ভারত-চীন সংঘর্ষ কেন?

অরিত্র দাস
অরিত্র দাস - সংগৃহীত

poisha bazar

  • অরিত্র দাস
  • ৩০ জুন ২০২০, ১৫:৩৭

ভারত এবং চীন দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। বছরের পর বছর ধরে অর্থনীতি এবং সামরিক দিক থেকে দুই দেশই একে অপরের চির প্রতিপক্ষ। বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাটিয়ে উঠে চীন এখন সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছাড়িয়ে যেতে চায় এবং অনেকাংশে কাটিয়ে উঠতে পেরেছে অবশ্য।

প্রতিরক্ষা খাতে চীনের বাজেট ২৩৭০ কোটি ডলার, সেখানে ভারতের ৬১০ কোটি ডলার। কার্যত ভারত এবং চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষ এতকাল সীমান্ত বিরোধ হলেও এখন প্রধানত দুটি কারণ, প্রথমত সীমান্ত বিরোধ, দ্বিতীয়ত, ঈর্ষা তথা সন্দেহ। চীনের শত্রু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের উত্তরোত্তর সম্পর্ক বৃদ্ধি পাওয়াকে ভালোভাবে দেখছে না চীন। ভারত এবং চীনের মধ্যে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

এই সীমান্ত একেবারেই সুচিহ্নিত ও সুনির্দিষ্ট নয়। ফলে প্রায়শ সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। কোনোটা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কোনোটা বা হাতাহাতি ধস্তাধস্তি। সামরিক দিক থেকে বিরোধপূর্ণ সীমান্তের খুব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লাদাখে। আর তাই লাদাখের গালোয়ান উপত্যকা অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই মূলত এখানে সংঘর্ষ বাধে। কারণ, দুই দেশের মধ্যকার ডি-ফ্যাক্টো সীমান্ত, যা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) নামে পরিচিত, তার পশ্চিম ভাগে এবং আকসাই চীনের কাছে অবস্থিত লাদাখ, যেটি একটি বিতর্কিত অঞ্চল।

চীন তিব্বতের ওপর দিয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত একটি হাইওয়ে তৈরি করেছে। যাকে কারাকোরাম হাইওয়ে বলা হয়। এই হাইওয়ের সাথে আরো একটি বাইপাস রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করছে চীন। যাতে আকসাই চীনের সাথে চীনের যোগাযোগ মসৃণ হয়। ভারতের অভিযোগ, পরিকল্পিত প্রশস্ত হাইওয়ের জন্যই লাদাখের একটি অংশ দখল নিতে চায় চীন। কিন্তু ভারত তা হতে দিতে চায় না। উল্টো ভারত বরাবরই দাবি করে আসছে, ‘আকসাই চীন তাদের এলাকা। চীন জবরদখল করে রেখেছে।’

গালোয়ান উপত্যকা নামকরণের পিছনে ছোট্ট একটা ইতিহাস পাওয়া যায় আত্মজীবনীমূলক ‘সার্ভেন্ট অব সাহিবস- আ বুক টু রিড অ্যালাউড’ বইয়ে। লন্ডনের কেমব্রিজ প্রকাশনা সংস্থা ‘ডাবলিউ হেফার অ্যান্ড সন্স’ থেকে ১৯২৩ সালে বের হয়। সোয়াশ’ বছর আগে লাদাখের এক কিংবদন্তি পর্বতারোহী ও অভিযাত্রী ছিল। নাম তার গুলাম রসুল গালোয়ান।

কাশ্মীরি ভাষায় ্#৩৯;গালওয়ান্#৩৯; শব্দের অর্থ হলো ডাকাত। উনিশ শতকে গুলাম রসুল গালোয়ানের পিতামহ কারা গালোয়ান ছিলেন কাশ্মীরের বিখ্যাত এক দস্যু। ধারণা করা হয়, ১৮৭৮ সালের দিকে লাদাখের রাজধানী লেহ-তে গুলাম রসুল গালোয়ানের জন্ম। একবার এক অভিযাত্রী দল লাদাখের এই দুর্গম অঞ্চলে উঁচু উঁচু পর্বতমালা, হ্রদ আর খাড়া গিরিখাতের মাঝখানে হারিয়ে যায়। বেরোনোর কোনও পথ পাওয়া যাচ্ছিল না। গুলাম রসুল গালোয়ান পথ বের করে দিয়েছিলেন, যার কারণে তার নামানুসারে এই দুর্গম উপত্যকা অঞ্চলের নামকরণ হয় গালোয়ান।

১৯৬২ সালে ভারত-চীন একমাত্র যুদ্ধ হয় এই লাদাখের গালোয়ান উপত্যকায়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণও এই গালোয়ান উপত্যকা। যাতে ২০ ভারতীয় সেনা মারা যায়। চীনের দিক থেকে তাদের সেনা মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি। লাদাখে ভারত কর্তৃক নির্মিত একটি রাস্তা কেন্দ্র করে এই সংঘাত, যেটি দুই দেশের মধ্যকার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর অবস্থিত। লাদাখের পাশেই অবস্থিত আকসাই চীন যা চীন শাসন করছে।

ভারতের এই পদক্ষেপ চীনকে সংক্ষুব্ধ করে। চীন আশঙ্কা করছে, এই রাস্তা মূলত আকসাই চীন দখলের জন্য ভারত সরকারের কোনো কৌশল। আশঙ্কার পিছনে অবশ্য যৌক্তিকতাও আছে, কিছুদিন আগে সংবিধানের ৩৭০ বিশেষ ধারা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরকে দুইটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ। লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার পর থেকেই চীন নড়েচড়ে বসে।

তারা বারবার বলে আসছে, ‘লাদাখের বেশ কিছু এলাকা বিতর্কিত এবং এলাকাগুলো তাদের।’ তাদের এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে সংসদে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ‘আকসাই চীন ভারতের অভিন্ন অঙ্গ।’ যা চীনের দুশ্চিন্তার আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীন বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে সেনা মোতায়েন এবং অবকাঠামো তৈরি করতে উদ্যত হয়। বিরোধপূর্ণ বাকি অংশ উত্তর পূর্ব ভারতের সিকিম এবং অরুণাচলে অবস্থিত। চীন দাবি করে, ‘দক্ষিণ তিব্বতের অংশ অরুণাচল প্রদেশ, বিশেষ করে তাওয়াং শহর- যা ভারত শাসন করছে।’

অন্যদিকে ভারত বলছে, ‘অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।’ ব্রিটিশরা ১৯১৩ সালে সিমলা চুক্তি করে একটি সীমান্তরেখা অঙ্কন করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী ম্যাকমোহন লাইনের মাধ্যমে ১৯১৪ সালে উত্তর-পূর্ব ভারত এবং তিব্বতের সীমান্ত নির্দিষ্ট করা হয়। এর আগেও আরো দুইবার ভারত-তিব্বত সীমানা নির্ধারিত হয়েছে, প্রথমবার ১৮৬৫ সালে জনসন লাইন, দ্বিতীয়বার ১৮৯৯ সালে ম্যাকার্টনি-ম্যাকডোনাল্ড লাইন অনুসারে কিন্তু চীন কখনোই তা মানেনি।

চীনের মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে সীমান্তরেখা ছিল, তাতে অরুণাচল প্রদেশ এবং লাদাখের কিছু অংশ তৎকালীন চীন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। এ থেকে স্পষ্ট সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারতের দ্ব›দ্ব বহু পুরনো। যদিও তা প্রকাশ্যে আসে ১৯৫১ সালে, যখন তিব্বতে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে চীন।

১৯৬২ সালের যুদ্ধে অরুণাচল অন্যতম কারণ ছিল। পরবর্তীতে আবারো এই দ্ব›েদ্বর জের ধরে ১৯৭৫ সালে অরুণাচল প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গিরিপথে ভারত-চীন সংঘর্ষ হয়। তাতে চারজন ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়। এই যে বহু বছর ধরে সীমান্ত ও সীমান্ত এলাকা নিয়ে দুই দেশের মতানৈক্য- তা থেকেই সৃষ্টি সংঘাত। সংঘাত বহুবার হয়েছে, এখনো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। যতদিন এই সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না হয়।

দুই দেশের সীমান্ত বিরোধ কি আদৌ মিটবে? একটা প্রশ্ন থেকে যায়। কেননা, সীমান্ত বিরোধ মিটাতে হলে দুই দেশের দাবিও মেটাতে হবে। তাতে কি কোনো দেশ একমত হবে? বরঞ্চ দিন যত গড়িয়ে যাচ্ছে দুই দেশের ভিতর স্ব স্ব জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা বেশ ফুঁসে উঠেছে। নোনতা জলের হ্রদ প্যাংগংয়ের এক-তৃতীয়াংশ ভারতের দখলে। দুই-তৃতীয়াংশ চীনের।

প্রকৃত সীমান্তরেখা এই লেকের ওপর দিয়ে চলে গেছে। ভারতের দাবি, চীন সেই সীমান্তরেখা অগ্রাহ্য করে ভারতে ঢুকে জমি দখল করছে এবং সীমান্তরেখার সাথে রাস্তা বানাচ্ছে। সেই দাবি উপেক্ষা করে চীন বলছে, ভারত বরং নিয়ন্ত্রণরেখা মানছে না। দারবুক, শাইয়োক হয়ে সিয়াচেন হিমবাহ পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করে ফেলেছে ভারত। শুধু তাই নয়, এই অঞ্চলে দৌলত বেগ ওল্ডিতে ১৬ হাজার ৬১৪ ফুট উচ্চতায় বিশ্বের উচ্চতম এয়ার স্ট্রিপ তৈরি করেছে ভারত। এই এয়ার স্ট্রিপ এবং সিয়াচেন পর্যন্ত রাস্তা নিয়ে চীনের আপত্তি আছে। এছাড়া ২০১৭ সালে, বিতর্কিত মালভ‚মিতে চীন তার সীমান্ত সড়ক বাড়ানোর চেষ্টা করলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।

চীন এবং ভারত, দুটি দেশই গত কয়েক দশক ধরে সীমান্ত এলাকায় তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে। চীন যখন যোগাযোগ ব্যববস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করছে তখন ভারত বাধা দিয়েছে। ঠিক তদ্রƒপ ভারত যখন যোগাযোগ ব্যববস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করছে তখন চীন বাধা দিয়েছে। ভারত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করেছে দক্ষিণের অরুণাচল প্রদেশ এবং লাদাখ অঞ্চলে: চীন এটা করেছে তিব্বত ও আকসাই চীন অঞ্চলে।

বস্তুত দু’ দেশের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট ও সুচিহ্নিত সীমান্ত রেখা নেই। ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পরে দু-দেশের সেনা যেখানে ছিল, সেটাকেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বলে ধরে নেওয়া হয়। তাই দুই দেশই সুযোগ পেলে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে, সীমান্তে রাস্তা, সেতু, রেললিংক, এয়ার ফিল্ড, সামরিক পোস্ট ও অবকাঠামো নির্মাণে চেষ্টা করে। আর তখনই বেধে যায় সংঘর্ষ।

সদ্য প্রকাশিত ভারতের স্ক্রলডটইনের এক প্রতিবেদনে সংঘর্ষের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে চীন-ভারত সংঘর্ষের পেছনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মাখামাখির বিষয়টিকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দুটি দেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক চীন ভালোভাবে নিতে পারছে না। সাম্প্রতিক কালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পূর্বের তুলনায় সবচেয়ে ভালো এবং মজবুত।

কয়েক বছর ধরে ভারতীয় উত্তরাঞ্চলের বিমানঘাঁটিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ মহড়াও করেছে। ১৯৪৭ সালে মার্কিন বাহিনী চীনের কমিউনিস্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ করেছিল, তখন ভারত সরকার মার্কিন বিমানবাহিনীকে ৬টি বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল। আমেরিকাও বন্ধুত্বের প্রতিদান দিতে সংকীর্ণতা করেনি। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে আমেরিকা ভারতকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসে, অবশ্য তার আগেই চীন সরে যায়।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, অন্য দেশগুলোর সাথেও ভারতের বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ইদানীং। বিশেষ করে ইসরাইল, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতাও রয়েছে ভারতের। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সাথে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তলানিতে এসে পৌঁছেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো চীনকে আজকাল বিশ্বাস করতে পারছে না। তদুপরি সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মিউচুয়াল লজিস্টিক সাপোর্ট অ্যাগ্রিমেন্ট করেছে ভারত। এর আওতায় দুই দেশ তাদের নৌঘাঁটি বিভিন্ন সামরিক কারণে ব্যবহার করতে পারবে। আর অস্ট্রেলিয়াকে চীন প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখছে। কেননা চীনের বিরুদ্ধে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে অস্ট্রেলিয়া।

এমনকি অস্ট্রেলিয়াতে চীনবিরোধী ক্যাম্পও রয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান যে, আলোচনাকৃত এসব কারণে চীনের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে ভারত। হয়তো এসবের কারণে ভারত ও চীনের বৈরিতা কমার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি নদী, হ্রদ,জলাশয় এবং শৈলপ্রবাহ প্রবাহিত হয়েছে, এর গতিপথ যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে বা গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ সীমান্তরেখা যেকোনো সময়ে বদলে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যকার সংঘর্ষের উস্কানি হিসেবে অত্যন্ত সহায়ক ভ‚মিকা পালন করবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট




Loading...
ads






Loading...