গেই। পাশাপাশি নতুন লাইসেন্সও হাতিয়ে নেয় অল্প সময়ের মধ্যে। আর গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা কখন ছাড়া পেয়ে যায় তার খবরও রাখে না কেউই।

এদিকে, করোনা মহামারীকালে দেশে প্রবাস ফেরতদের দুর্গতির খবর নেয়াও যেন কেউ নেই। তাদের কারো কারো জীবন কিছু গোষ্ঠীর কব্জায় চলে গেছে। টার্গেট করেই হানা দেয়া হচ্ছে প্রবাসীদের ওপর। ধরপাকড়ও চলছে। দেশে ফেরার পর তাদের কাউকে এয়ারপোর্ট থেকে, আবার কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে বাড়িতে পৌঁছার পর করোনা ছড়ানোসহ নানা ছুতায়।

এ রকম সময়েই দেশের বিভিন্ন থানায় বিভিন্ন সময়ে আটক ২৫৫ জন প্রবাসীর মুক্তির দাবিসহ কক্সবাজারের চকরিয়ায় প্রবাসী জাফরকে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকায় মানববন্ধন হয়েছে। বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদ এবং বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের ব্যানারে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে সংগঠন দুটি।

মানববন্ধনে জানানো হয়, চকরিয়ায় ওমান প্রবাসী জাফরকে গ্রেফতার করে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা চায় পুলিশ ও স্থানীয় চক্র। টাকা না দেয়ায় তাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। অর্থনীতির চালিকাশক্তি, রেমিট্যান্স যোদ্ধাসহ নানা খেতাবে এখন আর মুগ্ধ নয় প্রবাসীরা। বরং বিরক্ত। অবিরাম নিপীড়নে অতিষ্ঠ-ক্ষুব্ধ। বড় কোনো মদত বা ইন্ধন পড়লে দেশে বড় ধরনের ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে প্রবাসীরা।

এদিকে প্রবাসীদের দেশে টাকা পাঠানোতেও ঘাটতিতে পড়তে যাচ্ছে দেশ। তাদের অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরায় বা ফেরার অপেক্ষায় থাকার কারণে গত দুই মাসে বেশি টাকা পাঠিয়েছে। ফলে এতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বেড়েছে বলে বড়াই দেখানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। ঈদের আগের মাসে জুলাইতে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় ২২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স এসেছে। দেশে কোনো একক মাসে এত বেশি পরিমাণ টাকা আর আসেনি। কিন্তু, সামনের মাসগুলোতে এই পরিমাণে রেমিট্যান্স আসার আর সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞ মহল।

সংগঠিত নয় বলে কষ্ট-ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারছে না প্রবাসীরা। আবার সহ্যের বাঁধও ভেঙে পড়েছে। তাদের সংগঠিত করে কেউ মাঠে নামিয়ে দিলে দেশে অকল্পনীয়-অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে সরকারকে। প্রবাসীরা সংখ্যায় বিশাল। সরকারি হিসাবেই ১ কোটি ২৬ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬১ জন বলা হলেও বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে বাস্তবে প্রবাসে থাকা বাংলাদেশি সংখ্যায় আরো অনেক বেশি।

দেশের মাটিতে পা রাখা থেকে শুরু করে দেশে বিভিন্নভাবে প্রবাসীদের হেনস্তা হওয়ার কিছু ঘটনা কম্পাইল করা হয়েছে। এর কয়েকটি ভীষণ গুরুতর। প্রবাসী পরিবারের কাছ থেকে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মিলেমিশে নিয়মিত চাঁদা-বখরা আদায়, দেশে ফেরা প্রবাসীকে মারধর, তুলে নেয়া এমনকি ক্রসফায়ারে দেয়ার ঘটনাও রয়েছে।

চাহিদামতো টাকা না দেয়ায় জাফর নামে এক প্রবাসীকে চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ওসিসহ দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। দেশে ফেরা প্রবাসীকে ক্রসফায়ারে হত্যার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থানার পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

তারা প্রবাসী হারুন ও তার স্ত্রীকে মাদকের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করে। হারুনের ঘরে থাকা নগদ ৪০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। প্রবাসী নিপীড়নের এ ধরনের সুনির্দিষ্ট ঘটনার কম্পাইল করে পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এর বাইরেও অন্তহীন ভোগান্তিতে প্রবাসীরা। করোনায় আটকা পড়ে যারা প্রবাসে কর্মস্থলে যেতে পারেননি তাদের সামনে এখন গাঢ় অন্ধকার।

কারো ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। কারো শেষের পথে। এক অনিশ্চিত জীবন তাদের। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরুর আগেও প্রায় প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজারের মতো প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশ আর বিদেশে যেতে পারেননি। আবার স্বজায়গায় যাওয়ার সম্ভবনাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে বিদেশ যাওয়ার বিকল্প খুঁজতে যেয়ে পড়ে যাচ্ছে মানব পাচারকারীদের খপ্পরে।

পয়লা এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ২৩টি দেশ থেকে প্রায় এক লাখ প্রবাসী দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ নারী কর্মী। বেশি ফিরেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। প্রবাস ফেরতদের সংখ্যা নিয়ে সরকারের কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই। কারণ এখন পর্যন্ত যারা দেশে ফেরত এসেছেন তাদের প্রকৃত সংখ্যার কোনো সরকারি ডাটাবেজ তৈরি হয়নি। এখন পর্যন্ত করোনায় প্রবাসে মৃতদের সঠিক তথ্যও নেই সরকারে কাছে। এ সংক্রান্ত সব তথ্যই খণ্ডিত ও ভাসা-ভাসা। তাই এই বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এসকে





ads