কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে নিম্ন আয়ের মানুষ

মোতাহার হোসেন

poisha bazar

  • ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:২৭

বৈশ্বিক মহামারী করোনায় পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকে ওলট পালট করে দিয়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের চিরকালীন যে সম্পর্ক তাতেও অনেকটা ভাটা পড়েছে। বিশ্বের দেশে দেশে মানুষের কর্ম সংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, বিনোদন, সাংস্কৃতিক, আত্মিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পড়েছে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব। বলতে গেলে সব ক্ষেত্রেই বিরাজ করছে এক বিশাল স্থবিরতা, অনিশ্চয়তা। অন্ধকার সময় যেন মানুষকে, বিশ্ব ব্যবস্থাকে গ্রাস করেছে। একই সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা, আমাদের যাপিত জীবন ব্যবস্থার চিরাচরিত প্রথা ভেঙে দিয়ে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মানুষকে। শহর থেকে গ্রাম, দেশ থেকে বিদেশ, কাল থেকে কালান্তরব্যাপী মানুষের ভাত, কাপড়, রুটি রুজির সংস্থান পদে পদে, অনিশ্চয়তার পথে ধাবিত হচ্ছে। শহর থেকে শহরতলি, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে মহামারী করোনা। এ অবস্থা বিশ্বের শক্তিধর, প্রভাবশালী সব রাষ্ট্রেও। চাকরিচ্যুত, কর্মহীন হওয়া, কর্মের পরিধি ছোট হয়ে আসা, পারিশ্রমিক অর্ধেকে নেমে আসাসহ কর্ম সংস্থানের সুযোগ সংঙ্কুচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের মতো দেশে এই সংকট আরো প্রকট আকার ধারন করেছে।

বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারী শুরু থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের করোনায় আক্রান্ত সব দেশেই ‘লকডাউনের’ বা এক ধরনের অলিখিত-অঘোষিত বন্ধ কর্মসূচির কারণে অফিস আদালত, কলকারখানা, বাস, ট্রাক, ট্রেন, বিমান, লঞ্চ, স্টিমার, ব্যবসাকেন্দ্র, বাণিজ্যকেন্দ্র জাহাজ বন্ধ রয়েছে। খাদ্যসহ নিত্য পণ্যের সংকটে পড়েছে। এ কারণে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষ, শ্রমিক, দিনমজুর, গার্মেন্টসসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্প কারখানায় কর্মরত মানুষকে অনিশ্চতার মুখে বাধ্য হয়ে শহর ছেড়ে যেতে হয়েছে গ্রামে। এই প্রবণতা এখনো অব্যাহত আছে সমভাবে। প্রতি মাসের শেষ অথবা শুরুতে শহর থেকে গ্রামে চলে যাওয়া দৃশ্য প্রত্যক্ষ হয়। তদ্রুপ বিদেশে সাধারণ চাকরিজীবী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশায় জড়িত অনেকেই কর্মহীন হয়ে, চাকরিচ্যুত হয়ে খালি হাতে ফিরছে দেশে। এই সংখ্যা ইতোমধ্যে চার লাখের ঘর ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা আরো কিছু দিন বিশ্বের দেশে দেশে অব্যাহত থাকলে কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীকে দেশে চলে আসতে হবে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ কর্মরত আছেন। এদের মধ্য থেকে যদি আরো প্রবাসী বাংলাদেশিকে দেশে চলে আসতে হয় তখন আগামীতে দেশে নতুন করে বেকারত্ব বাড়বে। বাড়বে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা। তখন এ সব বেকার, কর্মহীন মানুষ এবং তাদের পরিবার, পরিজনকে দৈনন্দিন খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ভার বহন করতে সরকারকে হিমশিম খেতে হবে।

প্রসঙ্গত; করোনা শুরুর আগে পরে রাজধানীসহ দেশের সকল বিভাগীয়, জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শুরু হয়েছে কর্মসংস্থানের প্রকট অভাব। শহরে বসবাসরত নিম্নআয়ের এবং মধ্যবিত্ত শ্রেনীর বিরাট অংশ কর্মহীন হওয়ায় বাসা ভাড়া পরিশোধ করা, তাদের দৈনন্দিন ব্যয় বহন, সন্তানের ভরণ পোষণ, লেখা পড়া, চিকিৎসা ব্যয় ভার বহন অসম্ভব তারা শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বিদেশ থেকে চাকরি হারিয়ে দেশে আসা মানুষও তার ফেরার শেষ আশ্রয়-গ্রামে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে শহরের মতো গ্রামেও এখন কর্র্মসংস্থানের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। কাজেই কর্মহীন হয়ে বিদেশ থেকে প্রবাসীদের দেশে ফেরা, আর শহর থেকে কর্মহীন হয়ে গ্রামে যাওয়া মানুষের জীবন, কর্ম, জীবিকা সব কিছুই এক ঘোর অন্ধকারের বৃত্তে বন্দি হচ্ছে। করোনার বিরূপ প্রভাবে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ, সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রা, এগিয়ে চলা, অগ্রগতি, উন্নয়ন অভিযাত্রার গতিকে বাধাগ্রস্ত করবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
অভাবে অনটনে থাকা কর্মহীন মানুষ কর্মসংস্থান ও খাদ্য সমস্যায় পতিত হচ্ছে। এ রকম একটি করুণ কাহিনী সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ‘রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন একজন নিম্ন আয়ের মানুষ। চাকরি না থাকায় খাবারের টাকা জোগাড় করাই মুশকিল তার পক্ষে। লকডাউন শুরুর দিকে দুই মাসের ঘর ভাড়া বকেয়া পড়ে। ভাড়া পরিশোধের জন্য চাপ বাড়ে বাড়িওয়ালার। বাড়িওয়ালাকে তিনি বলেছিলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই সব ভাড়া পরিশোধ করে দেবেন। কিন্তু বাড়িওয়ালা তা মানেনি। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভাড়া বাকি রাখা যাবে না। অগত্যা ধারদেনা করে বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করে মে মাসের শেষের দিকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকা ছাড়েন তিনি’। এমন বেদনার গল্প শুধু এই ভদ্র লোকের একার নয়; করোনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেক মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার। কোন বিকল্পহীন অবস্থায় তারা কাটাচ্ছে দুঃসময়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) থেকে বলা হয়েছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী যেসব লোক কাজ হারিয়ে গ্রামে চলে গেছেন, তাদের নগদ অর্থ-সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। রাস্তাঘাট সংস্কার করে গ্রামে সরকারিভাবে কাজের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এতে সেখানে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও অস্ট্রেলিয়ার ওয়াল্টার এলিজা হল ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় বলা হয়, ‘করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে দেওয়া লকডাউনের কারণে ৯৬ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক উপার্জন কমে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে অস্থিতিশীল মনে করছেন ৯১ শতাংশ মানুষ।’ এখন বাংলাদেশে লকডাউন নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও লকডাউন অনেকটাই শিথিল। তবুও এর ধাক্কা এবং করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অনেকেই কর্মংহীন হয়ে পড়েছেন।

করোনাকালে অনুরূপভাবে সমতলের আদিবাসীদের জীবনযাপন নিয়ে একটি জরিপ করে ইনডিজিনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস (আইপিডিএস)। সঙ্গে ছিল ইউরোপের মাইনরিটি রাইটস গ্রুপ (এমআরজি-ইউরোপ)। তাদের জরিপে উঠে আসে, ‘করোনায় দেশের সমতলের ৯২ শতাংশ আদিবাসীর আয়-রোজগার কমে গেছে। ৭২ শতাংশ চাকরি হারিয়েছে। এতে অন্তত ৫ লাখ আদিবাসী ‘নতুন করে দরিদ্রে’ পরিণত হয়েছে।’ গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ এক গবেষণায় বলা হয়, ‘‘করোনাকালে রাজধানী ছেড়ে চলে গেছে ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষ। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং যোগাযোগ খরচ বহন করতে না পেরে তারা ঢাকা ছেড়ে বাড়ি চলে গেছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চিত্রও প্রায় অভিন্ন। করোনাকালে কাজ হারিয়ে চট্টগ্রাম থেকে অন্যত্র চলে গেছে ৯ শতাংশ মানুষ।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এর অভিমত, ‘এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সবার জীবিকার ব্যবস্থা করা। শহর বা গ্রাম- সব জায়গার জন্যই এ কথা প্রযোজ্য। চাকরি ও কাজ হারিয়ে অনেকে গ্রামে ফিরে গেছেন। আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শহরে ফিরে আসার চেষ্টা করবেন। গ্রামে যে কাজের সংকট, এটা সাময়িক। পরিস্থিতি ভালো হলে গ্রামে ফিরে যাওয়া লোকটি আবার শহরে ফেরত আসার চেষ্টা করবে- এটাই সত্য। যে কোনো দেশের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তার জনগোষ্ঠীর গ্রামে বসবাসের প্রবণতা কমে। এখন দেশের ৩৫-৪০ শতাংশ লোক শহরে বসবাস করছে। একটা সময় ৭০-৮০ শতাংশ বা তারও বেশি জনগোষ্ঠী হয়তো শহরে বসবাস করবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৯৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী শহরে বসবাস করছে। অথচ সপ্তদশ শতাব্দীতে দেশটির ৯৮ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করত। ‘করোনাকালে কর্মহীন লোকদের টিকে থাকার ব্যবস্থা করতে দেড় কোটি লোককে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা দরকার। মাসে তিন-চার হাজার টাকা করে দিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। গ্রামে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুতে প্রযুক্তির ছোঁয়া আনতে হবে। দেশে অনেক আগেই অনেক এলাকা থেকে লাঙল ও গরু দিয়ে চাষ করা প্রায় উঠে গেছে। কৃষিতে শতভাগ প্রযুক্তির ব্যবহার করা জরুরি। যেখানে সব কাজ যন্ত্রচালিত হবে। এতে শিক্ষিত তরুণরাও কৃষিতে ঝুঁকবে। তবে সামগ্রিক অবস্থার বিবেচনায় করোনা অর্থনীতিসহ মানুষের মনোজগতেও যে আঘাত দিয়েছে, সেখান থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হয়তো আরো অনেক সময় লাগবে।’

তবে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে আগের জায়গায় নিয়ে আসতে হলে কলকারখানাসহ সব প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি সচল করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেটা সচল রাখাও চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিকে আগের জায়গায় নিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। এটা করা গেলে কাজ হারানো লোকগুলো আবার কাজ ফেরত পাবেন। করোনাকালে সরকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। এই প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে। তখন কারখানাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আবার সচল হবে। কর্মহীন মানুষের অনিশ্চয়তা, বেকারত্বের অবসান হবে। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ ফিরে আসবে। সবাই সে সুদিনের অপেক্ষায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এসকে





ads







Loading...