পরিবেশ সংরক্ষণ: নৈতিক দায়িত্ব

আফতাব চৌধুরী
আফতাব চৌধুরী - সংগৃহীত

poisha bazar

  • আফতাব চৌধুরী
  • ০১ আগস্ট ২০২০, ০০:৫৯,  আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২০, ০১:১২

প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে বিশ্বের বিশুদ্ধ পরিবেশ হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ দূষিত হয়ে পড়ছে ক্রমশ পরিবেশ। মানুষের অটুট স্বাস্থ্য, মনোবল ও কর্মক্ষমতা নির্ভর করে সুস্থ পরিবেশের ওপর।

নির্মল পরিবেশ যাতে দূষিত হয়ে না পড়ে কিংবা কী উপায়ে দূষণের হার কমানো যায় অর্থাৎ জনস্বাস্থ্য ও বিশুদ্ধ পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৭২ সালের ৫ জুন জাতিসংঘ সম্মিলিতভাবে বিশ্ব পরিবেশ দিবস রূপে ওই দিনটিকে ঘোষণা করে। সুস্থ পরিবেশ রক্ষার দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে।

তারই প্রয়াসে সেই থেকে প্রতি বছরের ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ উদযাপন ও পালন করে থাকেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের আপামর জনসাধারণ। করোনা ভাইরাসজনিত কারণে ধুমধাম করা না হলেও যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়েছে সারা বিশ্বে।

এ বছরও ৫ জুন সমগ্র বিশ্বে পরিবেশ দিবস পালিত হলো। ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’- জননী বসুন্ধরা তার সন্তানদের জন্যে প্রয়োজনীয় সম্ভার সাজিয়ে রেখেছেন একটা শৃঙ্খলের মাধ্যমে। অথচ তার সন্তান মানুষগণ ভুলে যায়, যে প্রাকৃতিক পরিবেশে সে বাস করে তাকে বিনষ্ট করলে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব ও কর্তব্য বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকের।

আমাদের চারপাশের পানি, বায়ু, আলো, মাটি গাছ-পালা নিয়ে পরিবেশ গঠিত। এদের যে কোনো একটি বিনষ্ট হলেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকবে না। জীবকুলের অস্তিত্ব বিপন্ন হবেই। দেখা যাবে কোথাও মরুভ‚মি, কোথাও শুধু পানিরেখা। এবার দেখা যাক প্রতি বছরের ৫ জুন কেন আমরা এই দিনটিকে স্মরণ করি। কারণ বিশ্বের সামগ্রিক পরিবেশ আজ মারাত্মকভাবে দূষিত।

অথচ আত্মসুখে মত্ত মানুষ যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমেও প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করে ফেলছে। বিভিন্ন কারণে দূষণের চিত্র পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর সচল গতি অচল হয়ে পড়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আমাদের একান্ত জরুরি। কিন্তু সভ্যতার, অগ্রগতিতেও ক্রমান্বয়ে যেন বেড়ে যাচ্ছে দূষণের পরিমাণ, যার ফলে শুধু বায়ু নয়, দূষিত হচ্ছে পানি, আলো, মাটি সবকিছুই।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লব ঘটার সময় থেকে প্রচুর কলকারখানা স্থাপিত হয়। কলকারখানার কয়লা পুড়ানোর ফলে বাতাসে সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গত হয় যা জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সালফার অ্যাসিড ও নাইট্রোজেন অ্যাসিড তৈরি করে যার প্রতিক্রিয়া পানিতে, স্থলে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করতে থাকে।

কোথায় ‘দাও ফিরে সে অরণ্য লও হে নগর’ নির্বিচারে বৃক্ষ ছেদনের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কৃষিযোগ্য জমিতে ফসল ফলানো যাচ্ছে না। মরুভ‚মি হয়ে যাচ্ছে ভ‚-ভাগ। ধ্বংস হচ্ছে ‘অরণ্য ও বনায়ন’। বৃক্ষরাজির সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে কার্বন-ডাই অক্সাইড প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। হারিয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী পাখি, আর উপকারী পতঙ্গরা, যা প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিনাশের অন্যতম কারণ।

তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধিও দূষণের মুখ্য ভ‚মিকার কাজ করে। বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন, নাইট্রাস অক্সাইড, জলীয় বাষ্প প্রভৃতির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বেড়ে যায়। পৃথিবীর গড় উষ্ণতার ক্ষেত্রে গ্রিন হাউসের প্রভাব পড়ে। পরিবেশের উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপ রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে ইকোসিস্টেমে প্রভাব আসে।

প্রভাব পড়ছে ভূ-পৃষ্ঠে থেকে ৫০ কিমি দূরে ওজোন স্তরের ওপর। ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে ওজোন স্তর, এমনকি ভাঙছেও। এর ফলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মিকে আটকানো যাচ্ছে না যা এক সময় পৃথিবীপৃষ্ঠকেও স্পর্শ করতে পারে। ১৮৮২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেফোরম্যান কুমেরুর উপরে প্রথম ওজোন ছিদ্র আবিষ্কার করেন।

তিনিই প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন যে ওজোন স্তরটি ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে। তাই সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীপৃষ্ঠ স্পর্শ করলে নানা ধরনের স্কিনের রোগ দেখা দেবে। দেখা দেবে ক্যানসারের মতো আরও দুরারোগ্য ব্যাধি।

বর্তমানে অপ্রতিরোধ্য কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং নানা কারণে বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপুল পরিমাণে বরফ গলে সমুদ্রের জলতল যাচ্ছে বেড়ে। ভ‚-ভাগের পরিমাণ কমছে। নিচু শহর ও দেশগুলো চলে যেতে পারে পানির তলায়। হাজার হাজার হেক্টর জমি যাবে হারিয়ে। ত্বরান্বিত হবে পৃথিবীর বিপর্যয়।

এর ফলে দেখা দেবে কোনো কোনো অঞ্চলে অতি বৃষ্টি, ফলে ঘটবে মহাপ্লাবন। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে অনাবৃষ্টির ফলে দেখা দিবে দুর্ভিক্ষ, মহামারী। দেখা দেবে নতুন নতুন রোগ- মিনামাটা, ফ্লুরোসিস, ব্ল্যাকফুট ইত্যাদি-ইত্যাদি। রেফ্রিজারেটর, হিমঘর, রঙিন স্প্রে, সুগন্ধি স্প্র্রে, শেভিংক্রিম থেকেও ক্লোরোফ্লুরোকার্বন উৎপন্ন হয় যা বায়ুমণ্ডলে বাড়তে বাড়তে উপরে উঠে ওজোন স্তরের ক্ষতি করে।

কলকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ নদীর পানির সঙ্গে মিশে পানির বিশুদ্ধতা নষ্ট করছে। বনজ প্রাণীরা আজ বিপন্ন, ইতিমধ্যে উপসাগরীয় যুদ্ধে পৃথিবী সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত তেলের ভ‚মিকা প্রত্যক্ষ করেছে। কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার পানিকে মিশে পানীয়জলকে ব্যবহারের অযোগ্য করে তুলছে।

বিষাক্ত আর্সেনিকের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়াতে ইতিমধ্যে বহু লোক বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ছে। কল-কারখানার তীব্র শব্দ, গাড়ির হর্ন, বিমানের শব্দ, বাজি-পটকার আওয়াজ, মাইকের আওয়াজের তীব্রতা ৬৫ ডেসিবলের বেশি ছাড়িয়ে যাওয়াতে মানুষ আজ স্নায়ুরোগে ভুগছে, বধির, এমনকি স্মৃতিশক্তিও হারিয়ে ফেলছে। বাড়ছে হৃদস্পন্দন।

ভূ-স্তর থেকে নিয়মিত খনিজ সম্পদ আহরণের ফলে ভ‚-স্তর ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মানুষ একই জমি থেকে অধিক ও একাধিক খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধপত্র খুব বেশি ব্যবহার করছে। এর ফলে মাটির নিজস্ব উৎপাদক শক্তির হ্রাস পাচ্ছে।

ফলে আগের মতো উৎপন্ন শস্যাদির অভাবে দেহের পুষ্টিসাধন ও রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকছে না। সর্বোপরি পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে আবহাওয়া সাংঘাতিকভাবে দূষিত হচ্ছে। প্রচণ্ড শক্তিশালী রকেটের সাহায্যে মহাকাশ অভিযান ও উপগ্রহ উৎক্ষেপণে বিষাক্ত গ্যাসও মারাত্মকভাবে দূষিত করছে বায়ুমণ্ডলকে।

জাপানে নাগাসাকি হিরোসিমায় পারমাণবিক বিস্ফোরণ, ভোপালের গ্যাস দুর্ঘটনা, গুজরাটে ভ‚মিকম্প, সুনামির তাণ্ডবলীলা, ইদানীং জাপানে ভ‚মিকম্পের ফলে তেজস্ক্রিয় অগ্নিস্ফুলিঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় আবহাওয়া এবং জনজীবন ভয়ানকভাবে বিপর্যস্ত। যার প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে করে দিচ্ছে বিকলাঙ্গ। দৃশ্য দূষণও পরিবেশ দূষণের আরো একটি দিক।

তাই পরিবেশ দূষণের ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে জাতিসংঘ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১) অল্প মূল্যের যান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ। ২) জনগণকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেন।

৩) আইন করে দূষণ রোধ করা, ৪) আবর্জনাকে কাজে লাগানো, ৫) পাকা বা স্যানিটারি পায়খানার ব্যবস্থা করা, ৬) বনভূমি সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা, ৭) যানবাহন ও হর্নের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এই ভয়ঙ্কর পরিবেশ থেকে অব্যাহতি পাবার জন্য সরকার পরিবেশ দফতর খুলেছেন।

বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানও নানাভাবে জনমত সৃষ্টি করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, পত্র-পত্রিকা, সংবাদপত্র, রেডিও, টিভি-তে বারবার ঘোষণা, ভ্রাম্যমাণ ট্যাবলো, পোস্টার, ব্যানার, মিছিল ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় জনগণকে সক্রিয় সহযোগিতার কথা বলা হচ্ছে। কেবল সরকার নয়, আমাদের প্রত্যেককে নিজের স্বার্থে দূষণমুক্ত পরিবেশ গঠনে শপথ নিতে হবে। এবার আসুন অনুশীলন কবি সুকান্তের ছাড়পত্র কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি-

‘চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ
দেহে আছে প্রাণ,
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে
এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো
আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ়
অঙ্গীকার।’

তবে সার্থক হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতার মর্মার্থ- ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ এই বহুমুখী কল্যাণকর প্রচেষ্টা নির্ভর করবে মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে প্রতিটি নাগরিকের দায়-দায়িত্ব বোধের ওপর। তবেই পৃথিবীতে জীবকুলের অস্তিত্ব টিকে থাকবে। নতুবা আমরা দেখতে চাইব না বিপন্ন বিশ্বের প্রতিফলন বাস্তবে এবং কবিতায়-

‘‘আজ থেকে হাজার বছর পরে
এই হবে চেহারা পৃথিবীর
ধ্বংস করে প্রকৃতি ও পরিবেশ
মানুষ নিজেই হবে ধ্বংসে
পরিণত লপ্ত জীব।”

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট





ads






Loading...