বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

ডা. এস এ মালেক
ডা. এস এ মালেক - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ডা. এস এ মালেক
  • ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:০২

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে মানুষ পেট ভরে ৩ বেলা খেতে পারত। ক্রমাগতভাবে তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, নদী ভাঙ্গন মানুষ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষ, ভ‚মিহীন কৃষক, বয়স্ক-বিধবা মহিলা, সকলের জন্য রাষ্ট্র তহবিল থেকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে।

সুতরাং বঙ্গবন্ধুর শোষিতের গণতন্ত্রের যে লক্ষ্য ছিল, সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। তবে এ কথা ঠিক যে, বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন প্রচলিত ব্যবস্থার (ঝুংঃবস) পরিবর্তন আনতে। যা বর্তমান ব্যবস্থাপনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের যে কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে তা স্থায়ী হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ কথা ঠিক, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আমরা উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছি। কেননা আমাদের কাছে এখন কোনো বিকল্প নেই।

তাই পুঁঁজিবাদী ব্যবস্থাপনার কুফলকে যতটা নিয়ন্ত্রিত করে সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করা যায় শেখ হাসিনা তাই করার চেষ্টা করছেন। উদ্দেশ্য তার মহৎ কিন্তু সিস্টেম পরিবর্তিত না হলে চরম শ্রেণি বৈষ্যমের কারণে ভবিষ্যতে দেশ যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে নয়; তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। কি চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু? প্রথমেই ধরা যাক কেন তিনি সকল দলের অবসান ঘটিয়ে একটা জাতীয় দল গঠন করতে চাইছিলেন। স্বাধীনতার সপক্ষ-বিপক্ষ, ধর্মভিত্তিক বাম ও দক্ষিণভিত্তিক রাজনীতি, নাস্তিকতাভিত্তিক সমাজ বিপ্লবভিত্তিক, মার্কসবাদভিত্তিক, বিভিন্ন দল বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যেভাবে স্বাধীন দেশকে একটা বিচ্ছিন্নতাবাদী সমাজ গড়ে তুলেছিলেন এবং যেভাবে জনগণ পরস্পরবিরোধী হয়ে হত্যা ও ধ্বংসলীলায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তাতে করে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে সুনিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

তাই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সকল শক্তিসমূহকে একটা জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত করতে চেয়েছিলেন। একদল সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলবে, সা¤প্রদায়িকতায় উস্কানি দেবে, ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করবে, আর একদল উগ্র বামপন্থি হয়ে অস্ত্র হাতে নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম করবে, এজন্য বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন করেননি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, বিদেশ থেকে কোনো তন্ত্রমন্ত্র আমদানি করে নয়; বাংলার মানুষের জন্য যা বাস্তব, কল্যাণমুখী তিনি তাই বাস্তবায়ন করবেন। আর তার মতো বাংলার জনগণের সংকটের প্রকৃত অনুভ‚তি ও তার বাস্তবায়নের কর্মসূচি তার চাইতে বেশি আর কারও জানা ছিল না। সারাটা জীবন বাঙালি সমাজকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

তিনি মার্কসবাদী ছিলেন না, কিন্তু সমাজবাদের মূল দর্শন সামাজিক সমতা সৃষ্টিরও বিরোধী ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন সকল প্রকার অর্থনৈতিক বৈষ্যমের অবসান ঘটাতে। আর যে পদ্ধতি তিনি অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন, ওটাই ছিল বাকশাল। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেও সেই স্বাধীন দেশে সংসদ ও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করে তিনি সংসদে আইন প্রণয়ন করেই সমাজ বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন। ৪র্থ সংশোধনীতে আর্থ-সামাজিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত পরিবর্তনের যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা প্রচলিত গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বা তাকে মার্সসবাদী একটা কর্মসূচি বলেও অভিহিত করা যায়নি।

তিনি চেয়েছিলেন, নির্বাচিত সংসদে আইন পাস করে প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাতে এবং ওটাই ছিল তার ২য় বিপ্লব। সংসদে নির্বাচত প্রতিনিধির দ্বারা আইন পাস করে সংসদীয় ধারার আমূল পরিবর্তন করলেন। যে পরিবর্তনের লক্ষ্য ছিল বিপ্লবের পরে একটা দেশে যা কিছু করা হয় তারই সমাধান করা। বাকশালে যে আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল সমাজ বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি। ধরা যাক প্রশাসন। কি পরিবর্তন তিনি আনতে চেয়েছিলেন প্রশাসনে। একজন মেধাবী ছাত্র শেষ পরীক্ষায় ভালো ফল করল। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হলো। লাহোরে হিরামন্ডুতে ক’মাসের ট্রেনিং নিল। আর প্রশাসনে ঢুকেই মহাকুমা নামক একটা বিস্তীর্ণ এলাকা বলতে গেলে জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, যা খুশি তাই করতে লাগল। ঐ ধরনের এককেন্দ্রিক মাথাভারি ও ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় তিনি চেয়েছিলেন পরিপূর্ণ পরিবর্তন আনতে। মহকুমা পর্যায়ে স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো ও প্রশাসন ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।

তিনি শুধু প্রশাসনের বিকেন্দ্রিকরণই করতে চাননি, তার লক্ষ্য ছিল প্রশাসনের প্রকৃত গণতন্ত্রায়ণ ও জনগণের সম্পৃক্তকরণ। মহকুমাকে জেলা করে জেলা পর্যায়ে তিনি যে গভর্নর সিস্টেমের প্রবর্তন করেছিলেন, তাতে গভর্নর হতেন একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি। জনগণের ভোটে তাকে নির্বাচিত হতে হবে। তিনি সরকার কর্তৃক মনোনীত কোন ব্যক্তি হতেন না। তিনি হতেন জনগণের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি। গভর্নর কাউন্সিলের প্রধান হলেও তাকে সরকারি কর্মচারী ও নির্বাচনী প্রতিনিধিদের সমন্বয় সাধন করে দায়িত্ব পালন করতে হতো। এককভাবে নিজের ইচ্ছামতো কোনো কাজ করতে পারতেন না। শ্রমিক, কৃষক, মহিলা, পেশাজীবী প্রত্যেকেই নির্বাচিত হতেন গভর্নর কাউন্সিলর। সকলের সাথে আলাপ আলোচনা করে গভর্নরকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য কার্যক্রম গ্রহণ করতে হতো। ফলে কোনো প্রকারেই গভর্নরের ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচারী হওয়া সম্ভব ছিল না এবং ইচ্ছা থাকলেও জনগণের বিরুদ্ধে তিনি কিছুই করতে পারতেন না। শুধু স্থায়ীভাবে স্বায়ত্তশাসনই নয়, শাসন ব্যবস্থার গণতন্ত্রায়ণই ছিল মূল কথা। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে শ্রেণিভিত্তিক জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা হয়েছিল। একটা গণতান্ত্রিক দেশে যে ধরনের শাসন ব্যবস্থা জনকল্যাণমুখী হয়ে ওঠে ঠিক সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।

সুতরাং শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্রায়ণ জনগণের অংশগ্রহণের অধিকার প্রকৃত অর্থে সংরক্ষিত হতো। ফলে শাসন ব্যবস্থা কখনোই জনগণ হতে বিচ্ছিন্ন হতো না, শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রিকরণ ও গণতন্ত্রায়ণই ছিল গভর্নর সিস্টেমের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের যে দাবি এদেশে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে জানানো হচ্ছিল, তারই রূপায়ণ ঘটেছিল গভর্নর সিস্টেমে। আমলাতান্ত্রিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন এনে প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণমূলক শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তনই ছিল গভর্নর সিস্টেমের লক্ষ্য। দেশের উন্নয়ন তৎপরতায় জনগণের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে হলে সকল শ্রেণির প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ যে সুনিশ্চিত করা দরকার তারই বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিক, কৃষক, নারী ও পেশাজাবীদের প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। এককভাবে ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব নয়। একদিকে সরকারি আমলা, অপরদিকে জনগণের প্রতিনিধি গভর্নর কাউন্সিলে বসে জনগণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি গ্রহণ করতেন। এতে করে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেত।

২য় কর্মসূচি ছিল বাধ্যতামূলক বহুমুখী গ্রাম্য সমবায় গঠন। এই সমবায়কেই বঙ্গবন্ধু উৎপাদন ও উন্নয়ন বিতরণ ব্যবস্থার প্রাণশক্তি হিসেবে দ্বার করতে চেয়েছিলেন। লক্ষ্যছিল প্রতি ১ হাজার লোকের জন্য একটা সমবায় ইউনিট গঠন করা। এই সমবায় গঠনে বঙ্গবন্ধুর ছিল নিজস্ব পরিকল্পনা। এটা ঠিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যে ধরনের সমবায় গঠন করা হয় অথবা সমাজতান্ত্রিক রেজিমেন্টেড সমবায়ের মতো ছিল না। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই বলেছিলেন তিনি কারও জমির মালিকানা কেড়ে নেবেন না। সমবায় অংশগ্রহণকারী জমির মালিকরা উৎপান বৃদ্ধি করে উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ মালিকানা স্বত্ব পাবেন আর বাকি ২ অংশ একভাগ জমা হবে সরকারি কোষাগারে আর এক ভাগ পাবেন জমিতে শ্রমদানকারী ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিক। জমির মালিকানা মালিক না হয়েও তারা শ্রমদান করে উৎপাদনের একাংশে মালিক বনে যাবেন।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলাদেশের ভ‚মির গুণগতমান বিবেচনায় নিলে আমরা যে জাপানের চাইতেও বেশি ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম হব তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং যে জমি আছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে ৩ গুণ ফসল ফলাতে পারলে আমাদের জনসংখ্যা যতই বেশি হোক না কেন, আমরা তাদের পেট ভরে খাওয়াতে পারবো ও কৃষি উন্নয়ন দ্রুত এগিয়ে নিতে সক্ষম হবো। বাস্তবিক অর্থে তারই কন্যার প্রচেষ্টায় শস্য উৎপাদন ৩গুন বেড়েছে। কিন্তু সমবায়ভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থার প্রচলন না থাকায় উৎপাদিত শস্য গুটিকয়েক ভ‚মিদস্যু স্বার্থ সংরক্ষণ করছে। (চলবে)

লেখক: বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, লেখক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...