তীব্র খাদ্য সংকট: বিপন্ন বিশ্ববাসী

মানবকণ্ঠ
আফতাব চৌধুরী - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ১২ জুলাই ২০২০, ১২:২৪

আফতাব চৌধুরী : খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান-মানুষের প্রথম ও প্রধান তিন আবশ্যকতা। এর মধ্যে আবার খাদ্য হলো সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান আবশ্যকতা। প্রাণিকুলে সভ্যাসভ্য নির্বিশেষে খাদ্য হলো জীবনধারণের জন্য একমাত্র অপরিহার্য উপাদান। বর্তমান বিশ্বে মানব সভ্যতার উৎকর্ষ চরমে। মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিত্য-নতুন উপকরণের উদ্ভাবনা-আবিষ্কার ঘটে চলেছে।

অথচ এ বিপুল উৎকর্ষ-অগ্রগতির যুগে আজ মানুষ তার সবচেয়ে মৌলিক ও প্রাথমিক আবশ্যকতা পূরণে ব্যর্থতার সম্মুখীন। আগামীদিনে বিশ্বের প্রায় সর্বত্র খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, এমন আভাস ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। সম্ভাব্য চরম খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনেতারা যথেষ্ট ভাবিত। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশই শুধু নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অতি উন্নত দেশের খাদ্য সংকটের প্রভাবমুক্ত থাকা সম্ভব হবে না। বিভিন্ন দেশের খাদ্যাভাব পর্যবেক্ষণ করে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে শুরু করে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য- এখন থেকে সতর্ক না হলে বিশ্ববাসীকে মহাদুর্যোগের সম্মুখীন হতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে তীব্র খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হতে পারে তার পূর্বাভাস অর্থশাস্ত্রীরা অনেক আগে দিয়ে রেখেছেন। অর্থনীতিবিদ থমাস মালথাস তার জনসংখ্যাতত্তে বলেছেন, একটি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে, যেখানে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে। এর অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিমাণ খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে এমন একটি সময় আসবে যখন খাদ্য সংকট অবশ্যম্ভাবী। অবশ্য সমালোচকদের বক্তব্য ছিল, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে খাদ্যশস্যের উৎপাদন মালথাসকথিত হারের চেয়ে অনেক বেশি করা সম্ভব এবং এ কারণে মালথাসের খাদ্য সংকট ও সংশিষ্ট দুর্যোগের আশঙ্কা অমূলক।

এটি ঠিক, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার খাদ্যশস্য উৎপাদনের হার বাড়াতে সক্ষম। চাষের অন্যান্য উপাদান বিশেষ করে ভ‚মির লভ্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে সবুজ বিপ্লবের ফলে ১৯৬৭-৬৮ সাল থেকে ১৯৭৯-৮০ সাল সময়কালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন গড়ে ২.০২ হারে বৃদ্ধি পেলেও পরবর্তীতে তা হ্রাস পায়। ১৯৯০-৯১ সাল থেকে ২০০০-০১ সাল সময়কালে সে হার কমে দাঁড়ায় ১.৬৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে আমাদের দেশে খাদ্য সামগ্রীর উৎপাদন বৃদ্ধির হারের চেয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অধিক হওয়াটা যে খাদ্য সংকটের ইঙ্গিতবাহী, সে বিষয়ে মতানৈক্যের অবকাশ নেই। তবে খাদ্য সংকটকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে পর্যালোচনা করা এ রচনার মূল উদ্দেশ্য নয়। বর্তমানে এবং অদূর ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটে এক ভয়াবহ মাত্রা সংযোজনের ক্ষেত্রে শিল্পায়ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে কিভাবে দায়ী সেটি এ রচনার প্রতিপাদ্য বিষয়।

শিল্পায়ন ও কৃষি বিকাশ একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হয়। যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশক ইত্যাদি জোগানের মাধ্যমে শিল্পায়ন কৃষির বিকাশে সাহায্য করে। তবে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা ও শিল্পায়নে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব কৃষির পক্ষে হানিকর হয়ে ওঠে। কৃষির সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে তা সাধারণ মানুষের খাদ্য সংকট মোচনে সক্ষম নাও হতে পারে। শিল্পায়ন কৃষিক্ষেত্রে খাদ্যশস্যের উৎপাদনের চেয়ে অর্থকরী শস্যের উৎপাদনকে অধিক উৎসাহিত করে। অর্থাৎ যে সকল শস্য শিল্প কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর উৎপাদনে কৃষকরা অধিক উৎসাহিত হন। তাছাড়া এসব শস্যের উৎপাদন কৃষকদের কাছে অধিকতর লাভজনক হওয়ায় তারা খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমিয়ে অর্থকরী শস্যের উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। শিল্পায়ন সাধারণ মানুষের উৎপাদিত খাদ্যশস্যের লভ্যতার সংকোচন ঘটায়। বর্তমানে উচ্চবিত্তদের মধ্যে প্রসেসড ফুডের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য সংশিষ্ট কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ফলমূল, দানাশস্য, দুধ, মাংস সব রয়েছে। ফলে এসব খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লে তা সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষের ব্যবহারের জন্য সহজলভ্য হচ্ছে না। যারা সেগুলো উৎপাদন করেন তারাই সেগুলোর ব্যবহারে সক্ষম নন। শিল্পায়নের গতির সঙ্গে সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে ধনিক শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা ও দরিদ্র শ্রেণির ক্রয় ক্ষমতার তুলনামূলক ব্যবধান। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির এ যুগে গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের ক্রয় ক্ষমতা এত নিম্ন যে তাদের পক্ষে খাদ্যের ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ থাকলে এদের কাছে তা লভ্য নয়, কারণ তাদের ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কাছাকাছি।

উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের কথা ধরা যাক। এক তথ্যে জানা যায়, এ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অতিশয় শোচনীয়। এদের গড় দৈনিক আয় নাকি মাত্র ৫০ টাকা। অথচ আমাদের দাবি, এদেশ খাদ্যশস্যে স্বনির্ভর, দেশে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের মজুদ ভাণ্ডার রয়েছে। অবশ্য যাদের ন্যূনতম ক্রয় ক্ষমতা নেই, তাদের কাছে মজুদ ভাণ্ডার থাকা না থাকা সমার্থক। আসলে ক্ষমতার অভাবহেতু হতদরিদ্র শ্রেণির খাদ্যশস্য ক্রয়ে অপারগতা খাদ্যশস্যের উদ্বৃত্তের অন্যতম কারণ।

শিল্পায়নের ক্রমব্যাপ্তির ফলে হ্রাস পাচ্ছে কৃষি জমির পরিমাণ। বনাঞ্চল বা অনুর্বর জমিতে যে শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে উর্বর কৃষিজমি আবাসন ও শিল্পকারখানার দখলে চলে যাচ্ছে। প্রত্যক্ষরূপে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে খাদ্যশস্যের উৎপাদনের ওপর। আবাসন ও শিল্পায়নের ফলে বাড়ছে নগরায়ণ, কমছে চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ। তাছাড়া শিল্পায়ন-নগরায়ণের যুগলবন্দি প্রদূষণ সৃষ্টির মাধ্যমে খাদ্যশস্যের ফলনে মন্দাভাব ডেকে আনছে।

খাদ্য সংকট সৃষ্টিতে শিল্পায়নের পরোক্ষ প্রভাব অনেকটা জটিল, সুদূরপ্রসারী ও বহুমুখী। এ প্রভাব এখন তেমন প্রকট না হলে আগামী ২/৩ দশকের ভিতরে যে এর ভয়াবহ রূপ বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে তার পর্যাপ্ত সংকেত এ মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে। শিল্পায়ন-নগরায়ণ সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন আগামী বিশ্বে তীব্র খাদ্য সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনেতারা এ নিয়ে তাদের আশঙ্কা ইতিমধ্যে ব্যক্ত করেছেন।

উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্যশস্য উৎপাদনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ প্রভাব আগামীদিনে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জলবায়ুর অবাঞ্ছিত পরিবর্তনের ফলে কোথাও প্রচণ্ড খরা, আবার কোথাও প্রবল বর্ষণ ও বন্যা ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ডেকে আনছে। দেখা যাচ্ছে আরো আশ্চর্যজনক ব্যতিক্রমী ঘটনা। গ্রীষ্মকালে বৃষ্টির আকাল দেখা দিচ্ছে খরা আর শীতকালে প্রচুর বৃষ্টি ও বন্যা। জলবায়ুর এ তুঘলকি কাণ্ডে মার খাচ্ছে কৃষি-খাদ্যশস্যের উৎপাদন।
অনেক পূর্বে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বরফ গলে ২০৫০ সালের মধ্যে উত্তর মেরু বরফমুক্ত হয়ে পড়বে। উত্তর মেরুতে যেভাবে বরফ গলতে শুরু করেছে তা থেকে বিজ্ঞানীরা শঙ্কিত, আগামী কুড়ি বছরের মধ্যে তাদের আশঙ্কা সত্যে পরিণত হবে। তার স্পষ্ট আভাস এখন পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার উত্তর গোলার্ধে বরফ গলার হার আশ্চর্যজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একথা জানিয়েছেন আমেরিকার বলিষ্ঠ আবহাওয়া বিজ্ঞানী ও গবেষক মার্ক সেরেইজসহ অন্যরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আর্কটিক সাগরে বর্তমানে বরফের তেমন কোনো চিহ্ন নেই। তাই নৌকা নিয়ে সোজা চলে যাওয়া যায় মেরুর বুকে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এমন মারাত্মক উদাহরণ যে ২০২০ সালে প্রত্যক্ষ করা যাবে, তা বিশ্বের কোনো বিজ্ঞানীর কল্পনাতেও ছিল না।

শিল্পায়ন-নগরায়ণের ফলস্বরূপ বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা যেভাবে বাড়ছে তাতে তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ বা আরো আগে। এমতাবস্থায় অ্যান্টার্কটিকা, গ্রিনল্যান্ড তথা হিমবাহের বরফাচ্ছাদন দ্রবীভূত হয়ে সমুদ্রের পানি পৃষ্ঠের উচ্চতা ০.৫ মিটার থেকে ২.৫ মিটার অবধি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন ঘটনা যে অবর্ণনীয় সুদূরপ্রসারী বিপর্যয় ডেকে আনবে তা সন্দেহাতীত। উপকূলীয় অঞ্চল ও অনেক দ্বীপমালা সমুদ্র গ্রাস করে ফেলবে। কৃষিজমি পানির নিচে চলে যাবে। আক্রান্ত অঞ্চল থেকে ভ‚ভাগের অন্যত্র মারাত্মক হারে প্রব্রাজন ঘটবে। ফলে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, জাতিভাঙ্গাসহ খাদ্য সংকট এক বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আগামী বিশ্বে চরম পানি সংকট দেখা দিবে। ফলে খাদ্য সংকট তীব্রতর হবে। পৃথিবীর গাত্র বেয়ে বয়ে চলা নদী-নালার প্রবাহিত পানির উৎস হিমবাহ। হিমবাহ থেকে নিরন্তর প্রবাহ দিয়ে পানি সাগরে গড়াচ্ছে। আবার সাগর থেকে বাষ্প আকারে তা এসব হিমবাহে জমা হচ্ছে। এ জমাট ও গলন প্রক্রিয়ার পুরো বিষয়টি চক্রাকারে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। অথচ উষ্ণায়নের ফলে বর্তমানে এ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। অত্যধিক বরফ গলনের কারণে নদী-নালা একসঙ্গে এত পানি ধারণ করতে না পারায় দেখা দিচ্ছে অকাল বন্যা, ব্যাঘাত ঘটছে কৃষি উৎপাদনে, সৃষ্টি হচ্ছে খাদ্য সংকট। গবেষকরা বলছেন, পৃথিবীর ক্রম উষ্ণায়মানতার কারণে সাগর থেকে জলীয় বাষ্প উঠে এলে তা হিমবাহ গাত্রে জমাট না বেঁধে বৃষ্টি আকারে ঝড়ে পড়ছে। তাই বসন্তকালে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টির ঘটনা ঘটছে। তাই তো দেখা যাচ্ছে বর্ষায় খরা আর শীতে অকাল বৃষ্টি-বন্যা। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় পানি নেই, অথচ অপ্রয়োজনে প্রচুর পানি। উভয় অবস্থাতে বিঘ্নিত হচ্ছে কৃষিকাজ-বাড়ছে খাদ্য সংকট। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, উষ্ণায়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে হিমবাহগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ফলে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দক্ষিণ আমেরিকা, চীন, ভারত, বাংলাদেশসহ এশিয়ার আরো অনেক দেশ। সবচেয়ে বেশি বিরূপ প্রভাব পড়বে কৃষিক্ষেত্রে। নদী-নালার জলধারার উৎস হিমবাহ নিশ্চিহ্ন হলে অনেক নদী-নালা অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। যে কৃষিভিত্তিক মানব সভ্যতা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল তার বিপর্যয় ঘনিয়ে আসবে। আর কৃষিকার্য বিঘ্নিত হবার মানে হলো তীব্র খাদ্য সংকটের আগমনবার্তা।

লেখক-আফতাব চৌধুরী : সাংবাদিক-কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads






Loading...